নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুর্গাপুর চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নুরুল আমিন ভূঁইয়া পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। এর আগে ১৮ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন মূল শুটার হিসেবে তাইজুলকে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। অপূর্বর কাছে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র রাখা হয়েছিল কি না, তা-ও তদন্তের বিষয়। তবে অপূর্বর বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে, সাংবাদিক আলিফ হত্যার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ
পুলিশ ১৮ অক্টোবর অপূর্বকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত সেদিন তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে পরদিন শুনানির দিন ধার্য করেন। ১৯ অক্টোবর শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে। প্রয়োজন হলে পরে আবার রিমান্ড চাওয়া হতে পারে।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় অপূর্ব ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং তাঁর কাছে অস্ত্র রাখার একটি ব্যাগ ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন মূল শুটারের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র তাঁর কাছে রাখা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সন্দেহভাজন শুটার হিসেবে তাইজুলের নাম
১৯ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির বক্তব্য উদ্ধৃত করে সন্দেহভাজন মূল শুটার হিসেবে তাইজুলের নাম সামনে রেখে তদন্তের কথা বলা হয়েছে।
খবরের কাগজের ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে দুর্গাপুর থানার ওসির বরাতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় অপূর্ব গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই মামলায় তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওসি আরও দাবি করেন, শফিকুল ইসলামের সঙ্গে আলিফের চেহারার মিল ছিল। আলিফকে লক্ষ্য করে হামলার বদলে ভুল করে শফিকুলকে হত্যা করা হয়েছিল কি না, এমন একটি ধারণার কথাও তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান।
আগের হামলার মামলার আসামিরা জামিনে ছিলেন
আলিফ হত্যার প্রায় ১১ মাস আগে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর, দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল। ওই ঘটনায় আলিফ ও তাঁর সহকর্মী শাহজাহান শেখ আক্রান্ত হন। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলিফ এ ঘটনায় মামলা করেছিলেন।
প্রথম আলোকে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, আগের হামলার মামলায় দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল এবং তাঁদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। পরে তাঁরা জামিনে মুক্ত হন। আলিফ হত্যার পর থেকে ওই দুই আসামি পলাতক বলে পুলিশ সুপার সংবাদমাধ্যমকে জানান।
প্রায় ১১ মাস আগে প্রাণনাশের আশঙ্কা জানিয়েছিলেন আলিফ
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় আলিফ নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ভিডিওটির বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ভিডিওতে আলিফ বলেন, তাঁর কাছে বার্তা এসেছে যে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা তাঁকে গুলি করার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং সেসব বিষয়ে তাঁর প্রতিবেদন প্রকাশের কথাও তুলে ধরেন।
আলিফের অভিযোগ ছিল, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আলিফ তাঁর কার্যালয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর জানানো আশঙ্কা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ সুপার আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগেও, ৫ অক্টোবর, আলিফ তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
ব্লাস্টের দাবি: দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিচার
১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্লাস্ট আলিফ হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানায়। সংগঠনটি দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাঁদের বিচারের দাবি জানায়।
ব্লাস্ট বলেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন, সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যক্তিগত বিরোধসহ যে কারণেই হত্যাকাণ্ড ঘটুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নেরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম (কিউআরএস) আগের হামলা ও প্রাণনাশের আশঙ্কার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
আলিফ রূপসী বাংলা নামের একটি বেসরকারি আইপিটিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে স্থানীয় অপরাধ, মাদক কারবার, চোরাচালান ও অনিয়ম নিয়ে লিখতেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
১৫ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, হামলাকারীদের পরিচয়, অস্ত্রের উৎস, সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা এবং আগের হামলার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে পাওয়া জরুরি।
১৯ অক্টোবর আদালত অপূর্বর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এখন তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো: প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিলেন আলিফ
- দ্য ডেইলি স্টার: অপূর্বর এক দিনের রিমান্ড
- খবরের কাগজ: অপূর্বর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন ও আগের মামলা
- বিডিনিউজ২৪: আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার
- ব্লাস্ট: মূল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
- দ্য ডেইলি স্টার: আগের হুমকি তদন্তের দাবি
- দ্য ডেইলি স্টারে এইচআরএসএস ও কিউআরএসের প্রতিক্রিয়া





