সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাংবাদিকদের জন্য তথ্য বিনিময়, জনসম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত মত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই পরিসর ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। মামলা, সরকারি চাপ, অনলাইন হয়রানি, হুমকি, পেশাগত ক্ষতি কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আশঙ্কায় অনেক সাংবাদিক এখন কী বলবেন, কী লিখবেন বা কী প্রকাশ করবেন—তা নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক।
কিছু ক্ষেত্রে এই সতর্কতা আত্মসংযমে রূপ নিচ্ছে। অর্থাৎ সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও সম্ভাব্য পরিণতির আশঙ্কায় কেউ নিজেই মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকছেন।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা পাকিস্তানে এই উদ্বেগকে আবার সামনে এনেছে। আগস্টে দেশটির সরকার বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত পাকিস্তানি সাংবাদিক, ফিক্সার ও অন্য কর্মীদের চলাচল ও রিপোর্টিংয়ের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে। ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে তাদের সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এটি স্বাধীন রিপোর্টিং ও আত্মসংযমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। (Reuters)
পাকিস্তানে অনলাইন মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও চাপ রয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে Prevention of Electronic Crimes Act বা PECA-তে আনা সংশোধনগুলো অনলাইনে তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও সমালোচনামূলক মত দমনে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। RSF-এর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনটির অস্পষ্ট বিধান কর্তৃপক্ষের হাতে তথ্য নিয়ন্ত্রণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। (Reporters Without Borders)
বাংলাদেশের চিত্র কী বলছে?
এই বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু তথ্যের মিল পাওয়া যায়।
আগস্ট ২০২৬-এ Dataful-এর ‘Expression Pulse – Journalists’ Digital Freedom Monitor’-এর প্রথম পর্বে ২২ জন সাংবাদিকের ওপর একটি সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষাটি জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল নয়। তবে সাংবাদিকদের অনলাইন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি, ভয় এবং আচরণগত পরিবর্তনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকেত তুলে ধরে। (Google)
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে সম্ভাব্য পরিণতির আশঙ্কায় তারা কোনো না কোনো সময় নিজেদের মত প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন। তাদের মধ্যে ১৩ জন বলেছেন, তারা প্রায়ই এমনটা করেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৫ জন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ছয় মাস আগের তুলনায় এখন তারা নিজেদের মত প্রকাশ করতে কম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর ১৯ জন বলেছেন, তারা এখন প্রকাশ্যে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলেন। (Google)
এড়িয়ে চলা বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি, সরকারের সমালোচনা, ধর্ম, সাম্প্রদায়িক ইস্যু, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, ধর্ষণ, পররাষ্ট্রনীতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা।
অন্য সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি বা হুমকির ঘটনাও যে সাংবাদিকদের নিজস্ব মত প্রকাশে প্রভাব ফেলছে, সেটিও সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া ২১ জনের সবাই বলেছেন, অন্য কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি, হয়রানি বা নেতিবাচক পরিণতির ঘটনা তাদের নিজেদের মত প্রকাশকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে ১২ জন বলেছেন, প্রভাবটি ‘উল্লেখযোগ্য’; আর ৯ জন বলেছেন, ‘কিছুটা’ প্রভাব পড়ে। (Google)
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক সময় ‘chilling effect’ বলা হয়। অর্থাৎ কাউকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও অন্যের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা, হামলা, মামলা বা হয়রানির ঘটনা দেখে অন্যরা সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কায় নিজেরাই কথা বলা বা মত প্রকাশ সীমিত করে ফেলেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা মনে রাখা প্রয়োজন। Dataful-এর এই ছোট পরিসরের সমীক্ষা থেকে বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের পরিস্থিতি সম্পর্কে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। একইভাবে, এই সমীক্ষা থেকে এমনও বলা যাবে না যে সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছেন বা সংবাদসংক্রান্ত তথ্য গোপন করছেন।
সমীক্ষাটি মূলত সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও অনলাইন মত প্রকাশের আচরণে পরিবর্তন নিয়ে কাজ করেছে।
কর্মক্ষেত্রেও কি বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ?
বাংলাদেশে সম্প্রতি এমন একটি ঘটনাও সামনে এসেছে, যা সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত অনলাইন মত প্রকাশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজ কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আপত্তিকর ও বিব্রতকর’ লেখা প্রকাশের বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীণ নোটিশ দেয়। নোটিশের একটি কপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে নিজ প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে ‘বিব্রত’ করে—এমন লেখা প্রকাশ, প্রচার বা শেয়ার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। (Facebook)
নির্দেশনা অমান্য করলে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। এটি অবশ্যই একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা। তাই এটিকে দেশের সব গণমাধ্যম বা সব সাংবাদিকের জন্য প্রযোজ্য পরিস্থিতির প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তবে ঘটনাটি সাংবাদিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ এবং কর্মক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
আত্মসংযম বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নতুন নয়
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের আত্মসংযমের প্রবণতা নতুন কোনো বিষয় নয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘Private self-censorship’ as the Achilles’ heel of journalistic professionalism: Evidence from Bangladesh শীর্ষক গবেষণায় ৩৭ জন বাংলাদেশি সাংবাদিকের বক্তব্য, লেখা ও প্রকাশিত সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে আত্মসংযমের কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ছিল আইনি বাধা, সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের চাপ, গণমাধ্যমের মালিকানার কাঠামো, বিজ্ঞাপননির্ভরতা, সাংবাদিকের রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শ এবং ধর্মীয় বিষয়। (Sage Journals)
এর আগেও বাংলাদেশি সাংবাদিকদের আত্মসংযম নিয়ে ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সাংবাদিকদের মধ্যে এই প্রবণতা ব্যাপক ছিল। পরে রয়টার্স ইনস্টিটিউটের একটি আলোচনায় গবেষকরা উল্লেখ করেন, চাকরি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সাংবাদিকরা আত্মসংযম অবলম্বন করতেন। (reutersinstitute.politics.ox.ac.uk)
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠলেও সেখানে প্রকাশিত একটি বক্তব্যের প্রভাব কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিচিতি, পেশাগত অবস্থান এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর বাস্তবতা
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সামগ্রিক পরিবেশও এই উদ্বেগকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) ২০২৬ বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম সূচকে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম, পাকিস্তান ১৫৩তম এবং ভারত ১৫৭তম অবস্থানে রয়েছে। (Reporters Without Borders)
এই সূচক সরাসরি সাংবাদিকদের অনলাইনে মত প্রকাশের ভয় বা আত্মসংযম পরিমাপ করে না। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সামগ্রিক পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট দেয়। বাংলাদেশেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। RSF-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রোফাইলেও বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের ওপর চাপ এবং সংবাদকক্ষে আত্মসংযমের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। RSF-এর বাংলাদেশ প্রোফাইল (Reporters Without Borders)
এই বাস্তবতায় অনলাইনে সাংবাদিকদের ‘গুটিয়ে নেওয়া’কে শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অন্য সাংবাদিকদের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং সম্ভাব্য পরিণতির আশঙ্কা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে কী লিখছেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কেউ কিছু লিখতে চেয়েও লিখছেন না কেন?
সাংবাদিকরা যখন সম্ভাব্য হয়রানি, মামলা, চাকরি হারানো, সামাজিক আক্রমণ কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকির কথা ভেবে নিজের বক্তব্য প্রকাশের আগেই আটকে দেন, তখন সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও মত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হতে থাকে। এই সংকোচনের প্রভাব শুধু সাংবাদিকের ওপর পড়ে না। এর প্রভাব পড়ে জনগণের জানার অধিকারেও।
কারণ স্বাধীন মত প্রকাশের সংকোচন সব সময় দৃশ্যমান নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ঘটে না। কখনো কখনো ভয়, অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য পরিণতির আশঙ্কাই মানুষকে নিজের কথা নিজেকেই থামিয়ে দিতে বাধ্য করে।
তথ্যসূত্র
- Dataful — Expression Pulse: Journalists’ Digital Freedom Monitor — বাংলাদেশের ২২ সাংবাদিকের মূল জরিপ।
- Reuters — Pakistan broadens foreign media curbs to local staff — পাকিস্তানে ২০২৬ সালের নতুন বিধিনিষেধ।
- Reporters Without Borders — Bangladesh — ২০২৬ World Press Freedom Index ও বাংলাদেশের অবস্থান।
- Reporters Without Borders — Pakistan — পাকিস্তানের গণমাধ্যম ও অনলাইন মতপ্রকাশের পরিস্থিতি।
- ARTICLE 19 — Bangladesh: Protect journalists during the election — ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে সাংবাদিকদের ঝুঁকি।
- Reuters Institute — Self-censorship and the news media’s role in Bangladesh — বাংলাদেশে সাংবাদিকদের self-censorship নিয়ে আগের গবেষণার উল্লেখ।
- SAGE Journals — “Private self-censorship” as the Achilles’ heel of journalistic… — ৩৭ বাংলাদেশি সাংবাদিককে নিয়ে গবেষণা।
- bdnews24.com





