রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান আর নেই। সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর ৪টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
সাইদুর রহমানের মৃত্যুতে রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দীর্ঘ সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতার একজন প্রবীণ সংবাদকর্মী এবং অনেকের কাছে অভিভাবকতুল্য। তাঁর মৃত্যুতে রাজশাহীর গণমাধ্যম অঙ্গন হারাল দীর্ঘদিনের একজন পরিচিত মুখ।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
প্রকাশিত জন্মদিনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাইদুর রহমান ১৯৬৪ সালের ২৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। ২০২১ সালে তাঁর ৫৭তম জন্মদিন পালনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ (গণমৈত্রী) ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।
তাঁর জন্ম হয়েছিল রাজশাহীর একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। তাঁর নানা ছিলেন আইনজীবী ও জননেতা মাদার বখশ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও বাস্তবায়নে মাদার বখশের ভূমিকার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বাবা আতাউর রহমান এবং মা মনোয়ারা রহমানও রাজশাহীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকতায় দীর্ঘ পথচলা
রাশিয়ায় পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে সাইদুর রহমান সাংবাদিকতা শুরু করেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি দৈনিক ভোরের কাগজের রাজশাহী প্রতিনিধি হিসেবে পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কাজ করেছেন। মৃত্যুর পর ভোরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদনে তাঁকে পত্রিকাটির রাজশাহী প্রতিনিধি এবং চার দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত একজন সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে তাঁর দৈনিক করতোয়ায় সাংবাদিকতার কথাও বলা হয়েছে।
চার দশকের বেশি সময়ের এই সাংবাদিকতা জীবনে রাজশাহীর গণমাধ্যম অঙ্গনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন। সংবাদ সংগ্রহ, স্থানীয় সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব—এই তিন ক্ষেত্রেই তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
রাজশাহী প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব
সাইদুর রহমান রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালের ২৬ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে রাজশাহী প্রেসক্লাবের ২০১৮–২০২০ মেয়াদের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়েও তিনি প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে ছিলেন এবং মৃত্যুর সময় তিনি সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, সাইদুর রহমান দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা ও প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ভোরের কাগজের বর্ষসেরা রিপোর্টার
সাইদুর রহমানের সাংবাদিকতা জীবনের উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতির একটি আসে ২০২২ সালে। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজের জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে তাঁকে বর্ষসেরা রিপোর্টার হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। বাগেরহাট জেলা পরিষদের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে সম্মাননা তুলে দেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার পরও সংবাদ ও বিজ্ঞাপন সংগ্রহে তাঁর সক্রিয়তার জন্য তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। পরে রাজশাহী প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সহকর্মীরা তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সেই অনুষ্ঠানে সাইদুর রহমান তাঁর পাওয়া পুরস্কারটি রাজশাহী প্রেসক্লাব ও জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের জন্য উৎসর্গ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অসুস্থতার মধ্যেও সাংবাদিকতা
সাইদুর রহমানের জীবনে দীর্ঘ অসুস্থতার একটি অধ্যায়ও ছিল। ২০২১ সালের জন্মদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং তাঁর শরীরের বাম পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতার চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতে চিকিৎসা নেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে অসুস্থতার মধ্যেও তিনি সাংবাদিকতা চালিয়ে যান। ২০২২ সালের ভোরের কাগজের সম্মাননা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও পেশাগতভাবে সক্রিয় থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
নবীন সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক
সাইদুর রহমানের সাংবাদিকতা জীবনের আরেকটি দিক ছিল নবীন সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শেখাতেন এবং তাঁর কাছ থেকে সাংবাদিকতা শিখে অনেকে পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। প্রতিবেদনে বিবিসি, সময় টিভি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, যমুনা টেলিভিশন ও দ্য নিউ এইজের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকতার বাইরে জনকল্যাণের উদ্যোগ
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাইদুর রহমান সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ছিলেন। মৃত্যুর সময়ও তিনি সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর একটি ছিল ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্ট’ গঠন। প্রকাশিত সংবাদে সংশ্লিষ্টদের বরাতে বলা হয়েছে, সমাজসেবামূলক কাজে সম্পদ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর প্রায় সমুদয় সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দলিল করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। ট্রাস্টের পরিচালনা কাঠামো সম্পর্কেও সংবাদে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই উদ্যোগ তাঁর সাংবাদিকতার বাইরের সামাজিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সহকর্মীদের স্মৃতিতে
সাইদুর রহমানের মৃত্যুর পর রাজশাহীর বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন শোক জানিয়েছে। রাজশাহী প্রেসক্লাবের অর্থ সম্পাদক আল আমিন তাঁকে অভিভাবকতুল্য মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, সাইদুর রহমানের মৃত্যুতে তাঁরা একজন প্রবীণ সাংবাদিকের পাশাপাশি একজন মানবিক ও সমাজসেবী মানুষকে হারিয়েছেন।
রাজশাহী রিপোর্টার্স ইউনিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাসুদ রানা রাব্বানী এবং সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা মোস্তাফা জামান পৃথক শোকবার্তায় তাঁকে সাংবাদিক সমাজের অভিভাবকতুল্য ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে সাইদুর রহমানের স্নেহ, পরামর্শ ও আন্তরিকতার কথা উঠে এসেছে।
সহকর্মীদের এসব বক্তব্য থেকে তাঁর পেশাগত জীবনের আরেকটি দিক সামনে আসে—দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নবীন সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর সহযোগিতার ভূমিকা।
একটি দীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি
সাইদুর রহমানের জীবনকে শুধু একজন সাংবাদিকের কর্মজীবন দিয়ে দেখলে তাঁর পরিচয়ের একটি অংশই ধরা পড়ে। দীর্ঘ সাংবাদিকতা, রাজশাহী প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব, নবীন সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ এবং সামাজিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে তিনি রাজশাহীর জনপরিসরে একাধিক ভূমিকায় সক্রিয় ছিলেন।
রাজশাহীর সাংবাদিকতা অঙ্গনে তাঁর মৃত্যু একটি দীর্ঘ কর্মজীবনের সমাপ্তি। তাঁর কাজ, সহকর্মীদের স্মৃতি এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোই এখন তাঁর জীবনের উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যাবে।
FoEBD তাঁর পরিবার, সহকর্মী, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে।
সাইদুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র
১. Jago News24 — সাইদুর রহমানের মৃত্যু, রাজশাহী প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব, পারিবারিক ও সমাজসেবামূলক কাজের তথ্য।
২. Jugobarta, 4 December 2022 — দৈনিক ভোরের কাগজ-এর বর্ষসেরা রিপোর্টার হিসেবে তাঁর পুরস্কার পাওয়ার তথ্য; বাগেরহাট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সম্মেলনে সম্পাদক শ্যামল দত্ত তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
৩. Jugobarta, 5 December 2022 — পুরস্কার পাওয়ার পর রাজশাহী প্রেসক্লাবে তাঁকে দেওয়া সংবর্ধনা এবং সহকর্মীদের বক্তব্য।





