কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সাংবাদিক সাখাওয়াত হোসেনকে মামলা, গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমানের বিরুদ্ধে।সাখাওয়াত হোসেন দৈনিক কালবেলার রৌমারী উপজেলা প্রতিনিধি।
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের দিন বিকেলে এসিল্যান্ডের সরকারি নম্বরে ফোন করেন সাখাওয়াত। উদ্দেশ্য ছিল আরেক সাংবাদিকের বাড়িতে চালানো অভিযানের বিষয়ে জানতে চাওয়া। সাখাওয়াতের অভিযোগ, ফোনে কথা বলার একপর্যায়ে রাফিউর রহমান তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। এরপর তাকে মামলা, গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
সাখাওয়াতের দাবি, তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও তোলা হয়। তিনি বলেন, তাকে উদ্দেশ করে বলা হয়—তার বিরুদ্ধে করা প্রতিবেদনগুলোর জন্য তাকে ‘দেখে ছাড়বেন’। এরপর গুম বা হত্যার বিষয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। হুমকির পর নিরাপত্তা চেয়ে রৌমারী থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) আবেদন করেন সাখাওয়াত।
রৌমারী থানার ওসি কাওসার আলী আবেদন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগেও প্রতিবেদন করেছিলেন সাখাওয়াত
সাখাওয়াতের দাবি, রাফিউর রহমানের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি আগে একাধিক প্রতিবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪ মে একটি প্রতিবেদনে এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘুষ না দেওয়ায় ভুল রায় দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। ৮ জুলাই প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে চেইনম্যানকে কানুনগো হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের কথা বলা হয়। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই এসিল্যান্ড তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে দাবি করেন সাখাওয়াত।
এর একদিন আগে আরেক সাংবাদিকের বাড়িতে অভিযান
হুমকির অভিযোগের একদিন আগে রৌমারীর সবুজপাড়া এলাকায় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সাজুর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সাজু দৈনিক মানবজমিনের রৌমারী উপজেলা প্রতিনিধি। ৩ সেপ্টেম্বর সকালে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বাড়িটিতে তল্লাশি চালান এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান। অভিযানের কারণ হিসেবে মাদক থাকার তথ্য পাওয়ার কথা জানান তিনি। তবে তল্লাশিতে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি।
সাজুর অভিযোগ, জমির নামজারি বাতিলের আইনগত ভিত্তি নিয়ে এসিল্যান্ডকে প্রশ্ন করার পরদিনই তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
অন্যদিকে রাফিউর রহমান দাবি করেন, নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সাজু যে সাংবাদিক, তা তিনি জানতেন না।
তদন্ত কমিটি গঠন
সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে অভিযানের ঘটনায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)কে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিকে ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় থেকেও এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। অভিযানের পেছনে কোনো ‘খারাপ উদ্দেশ্য’ ছিল কি না, তা তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
বদলি হয়েছেন এসিল্যান্ড
এরই মধ্যে রাফিউর রহমানকে রৌমারী থেকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভূমি সেবা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম নিয়ে আগেও অভিযোগ উঠেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সাংবাদিক সাখাওয়াত হোসেনকে গুম বা হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে রাফিউর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন
একজন সাংবাদিকের প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তার ক্ষোভ থাকা নিজেই একটি বিষয়। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি মামলা, গুম বা হত্যার হুমকিতে রূপ নেয়, তাহলে তা সাংবাদিকের নিরাপত্তার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপরও সরাসরি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে অভিযোগটি এমন একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, যিনি স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র
- বাংলা ট্রিবিউন — সাংবাদিককে হুমকির প্রতিবেদন
- বাংলা ট্রিবিউন — সাংবাদিকের বাড়িতে অভিযানের প্রতিবেদন
- বাংলা ট্রিবিউন — তদন্ত কমিটি ও বদলির আপডেট
- কালবেলা — সাংবাদিককে গুম-হত্যার হুমকির প্রতিবেদন
- কালবেলা — সাংবাদিকের বাড়িতে তল্লাশির প্রতিবেদন
- যুগান্তর — সাংবাদিকের বাড়িতে তল্লাশির প্রতিবেদন
- ঢাকা ট্রিবিউন — তদন্ত কমিটি সংক্রান্ত প্রতিবেদন





