আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁদের মতে, আইনি প্রক্রিয়া অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত; তবে সেই প্রক্রিয়া যেন ভিন্নমত দমন, পেশাগত হয়রানি বা সাংস্কৃতিক পরিসরে ভীতির পরিবেশ তৈরির মাধ্যম হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
২৮ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা এ উদ্বেগ জানান। বিবৃতিটি আসে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম (এসডিএফ) নামে একটি সংগঠন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দুই সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ২৬ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিলের দুই দিন পর।
রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যায় প্ররোচনা, সহযোগিতা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত দেয়নি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
১০১ নাগরিক তাঁদের বিবৃতিতে বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে অভিযোগ দায়েরের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে তা কোনো ব্যক্তি, শিল্পী, সাংবাদিক বা নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করে কিংবা তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উপায়ে পরিণত হয়।
তাঁদের ভাষ্য, অভিযোগের ভিত্তি, প্রমাণ এবং আইনগত গ্রহণযোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাইয়ের আগেই যদি জনপরিসরে এমন পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভয় এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাহিত্য, শিল্প, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীন বিকাশের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, সমালোচনামূলক অবস্থান কিংবা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিল্পী, সাংবাদিক বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ বা হয়রানিমূলক আইনি উদ্যোগ গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে। তাই আইন যেন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
বিবৃতিতে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদেরও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. নুরুন নবী, কবি ও সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহ, অধ্যাপক ড. শামীম আহমেদ, অধ্যাপক এস. এম. মাসুম বিল্লাহ, ড. মাহমুদ হাসান, কথাসাহিত্যিক ড. মুকিত চৌধুরী, ড. প্রদীপ মাহবুব, গবেষক সুজাত মনসুর, ড. ফরিদ আহমেদ, হুমায়ূন কবীর ঢালী, আরিফ নজরুল, মীর রবি এবং বিভিন্ন অঙ্গনের আরও বহু লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, গবেষক, প্রকাশক, সাংস্কৃতিক সংগঠক, অভিনেতা ও গণমাধ্যমকর্মী।
FoEBD-এর পর্যবেক্ষণে, ঘটনাটি কেবল একটি অভিযোগ দায়েরের বিষয় নয়; বরং এটি বিচারিক প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পেশাগত নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার, সুনাম এবং ন্যায়বিচারের নীতিও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্বচ্ছ তদন্ত, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণই জনআস্থা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ইউএনবি, ঢাকা পোস্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত প্রকাশিত গণমাধ্যম প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিবৃতি





