সাংবাদিক জামাল উদ্দিন মাদক ও চোরাচালানবিষয়ক সংবাদ প্রকাশের কারণে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন বলে তাঁর পরিবার ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন। সেই অভিযোগের কয়েক দিনের মধ্যেই, ২০১২ সালের ১৫ জুন রাতে যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর বাজারে হত্যা করা হয় দৈনিক গ্রামের কাগজ-এর স্থানীয় প্রতিনিধি জামাল উদ্দিনকে।
হত্যার পর মামলা হয়, একাধিক আসামি গ্রেপ্তার হন এবং তদন্ত শেষে সিআইডি অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে অভিযোগপত্র প্রকাশের পর থেকেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এজাহারে থাকা কয়েকজন আসামির নাম অভিযোগপত্রে রাখা হয়নি। আবার আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁদেরও কেউ কেউ অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত হননি। পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তাঁদের নাম অভিযোগপত্রে আসেনি।
হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পর, ২০২৬ সালের আগস্টে মামলার অন্যতম আসামি উকিল মল্লিককে আবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিচারিক কার্যক্রম স্থবির থাকার অভিযোগ থাকা এই মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি।
যেভাবে হত্যা করা হয় জামাল উদ্দিনকে
জামাল উদ্দিন যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর এলাকার সাংবাদিক ছিলেন। তিনি দৈনিক গ্রামের কাগজ-এর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। মামলার এজাহারভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, মাদক চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণে তিনি হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন। ২০১২ সালের ১৫ জুন রাতে কাশিপুর বাজারের একটি চায়ের দোকানে ছিলেন জামাল। পরে একদল ব্যক্তি তাঁকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হত্যার নৃশংসতার বর্ণনায় তাঁর চোখ উপড়ে ফেলা এবং শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বর্ণনা মূলত সংবাদ প্রতিবেদন ও মামলার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত।
জামাল উদ্দিনের পরিবারের দাবি, স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরদিন তাঁর বাবা আবদুল আলিম শার্শা থানায় সাতজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলায় সাত আসামি, কিন্তু অভিযোগপত্রে সবাই নেই
মামলার এজাহারে সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তোতা মিয়া, উকিল মল্লিক, রাজু মল্লিকসহ আরও কয়েকজন। তদন্তের দায়িত্ব পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের ১৭ মে সিআইডি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্র দাখিলের পরই প্রশ্ন ওঠে—এজাহারভুক্ত সাতজনের সবাইকে কেন অভিযুক্ত করা হয়নি।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এজাহারভুক্ত আসামি রমজান আলীর নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত বজলুর রহমান পলাতক অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।
ফলে এজাহারে থাকা আসামিদের পূর্ণ তালিকা অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া এগোয়নি।
১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে আরও ছয়জনের নাম
মামলার তদন্তে অন্যতম বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, এজাহারভুক্ত আসামি তোতা মিয়া, তাঁর স্ত্রী লতা বেগম এবং রাজু মল্লিক জবানবন্দি দেন। সেখানে শরীফুল ইসলাম, রেজাউল, আকবর, সালাম, বিষে ও মোহাম্মদ আলী—এই ছয়জনের নাম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে সিআইডির অভিযোগপত্রে এই ছয়জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সে সময়ের তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে
মামলার তদন্তকে ঘিরে আরও বিতর্ক তৈরি হয় পুলিশের দুই সদস্যকে কেন্দ্র করে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে তৎকালীন গোড়পাড়া পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা এএসআই মাসুদুর রহমান এবং কনস্টেবল শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। একই অনুসন্ধানে তাঁদের সঙ্গে কথিত ফোন যোগাযোগের বিষয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
অভিযোগ ওঠার পর এএসআই মাসুদুর রহমানকে শার্শা থেকে বদলি করে পরে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি এবং সিআইডির অভিযোগপত্রেও তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অভিযোগপত্র নিয়ে পরিবারের আপত্তি
নিহত সাংবাদিকের পরিবার অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট ছিল না। পরিবারের অভিযোগ ছিল, তদন্তে প্রকৃত হত্যাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যানের দাবিও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, বাদীপক্ষ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করতে পারে। তবে এই মামলায় নারাজি আবেদন করা হয়েছিল কি না, অথবা আদালত সে বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন—এমন তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
আসামিদের গ্রেপ্তার ও পলাতক থাকার ইতিহাস
হত্যার পর বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হন।
- জুলাই ২০১২: রাজু মল্লিক গ্রেপ্তার হন।
- অক্টোবর ২০১২: র্যাব প্রধান আসামি তোতা মল্লিককে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে গ্রেপ্তার করে।
- ২০১৫: উকিল মল্লিক ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে ফিরে শার্শার রামচন্দ্রপুর এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
- পরে তিনি জামিন পান।
- ২০১৬: উকিল মল্লিককে অস্ত্র মামলায় আবার গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়।
বিচারিক কার্যক্রম কেন থেমে গেল?
অভিযোগপত্রের পর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলেও তা নিয়মিত এগোয়নি। ২০২৩ সালের ২৫ জুন প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জামালের ভাই তরিকুল ইসলাম বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকজন সাক্ষী আদালতে হাজির হলেও প্রায় চার বছর ধরে মামলার কোনো কার্যকর শুনানির তারিখ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সাক্ষীদেরও আর আদালতে ডাকা হচ্ছিল না। একই প্রতিবেদনে তৎকালীন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জানান, মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবগত নন এবং খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।
এদিকে মামলার বাদী ও জামালের বাবা আবদুল আলিম মৃত্যুবরণ করেন। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর ভাই তরিকুল ইসলাম মামলাটি অনুসরণ করে আসছেন।
২০২৬ সালে আবার গ্রেপ্তার উকিল মল্লিক
দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের আগস্টে মামলাটি আবার আলোচনায় আসে। ২১ আগস্ট দিবাগত রাতে পুলিশ শার্শা উপজেলার লক্ষণপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় উকিল মল্লিককে তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মানব পাচার, গণধর্ষণ, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ মোট ১৮টি মামলা এবং আদালতের পরোয়ানা ছিল। ২২ আগস্ট তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়।
তবে এই গ্রেপ্তারের পর জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার নতুন করে শুরু হয়েছে বা মামলার বিচারিক অগ্রগতিতে নতুন কোনো আদালতের আদেশ হয়েছে—এমন তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে।
হত্যার পরিকল্পনাকারী কারা ছিলেন? এজাহারভুক্ত কয়েকজন আসামির নাম অভিযোগপত্র থেকে কেন বাদ দেওয়া হলো? ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র কেন দেওয়া হয়নি? পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিল? অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করলে তার ফলাফল কী হয়েছিল? দীর্ঘ সময় বিচারিক কার্যক্রম স্থবির থাকার কারণ কী? ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মামলার বিচারিক অগ্রগতি কী হয়েছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২০১২ সালে একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার পর ২০১৩ সালে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও ১৪ বছর পরও কেন মামলার বিচার শেষ হয়নি?
শেষ কথা
সাংবাদিক জামাল উদ্দিন হত্যা মামলা বাংলাদেশের সাংবাদিক নিরাপত্তা, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
মামলার নথি ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যার পর দ্রুত মামলা হয়, কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হন এবং তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। কিন্তু অভিযোগপত্রে আসামি অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক, পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, ১৬৪ ধারার জবানবন্দির সঙ্গে অভিযোগপত্রের অসামঞ্জস্য এবং বিচারিক কার্যক্রমের দীর্ঘ স্থবিরতা মামলাটিকে এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ঘটনাটি গুরুত্ব পেয়েছিল। ২০১২ সালে UNESCO হত্যাকাণ্ডের তদন্তের আহ্বান জানায়। Committee to Protect Journalists (CPJ) জামালের হত্যাকে তাঁর সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে নথিভুক্ত করে বিচার দাবি করে। Reporters Without Borders (RSF) এবং International Federation of Journalists (IFJ)-ও তাঁর মাদকবিরোধী প্রতিবেদনের কারণে হুমকি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থার বিভিন্ন নথিতেও ঘটনাটি সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে UNESCO-এর Observatory of Killed Journalists-এ ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জামাল উদ্দিন হত্যার বিচারিক অবস্থা “Ongoing/Unresolved” হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
২০২৬ সালে অন্যতম আসামি উকিল মল্লিকের পুনরায় গ্রেপ্তার মামলাটিকে আবার আলোচনায় এনেছে। কিন্তু জামাল উদ্দিনের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের মূল প্রশ্ন এখনো একই—
১৪ বছর পরও কি সাংবাদিক জামাল উদ্দিন হত্যার মামলায় পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত হবে?
তথ্যসূত্র:
১. প্রথম আলো — “অভিযোগপত্রে সেই দুই পুলিশের নাম নেই” এবং ”১১ বছরেও বিচার না পেয়ে ক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা ”
২. বিডিনিউজ২৪ — “জামাল হত্যা: অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান পরিবারের” এবং “সাংবাদিক জামাল হত্যা: প্রধান আসামি তোতা গ্রেপ্তার”
৩. বাংলানিউজ২৪ — “সাংবাদিক জামাল হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার”
৪. জাগো নিউজ — সাংবাদিক হত্যা ও বিচারহীনতা বিষয়ক প্রতিবেদন বক্তব্য।
৫. যুগান্তর — সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া নিয়ে প্রতিবেদন
৬. The Editors — “শার্শায় সাংবাদিক জামাল হত্যা মামলার আসামি উকিল মল্লিক গ্রেপ্তার”





