সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ১৪ বছর পরও তদন্ত ও বিচার শেষ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের পরিবার। আগামীকাল সোমবার ট্রাইব্যুনালে এ অভিযোগ জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সাগর-রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ এবং রুনির ভাই ও মামলার বাদী নওশের আলম রোমান।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মেঘ ও রোমান। এর আগে প্রধান কৌঁসুলি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, অন্য একটি মামলার তদন্তের সময় কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR) পর্যালোচনা করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন ব্যক্তির একটি সম্ভাব্য যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ওই ব্যক্তির নাম বা পরিচয় প্রকাশ করেননি তিনি। তথ্যটি এখনো যাচাই করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন প্রধান কৌঁসুলি।
নতুন এই তথ্যকে স্বাগত জানালেও মেঘ বলেছেন, তিনি সাগর-রুনি হত্যার সঠিক বিচার চান এবং তদন্তে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি জড়িত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
রুনির ভাই নওশের আলম রোমান দীর্ঘদিনের তদন্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশে নতুন টাস্কফোর্স গঠনের পরও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
রোমান আরও বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে যেসব ব্যক্তিকে আটক বা সন্দেহ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না থাকলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্তে নতুন করে যাদের নাম আসছে, তারা যাতে দেশ ছেড়ে যেতে না পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দিলেই মামলাটি ওই ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আবেদন এলে সেটি পরীক্ষা করে দেখা হবে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডটি সাধারণ একটি হত্যাকাণ্ড, নাকি ব্যাপক বা পদ্ধতিগত অপরাধের অংশ—তা সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (PBI) অধীনে থাকা টাস্কফোর্স তদন্ত করছে এবং ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে ওই তদন্ত দলের আনুষ্ঠানিক কোনো সহযোগিতা নেই। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া তথ্য যদি সাগর-রুনি মামলার জন্য প্রাসঙ্গিক ও বিশ্বাসযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়, তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া হতে পারে।
ইংরেজি দৈনিক Dhaka Tribune-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর-রুনি হত্যামামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা এ পর্যন্ত ১২৯ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২৭ আগস্টও প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় ঢাকার একটি আদালত নতুন করে ৩০ সেপ্টেম্বর সময় নির্ধারণ করেছে।
সাগর সরওয়ার ছিলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
এরপর একাধিক সংস্থা মামলাটির তদন্ত করলেও হত্যার কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রহস্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। দীর্ঘ এই অমীমাংসিত অবস্থাকে বাংলাদেশের সাংবাদিক নিরাপত্তা ও বিচারহীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়।
তথ্যসূত্র
১. bdnews24.com — পরিবার ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ও প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্য
২. Dhaka Tribune — নতুন ক্লু, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও ১২৯ বার তদন্ত প্রতিবেদন পিছোনোর তথ্য
৩. Prothom Alo English — সাংস্কৃতিক ব্যক্তির যোগসূত্রের বিষয়ে প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্য
৪. The Business Standard — CDR থেকে পাওয়া সম্ভাব্য যোগসূত্র ও তদন্তের তথ্য
৫. NTV Online — নতুন ক্লু ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তির ওপর নজরদারির তথ্য





