হবিগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা রফিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে চিকিৎসায় ভুল ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে হবিগঞ্জ শহরের বেসরকারি চাঁদের হাসি হাসপাতাল লিমিটেডে তাঁর মৃত্যু হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস আদেশের বরাত দিয়ে একাধিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গোলাম মোস্তফা রফিক ছিলেন স্থানীয় দৈনিক হবিগঞ্জ সমাচার-এর সম্পাদক এবং হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। তিনি হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিটের আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ৮০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
অসুস্থতার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন গোলাম মোস্তফা রফিক। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সোমবার বিকেলে তাঁকে হবিগঞ্জ শহরের চাঁদের হাসি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে তিনি হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে তাঁর স্বজনদের উদ্ধৃত করে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরই চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগ সামনে আসে।
স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসার সময় এমন একটি চিকিৎসা-প্রক্রিয়া বা ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। স্থানীয় কয়েকটি প্রতিবেদনে চিকিৎসক ও তাঁর সহকারীর ভূমিকা নিয়েও স্বজনদের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
মৃত্যুর পর হাসপাতালে ক্ষোভ
রফিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চাঁদের হাসি হাসপাতাল এলাকায় সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, স্বজন, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হন। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিয়ে সেখানে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে এবং স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে হাসপাতালে যান হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ, জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ, পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ, সিভিল সার্জন ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাসসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার রাতেই তদন্ত কমিটি গঠন করেন জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাসকে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—পুলিশ সুপারের মনোনীত প্রতিনিধি; জেলা প্রশাসকের মনোনীত প্রতিনিধি ও হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের একজন প্রতিনিধি।
কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা
গোলাম মোস্তফা রফিক শুধু স্থানীয় সাংবাদিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; হবিগঞ্জের সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্থানীয় সংবাদপত্র “হবিগঞ্জ সমাচার” সম্পাদনা করতেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিনি হবিগঞ্জ পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়কও ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধারা হাসপাতালে ছুটে যান। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা মহলে শোকের পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থা ও রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তের ফলের অপেক্ষা
গোলাম মোস্তফা রফিকের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদন্তের ফল। অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, ব্যবহৃত ওষুধ বা ইনজেকশনের তথ্য, চিকিৎসকদের বক্তব্য, হাসপাতালের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকায় এখন প্রশাসনের তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা—চিকিৎসায় কোনো ভুল বা কর্তব্যে অবহেলা হয়েছিল কি না এবং তা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল কি না।
প্রবীণ এই সাংবাদিকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর তদন্তের ফল প্রকাশ করা তাই শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, হবিগঞ্জের সাধারণ রোগী ও বৃহত্তর জনস্বার্থের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), দ্য ডেইলি স্টার, যুগান্তর, জাগো নিউজ, সিলেট ভয়েস২৪, ঢাকা টুডে, হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস।





