কুমিল্লায় জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ ও বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিজিটিং কার্ড দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বলা, সরাসরি সাক্ষাৎ না দেওয়া, ফোনে কথা না বলা এবং বক্তব্যের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা অন্য কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটেছে।
এ বিষয়ে দৈনিক আমার দেশ-এর কুমিল্লা প্রতিনিধি এম হাসান এবং ডিবিসি নিউজের কুমিল্লা প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন তাঁদের পৃথক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক নেতাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীতে WE NEWS-এও স্থানীয় সাংবাদিকদের একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বক্তব্য নিতে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ না পাওয়ার অভিযোগ
দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য জানতে এম হাসান কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তিনি ভিজিটিং কার্ড পাঠান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর একজন সহকারী কমিশনার এসে জানান, জেলা প্রশাসক তাঁকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অনুরোধ করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি বলে জানান।
একই প্রতিবেদনে ডিবিসি নিউজের কুমিল্লা প্রতিনিধি নাসির উদ্দিনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নিতে তিনি কার্যালয়ে গেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তাঁকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)-এর বক্তব্য নিতে বলা হয়। নাসির উদ্দিন জানান, বিষয়টি যেহেতু নারীসংক্রান্ত, তাই জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পেলে প্রতিবেদনটি আরও সমৃদ্ধ হতো।
ফোনে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অভিযোগ
একজন সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি ভবনের মালামাল লুটের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নিতে তিনি ফোন করেছিলেন। তাঁর দাবি, জেলা প্রশাসক ফোনে কথা না বলে WhatsApp-এ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তারও নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁরা সাংবাদিকদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন।
সাংবাদিক নেতাদের বক্তব্য
কুমিল্লার কয়েকজন সাংবাদিক নেতা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সদস্য ও এখন টিভির ব্যুরো প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, জেলা প্রশাসকের উচিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, যাতে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য গণমাধ্যমে না আসে।
বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহাজাদা এমরান বলেন, সাংবাদিকরা জনগণের বিভিন্ন সমস্যা, নাগরিক সুবিধা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে যান। তাঁর মতে, জেলা প্রশাসকের নিজস্ব বিষয় হলে সরাসরি তাঁর বক্তব্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, বিষয়টি সত্য হলে প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
প্রেস ক্লাবের সভাপতি কাজী এনামুল হক ফারুক এবং সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুলও সাংবাদিকদের বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
সাংবাদিকদের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার বা কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং WhatsApp-এ পাঠানো মেসেজেরও উত্তর পাওয়া যায়নি।
এই প্রতিবেদনের প্রকাশ পর্যন্তও জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা বা লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তথ্য জানার অধিকার ও প্রশাসনের জবাবদিহি
সরকারি প্রশাসনের কার্যক্রমের সঙ্গে জনগণের স্বার্থ সরাসরি যুক্ত। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মামলা, নাগরিক সেবা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সরকারি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকরা তথ্য ও বক্তব্য চাইতে পারেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ সত্য বা অসত্য—তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নথি এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য জানার এবং তথ্য জানানোর অধিকার শুধু সাংবাদিকদের বিষয় নয়; এটি জনগণেরও অধিকার। প্রশাসনের কাছে থাকা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য জনগণের সম্পদ। সাংবাদিকরা সেই তথ্য সংগ্রহ ও জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।
তাই প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ, তথ্যের সহজপ্রাপ্যতা এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ; WE NEWS।





