সরকারি ছুটির দিনে বরগুনা জেলা সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের নকলখানায় বালাম ও রেজিস্টার নিয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তথ্য ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে কয়েকজন সাংবাদিককে বাধা, হুমকি এবং হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে বরগুনা পৌর শহরের পুরান থানা এলাকার জেলা সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে।
সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দৈনিক কালবেলার বরগুনা জেলা প্রতিনিধি আসাদ সবুজ জানতে পারেন, সরকারি ছুটির দিনে কার্যালয়ে কিছু কাজ চলছে। বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে তিনি বৈশাখী টেলিভিশনের প্রতিনিধি রাসেল শিকদার, বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধি ইব্রাহিম সোহেল, দৈনিক আমার সংবাদের প্রতিনিধি কাশেম হাওলাদার এবং দৈনিক ঢাকা নিউজের প্রতিনিধি জুলহাস মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কার্যালয়ে যান।
তাঁদের দাবি, কার্যালয়ের প্রবেশপথের গেট খোলা ছিল। পরে ভবনের তৃতীয় তলার নকলখানায় গিয়ে তাঁরা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মীকে বালাম নিয়ে কাজ করতে দেখেন।
সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে বরগুনার জেলা রেজিস্ট্রার স্বদেশ চন্দ্র চন্দ্রের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি তাঁদের জানান, ছুটির দিনে কার্যালয়ে এ ধরনের কাজ হচ্ছে—এ বিষয়ে তিনি অবগত নন।
এরপর সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলের ভিডিও ধারণ শুরু করলে মাস্টাররোলে কর্মরত বাশার খান সেখানে গিয়ে ভিডিও ধারণে বাধা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজেকে জেলা ছাত্রদলের সহসম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। একপর্যায়ে নকলখানার গেট বন্ধ করে তাঁদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের ‘দোসর’ ও ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে অভিযোগ তোলার চেষ্টা করা হয় এবং হুমকি-ধমকি ও মারধরের চেষ্টা করা হয় বলেও সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন।
ঘটনার সময় কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী বাশার খানকে আচরণ সংযত করার অনুরোধ করেন বলে সাংবাদিকদের দাবি।
ছুটির দিনে বালাম নিয়ে কাজ করার বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে নকলখানার রেকর্ডকিপার কাজটিকে ‘অনিয়ম’ হিসেবে স্বীকার করেছেন বলে সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য
বরগুনা জেলা রেজিস্ট্রার স্বদেশ চন্দ্র চন্দ্র সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি ছুটির দিনে বালাম নিয়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার তাঁর নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার কথাও জানান তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া সরকারি ছুটির দিনে বালাম নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই।
আগেও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ
বরগুনায় সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালে কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বরগুনার আমতলী সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল লেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাবরেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের বিরোধ এবং সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির কথা উঠে এসেছিল।
এর আগে আজকের পত্রিকার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বরগুনার বিভিন্ন ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ঘুষ এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছিল।
অন্যদিকে, ছুটির দিনে সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নথি নিয়ে কাজ করার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপের নজিরও রয়েছে। কুমিল্লায় ছুটির দিনে দলিল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের পর তিন কর্মচারীকে বদলি এবং একজন দলিল লেখকের সনদ সাময়িক স্থগিত করার তথ্য প্রথম আলো প্রকাশ করেছিল।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন
এই ঘটনার দুটি দিক আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ—একদিকে সরকারি ছুটির দিনে সরকারি রেকর্ড ও বালাম নিয়ে কাজ করার অভিযোগের সত্যতা এবং অনুমোদন ছিল কি না, অন্যদিকে বিষয়টি অনুসন্ধান করতে যাওয়া সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধা ও হুমকির অভিযোগ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা, সাধারণ ডায়েরি, তদন্ত কমিটি গঠন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে নথি ও রেকর্ডের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া।
তথ্যসূত্র:
দৈনিক কালবেলা, আজকের পত্রিকা, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক প্রথম আলো





