খুলনায় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সদ্য বহিষ্কৃত নেতা আসাদুজ্জামান মিঠুকে গ্রেপ্তার করেছে নগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে খুলনা নগরীর খালিশপুরের নতুন রাস্তা এলাকা থেকে মিঠুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি খুলনা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সুলতান মাহমুদের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় তিনি খুলনা থেকে বেনাপোলের দিকে যাচ্ছিলেন।
১৪ জুলাই সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি
ঘটনাটি ঘটে ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে খুলনা নগরীর জাতিসংঘ শিশু পার্কের পশ্চিম পাশে আবদুল জলিলের চায়ের দোকানের সামনে। সেখানে কয়েকজন সাংবাদিক পেশাগত কাজ শেষে বসে কথা বলছিলেন।
পুলিশের করা মামলার এজাহার এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেলে আসা দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি এসএ টিভির খুলনা প্রতিনিধি রকিবুল ইসলাম মতির বসে থাকা টুলে আঘাত করে। পরে গুলির ছিটকে আসা অংশ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খুলনা ব্যুরো প্রধান আব্দুল আওয়াল শেখের বুকের ডান পাশে লাগে। তিনি চিকিৎসা নেন।
ঘটনাস্থলে রকিবুল ইসলাম মতি, স্টার নিউজের খুলনা ব্যুরো প্রধান রাফিউল ইসলাম টুটুল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের আওয়াল শেখ এবং সাংবাদিক সৈয়দ রানা কবীরসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
গুলিবর্ষণের পর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঘটনাটি সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করে এবং স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। পরদিন খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।
পুলিশের মামলা ও তদন্ত
ঘটনার পর ১৬ জুলাই খুলনা সদর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করে। মামলার এজাহারে ঘটনাটিকে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে সংঘটিত হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার তদন্তের অংশ হিসেবেই আসাদুজ্জামান মিঠুকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে খুলনা মহানগর ডিবির প্রধান মো. আহাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, মিঠুর বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ওপর গুলির ঘটনায় এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাঁকে মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে তাঁর ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, মিঠুর সঙ্গে খুলনার ‘গ্রেনেড বাবু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির কথিত সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই অভিযোগগুলো তদন্তাধীন; এগুলোকে আদালতে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
রাজনৈতিক পরিচয় ও বহিষ্কার
আসাদুজ্জামান মিঠু খুলনা মহানগর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এর আগে জুন মাসে প্রথম আলো-র একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে খুলনায় রাজনৈতিক প্রভাব, দখল ও অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে মিঠুর নামও স্থানীয় রাজনৈতিক ও অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রসঙ্গে এসেছিল। তবে ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো মিঠু অস্বীকার করেছিলেন।
সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
১৪ জুলাইয়ের গুলির ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। সংগঠনটি বলেছিল, সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের হামলা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) ঘটনাটিকে media freedom-এর ওপর হামলা হিসেবে উল্লেখ করে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের দাবি জানায়। সংস্থাটি বিশেষভাবে হামলার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনাকারী এবং সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের সঙ্গে হামলার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—তা তদন্তের আহ্বান জানায়।
আসাদুজ্জামান মিঠুর গ্রেপ্তার এই মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও, হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য, হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল এবং এর পেছনে অন্য কেউ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
তথ্যসূত্র:
The Financial Express, Ajker Patrika, bdnews24.com, The Business Standard, Transparency International Bangladesh, আমার দেশ, প্রথম আলো





