গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক আমার দেশ–এর কোটালীপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৭ জুলাই গোপালগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগে মামলা করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। স্থানীয় সাংবাদিকরা অভিযোগ করেছেন, অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়াতেই সাংবাদিককে আইনি হয়রানির মুখে ফেলা হয়েছে। তবে মামলার বাদী ঠিকাদারের অভিযোগ, সাংবাদিকসহ কয়েকজন তার কাছে অর্থ দাবি করেছিলেন এবং কাজে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ চলাকালে মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল ও অজ্ঞাত ৪-৫ জন ব্যক্তি ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেনের কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় এবং পরে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা সড়কের কার্পেটিং তুলে ফেলেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক সাংবাদিকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাদের দাবি, উপজেলার শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং বিভিন্ন কারিগরি অনিয়মের অভিযোগ ছিল। গত ৩০ জুন এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। একই সময় স্থানীয়রা হাত দিয়ে সড়কের পিচ উঠে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী রাস্তার দুই পাশে মাটির শোল্ডার নির্মাণ করা হয়নি। এজিংয়ে পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া প্রাইম কোট ও ট্যাক কোট যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় এবং বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের মান বজায় না রাখায় কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে ৬ জুলাই আমার দেশ–এর অনলাইন সংস্করণে “কোটালীপাড়ায় সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, কার্পেটিং উঠে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপরই সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কালবেলা–এর জেলা প্রতিনিধি জুবায়ের হোসেন বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গোপালগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সময় টেলিভিশন–এর প্রতিনিধি জয়ন্ত শিরালী জয় বলেন, তিনিও ওই সড়কের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল কার্পেটিংয়ের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। তাই তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং মামলা প্রত্যাহার করা উচিত।
কোটালীপাড়া থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি সুধান্য ঘরামী বলেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয় এবং উপজেলা প্রশাসনও একাধিকবার বিষয়টি পরিদর্শন করেছে।
সড়কসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় বিএনপির নেতা গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় এলাকাবাসীকেও চাঁদাবাজি মামলার ভয় দেখানো হয়েছিল। তার দাবি, যেখানে অনিয়মের তদন্ত হওয়ার কথা, সেখানে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ঘটনার ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগুফতা হক জানান, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওও প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিষয়টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এহসানুল হক বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী কাজ করতে হবে।
প্রায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দায়িত্ব পায় চুয়াডাঙ্গাভিত্তিক জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। স্থানীয়ভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করছিলেন ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেন।
এ বিষয়ে ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তথ্যসূত্র:
দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক কালবেলা, সময় টেলিভিশন, স্থানীয় সাংবাদিকদের তথ্য ও সাক্ষাৎকার, উপজেলা প্রশাসন ও এলজিইডির বক্তব্য





