নড়াইলের লোহাগড়ার সাংবাদিক কাজী আশরাফের সাংবাদিকতা ছিল মূলত স্থানীয় মানুষের জীবন ও সমস্যাকে সংবাদে তুলে ধরার সঙ্গে যুক্ত। প্রবীণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, শিশুদের শিক্ষা, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার—বিভিন্ন বিষয় তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর লোহাগড়া প্রেসক্লাবের আয়োজনে তাঁকে স্মরণ করে সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাঁর বাবার হাতে প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিনের স্থানীয় সাংবাদিকতা
কাজী আশরাফ নড়াইলের লোহাগড়া পৌরসভার গোপীনাথপুরের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি এশিয়ান টেলিভিশনের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে নড়াইল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং দৈনিক করতোয়ার লোহাগড়া প্রতিনিধি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৫ সাল থেকেই অনলাইনে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বাইলাইন পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদনের বিষয়বৈচিত্র্য থেকে তাঁর স্থানীয় সাংবাদিকতার একটি ধারাবাহিক চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসে।
তাঁর কাজ ছিল স্থানীয় মানুষের কল্যাণে
কাজী আশরাফের সাংবাদিকতার সামাজিক প্রভাবের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে। তিনি “আর কত বয়স হলে ভাতা পাবেন ফুলমালা ও বনফুল” শিরোনামে শতবর্ষী দুই নারী—ফুলমালা বিশ্বাস ও বনফুল বিশ্বাসের বয়স্কভাতা না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তাঁর প্রতিবেদনে।
পরবর্তী অন্য এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়,, তাঁর প্রকাশিত সংবাদ বিভিন্ন পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ফুলমালা বিশ্বাস ও বনফুল বিশ্বাসের বিষয়ে খোঁজ নেন। পরে বয়স্কভাতা দেওয়ার জন্য আবেদন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
লোহাগড়ার ডিক্রীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে তাঁর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মধুমতী নদীতে বিদ্যালয়ের ভবন বিলীন হয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় ধরে অনুপযুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করতে হচ্ছিল। বিদ্যালয়ের শিশুদের শিক্ষা ও অবকাঠামোগত সংকটকে তিনি স্থানীয় সংবাদ হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি অসুস্থ একটি শিশুর চিকিৎসার জন্য মায়ের সাহায্যের আবেদন তুলে ধরা হয়। “সন্তানকে বাঁচাতে অসহায় মায়ের আকুতি” শিরোনামের প্রতিবেদনে চিকিৎসার জন্য অর্থের প্রয়োজন থাকা একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা তুলে ধরা হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য নিয়েও লিখেছেন। লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সংকট নিয়ে তাঁর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “৩ লাখ মানুষে চিকিৎসায় মাত্র পাঁচ জন ডাক্তার!”স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সমস্যা এবং স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ছিল ওই প্রতিবেদনের মূল বিষয়।
লোহাগড়ায় দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকি নিয়েও তিনি প্রতিবেদন করেন। এ ধরনের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তনও তাঁর সংবাদ-সন্ধানের অংশ ছিল।
অর্থাৎ তাঁর সাংবাদিকতার বিষয় শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ঘটনাকে ঘিরে ছিল না। পরিবেশ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলো তাঁর প্রতিবেদনের মাধ্যমে পাঠকের সামনে আসে।
সাংবাদিকদের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা
কাজী আশরাফের সাংবাদিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিয়ে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে নড়াইলে সাংবাদিক ও সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার প্রতিবাদে সাংবাদিকদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ওই মানববন্ধনে কাজী আশরাফ বক্তব্য দেন। এটি তাঁর সাংবাদিকদের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থানের একটি উদাহরণ।
করোনাকালেও সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণে সাংবাদিক সংগঠনের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তিনি দাবি তুলেছিলেন। নড়াইল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে তিনি সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও সাংগঠনিক স্বার্থের বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
সাংবাদিক সংগঠনে নেতৃত্ব
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে কাজী আশরাফকে নড়াইল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর নাম সাংবাদিকদের অন্যান্য পেশাগত সংগঠনের কার্যক্রমেও পাওয়া যায়। এই সাংগঠনিক ভূমিকা তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি দিককে সামনে আনে—তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না; সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়েও সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
অকাল প্রয়াণ
২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে লোহাগড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মনসুরাবাদ এলাকায় কাজী আশরাফ দুর্ঘটনার শিকার হন। তাঁর সঙ্গে থাকা মাহমুদুল হাসান অনিকও আহত হন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার বর্ণনায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে সরাসরি বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কার কথা বলা হয়েছে; অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃষ্টির মধ্যে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাওয়ার পর বাসটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন ছিল।
কাজী আশরাফকে প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
সহকর্মীদের স্মরণে
তাঁর মৃত্যুর পর ১৬ সেপ্টেম্বর লোহাগড়া প্রেসক্লাবের আয়োজনে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সাংবাদিকরা অংশ নেন। তাঁর বাবার হাতে প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। স্মরণসভায় বক্তব্য দেন লোহাগড়ার বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিকরা। সভা শেষে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
তথ্যসূত্র:
১. প্রথম আলো — ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী সাংবাদিক নিহত
২. কালবেলা — সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সাংবাদিক কাজী আশরাফের স্মরণে দোয়া মাহফিল
৩. আজকালের কণ্ঠ — সাংবাদিক কাজী আশরাফ-উল আলম সিদ্দিকীর স্মরণে লোহাগড়ায় স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
৪. অপরাধ তথ্যচিত্র — লোহাগড়ায় শতবর্ষীয় ফুলমালা ও বনফুলের বয়স্কভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ





