ফটিকছড়িতে সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে জিডি করেছেন দৈনিক মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি শাহনেওয়াজ নাজিম। সংবাদ প্রকাশের জেরে এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ সময়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিতও করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিককে হত্যার হুমকির অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফটিকছড়ি সদরের ‘সেবা ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাব ইন’ নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে একটি সংবাদ প্রকাশ করেন দৈনিক মানবকণ্ঠের উপজেলা প্রতিনিধি শাহনেওয়াজ নাজিম।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পর ২০ জুন তাকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং একপর্যায়ে “আছড়ে মেরে ফেলবো” বলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সাংবাদিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে পরদিন ২১ জুন ফটিকছড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সাংবাদিক শাহনেওয়াজ নাজিম।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য
সাংবাদিক শাহনেওয়াজ নাজিম বলেন, তিনি জনস্বার্থে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবাদ প্রকাশের কারণে একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হুমকি ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্যমতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার জন্যও একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য অভিযুক্ত যুবদল নেতা আহম্মদ রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর ফটিকছড়ি প্রেসক্লাব, উপজেলা প্রেসক্লাব এবং ফটিকছড়ি মফস্বল সাংবাদিক ফোরামসহ স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে।
ফটিকছড়ি মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি কামাল উদ্দিন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক মামুন বশর ভূঁইয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্থানীয় সাংবাদিক নেতাদের মতে, সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হুমকি দেওয়া হলে তা জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের পরিবেশকে সংকুচিত করে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, বিষয়টি তার অবগতিতে রয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও সংযম প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফটিকছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীরও ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বলেন, কারও সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ কাম্য নয়। তিনি উভয় পক্ষকে সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম খান জানিয়েছেন, সাংবাদিকের অভিযোগের ভিত্তিতে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট
সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে সামনে নিয়ে আসে।
গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মতে, সাংবাদিকদের ওপর চাপ, হুমকি বা প্রতিশোধমূলক আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে দুর্বল করে। বিশেষ করে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হলে তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, ফটিকছড়ির ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সোর্স
১. ভুক্তভোগী সাংবাদিক শাহনেওয়াজ নাজিমের বক্তব্য ও সাধারণ ডায়েরির তথ্য।
২. ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম খানের বক্তব্য।
৩. ফটিকছড়ি প্রেসক্লাব, উপজেলা প্রেসক্লাব এবং ফটিকছড়ি মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের প্রতিক্রিয়া।
৪. উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীরের বক্তব্য।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও এবং স্থানীয় সাংবাদিক সূত্র।





