গাজীপুর মহানগরের ব্যস্ত চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে। রাতের ব্যস্ত সড়কে প্রাণ বাঁচাতে তিনি একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হামলাকারীরা দোকানের ভেতরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হত্যাকাণ্ডটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
তুহিন ছিলেন জাতীয় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর স্টাফ রিপোর্টার। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি গাজীপুরে বসবাস করতেন এবং স্থানীয় বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতেন।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন তাঁর বড় ভাই মো. সেলিম বাসন থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। একই সময়ে গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি) তদন্ত শুরু করে এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
প্রথমে পাঁচজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে সাত আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং অন্তত একজন আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে তদন্তকারী সংস্থা জানায়।
ঘটনার মাত্র ১১ কর্মদিবসের মধ্যে, ২৫ আগস্ট ২০২৫, পুলিশ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে এটি তুলনামূলক দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার একটি উদাহরণ।
তদন্ত শেষে পুলিশ দাবি করে, সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন কোনো একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কর্মকাণ্ড মোবাইল ফোনে ধারণ করেছিলেন। সেই ভিডিও মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে হামলাকারীরা তাঁকে হত্যা করে। তবে এটি তদন্তকারী সংস্থার উপসংহার; মামলাটি এখনও বিচারাধীন থাকায় হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
২০২৬ সালের মধ্যে মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং একাধিক সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ৭ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মামলার রায় হয়নি এবং বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। গাজীপুর প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা দ্রুত বিচার এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্তিতে, ৭ আগস্ট ২০২৬, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তার ‘তুহিন চত্বর’-এ বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাংবাদিকদের পাশাপাশি তুহিনের পরিবারের সদস্যরাও অংশ নেন। কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা বা হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপরও আঘাত। তারা তুহিন হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন, অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে তুহিন হত্যা মামলার স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে।
এক নজরে টাইমলাইন
| তারিখ | অগ্রগতি |
|---|---|
| ৭ আগস্ট ২০২৫ | গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা |
| ৮ আগস্ট ২০২৫ | বাসন থানায় হত্যা মামলা দায়ের |
| ৮–৯ আগস্ট ২০২৫ | সন্দেহভাজনদের আটক ও পরবর্তীতে মোট ৮ জন গ্রেপ্তার |
| আগস্ট ২০২৫ | সাত আসামির রিমান্ড; একজনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি |
| ২৫ আগস্ট ২০২৫ | আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল |
| ২০২৬ | সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু; বিচারিক কার্যক্রম চলমান |
| ৪ আগস্ট ২০২৬ | প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী বিচার শেষ হয়নি |
নোট
এই প্রতিবেদনটি একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অধিকারবিষয়ক সংস্থা এবং প্রকাশ্যে উপলব্ধ বিচারিক তথ্য পর্যালোচনা করে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্যকে অভিযোগ বা তদন্ত-উপসংহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
তথ্যসূত্র
প্রথম আলো, BBC News বাংলা, Committee to Protect Journalists (CPJ), NTV Online, বাংলা ট্রিবিউন, FoEBD গবেষণা ও তথ্য যাচাই।





