মানুষের কথা বলার অধিকার আছে। নিজের মত প্রকাশের অধিকার আছে। প্রশ্ন করার, দ্বিমত পোষণ করার এবং তথ্য জানার অধিকার আছে। একই সঙ্গে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করাও একটি মুক্ত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
কিন্তু আমরা কি সত্যিই অন্যের কথা বলতে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত? নিজের মতের পক্ষে কথা বলার সুযোগ চাই, অথচ ভিন্নমত সামনে এলে অনেক সময় তা সহ্য করতে পারি না। কোনো বক্তব্য অপছন্দ হলে তার যুক্তিসংগত জবাব দেওয়ার পরিবর্তে বক্তব্যটিকেই থামিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র—বিভিন্ন পর্যায়ে এই প্রবণতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে।
‘খোলামেলা কথা বলুন। অন্যকেও বলতে দিন।’
এটি FoEBD (Freedom of Expression Bangladesh) -এর স্লোগান। এর ভিত্তি কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ বা নিছক মতাদর্শ নয়। মতামত ধারণ, প্রকাশ এবং তথ্য আদান-প্রদানের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল ও বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত। এই অধিকারকে সম্মান করা, এর প্রয়োগে বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আনা—এসবই আমাদের কাজের প্রাসঙ্গিক ভিত্তি।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এর ১৯ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের মতামত ধারণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো মাধ্যমে এবং সীমান্ত নির্বিশেষে তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং প্রকাশ করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শুধু কথা বলার সুযোগ হিসেবে দেখেনি; তথ্য অনুসন্ধান, গ্রহণ এবং আদান-প্রদানের অধিকারকেও এর অংশ করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদেও চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনে নির্ধারিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে নাগরিকের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকৃত।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই অধিকার সুরক্ষিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে (ICCPR) যোগ দেয়। চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদে মতামত ধারণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে।
এসব দলিলের তাৎপর্য স্পষ্ট। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিক, লেখক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের অধিকার। সাংবাদিকতা এই অধিকার চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, কিন্তু এর পরিধি তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
নিজের অধিকার, অন্যের অধিকার
নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দাবি করা এবং অন্যের সেই অধিকারকে সম্মান করা—দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
কেউ সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে পারেন। কেউ সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক অনিয়ম কিংবা মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। আবার কেউ প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারেন। এসব বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত নাও হতে পারি।
কিন্তু দ্বিমত পোষণ করা আর অন্যের বক্তব্য প্রকাশের অধিকার অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। এর অর্থ হলো, ভিন্নমতের জবাব দেওয়ার সুযোগ থাকা এবং শুধু মতের অমিলের কারণে কাউকে নীরব করে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা।
একটি মুক্ত সমাজে বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে, যুক্তির আদান-প্রদান থাকবে। ভুল বক্তব্যের প্রতিবাদ করা যাবে। তথ্যগত ভুল সংশোধনের দাবি জানানো যাবে। কিন্তু যুক্তির পরিবর্তে ভয় দেখানো, হুমকি কিংবা অযাচিত চাপ প্রয়োগ করে কাউকে কথা বলা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির ১৯(৩) অনুচ্ছেদে অন্যের অধিকার ও সুনাম রক্ষা এবং নির্দিষ্ট জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যে আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় সীমাবদ্ধতার সুযোগ রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা অবশ্যই নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কোনো বক্তব্য অপছন্দের হলেই সেটিকে দমন করার বৈধতা তৈরি হয় না।
সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অধিকারটি সবার
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আলোচনায় সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের প্রসঙ্গ বারবার আসে। এর কারণও রয়েছে। সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহ করেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে জানানোর চেষ্টা করেন। স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে তাঁদের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা তাই গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের কারণে হুমকি, হামলা, হয়রানি কিংবা অন্যায় চাপের মুখে পড়ার অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করা দরকার।
কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন কেবল সংবাদমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন লেখক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, শিল্পী, অধিকারকর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিকও নিজের মত প্রকাশের কারণে বাধার মুখে পড়তে পারেন। ডিজিটাল মাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশ, কোনো বই বা শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করাও মতপ্রকাশের অংশ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪-এ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এই বিস্তৃত পরিসর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনা, জনস্বার্থের বিষয়ে মন্তব্য, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলার প্রকাশ এবং তথ্যপ্রাপ্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, সাংবাদিকের অধিকার রক্ষা বৃহত্তর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সাংবাদিকদের বাইরে অন্য মানুষের কণ্ঠস্বর, অভিজ্ঞতা ও অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নীরবতার কারণও জানতে হবে
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। কখনো হুমকি দেওয়া হয়, কখনো হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়, আবার কখনো সামাজিক চাপ বা পেশাগত অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ নিজের বক্তব্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন।
ডিজিটাল পরিসরেও হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ভয় এবং অনলাইন আক্রমণ মানুষের মতপ্রকাশের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
এসব পরিস্থিতি বুঝতে হলে শুধু প্রকাশিত বক্তব্যের দিকে তাকালে চলবে না। কোথায় মানুষ কথা বলতে পারছেন না, কেন পারছেন না, কারা বাধার মুখে পড়ছেন এবং সেই বাধার প্রভাব কী—এসব প্রশ্নও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখতে হবে। কোনো ঘটনা সম্পর্কে অভিযোগ ওঠা মানেই অভিযোগটি প্রমাণিত হওয়া নয়। তথ্য, নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার প্রকৃতি ও দায় সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার কাজেও তথ্যের যথার্থতা ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার গুরুত্ব কম নয়।
FoEBD-এর ভূমিকা
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি স্বীকৃত অধিকার—কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার কোথায়, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা জানা জরুরি। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথি ছাড়া এসব ঘটনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করা কঠিন।
FoEBD মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ ও ঘটনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং নথিবদ্ধ করার গুরুত্বকে সামনে রাখতে চায়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসংক্রান্ত ঘটনাও এই কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি অধিকার, আইন, গবেষণা এবং প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন আলোচনা ও জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
আমাদের কাছে কোনো ঘটনা নথিবদ্ধ করা মানে শুধু একটি অভিযোগ প্রকাশ করা নয়। ঘটনার সময়, স্থান, প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট পক্ষ, প্রাপ্ত প্রমাণ এবং যাচাইয়ের অবস্থা যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব না হলে তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী আগের নথি পর্যালোচনা ও সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
আমরা মনে করি, অধিকার রক্ষার কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্যের নির্ভুলতা, সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃতি বোঝা এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সামনে আনাই গুরুত্বপূর্ণ।
FoEBD-এর লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট পেশা বা মতাদর্শের মানুষের জন্য একচেটিয়া পরিসর তৈরি করা নয়। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সবার মতপ্রকাশের অধিকার এবং এই অধিকার চর্চার পথে তৈরি হওয়া বাধাগুলোকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
ভিন্নমত থাকুক, অধিকার অক্ষুণ্ন থাকুক
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা সংবাদমাধ্যমের নয়। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক উদ্যোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং নাগরিক সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে।
প্রত্যেকেরই ভাবতে হবে, নিজের মত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অন্যের অধিকার রক্ষায় তিনি কতটা প্রস্তুত। নিজের মতের বিরোধী বক্তব্যের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তথ্যগত ভুলের সংশোধন হতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে। কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ন্যায্য প্রক্রিয়ায়।
একটি মুক্ত সমাজে মানুষের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকবে। সেই পার্থক্য দূর করাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উদ্দেশ্য নয়। বরং মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা, পরস্পরের বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের কথা বলার অধিকার দাবি করা সহজ। নিজের মতের বিরোধী মানুষের কথা বলার অধিকারও সমান গুরুত্বে স্বীকার করা—সেখানেই আমাদের মূল্যবোধের প্রকৃত পরীক্ষা।
আমরা এমন একটি সমাজের পক্ষে, যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে পারবেন, নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারবেন এবং ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারবেন। যেখানে বক্তব্যের জবাব দেওয়া হবে যুক্তি দিয়ে, ভুলের সংশোধন হবে তথ্যের ভিত্তিতে এবং অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কারও কণ্ঠস্বরকে অগ্রাহ্য করা হবে না।
খোলামেলা কথা বলুন। অন্যকেও বলতে দিন।
এটি শুধু আমাদের স্লোগান নয়; এটি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সেই অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান।
তথ্যসূত্র
১. সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, অনুচ্ছেদ ১৯
২. নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR), অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২০
৩. বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৯
৪. সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪ (২০১১): মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা