বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আখতার হুসেন আর নেই। তিনি ছিলেন শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, সাংবাদিক, গীতিকার, অনুবাদক ও সম্পাদক। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পৈতৃক নিবাস নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। তাঁর বাবা টি. আই. এম. সিকান্দার রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির কারণে শৈশবে তাঁকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকতে হয়েছে।
কৈশোর থেকেই তিনি সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী গণআন্দোলনের সময়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি খুলনায় ছিলেন। ১৯৬২ সালের আন্দোলনেও তিনি যুক্ত হন।
গফরগাঁওয়ে থাকার সময় তাঁর সাহিত্যচর্চার শুরু। পরে কুলাউড়ায় থাকার সময় তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখাই ধীরে ধীরে তাঁর প্রধান সাহিত্যিক পরিচয় হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবনের শুরু
আখতার হুসেনের পেশাজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। ১৯৬৬ সালে তিনি দৈনিক পয়গাম ও দৈনিক আজাদে কাজ করেন। পরে তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্রে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দৈনিক খবর, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক জনকণ্ঠে সহসম্পাদক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবাদিকতা তাঁর জীবন ও চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ সময় সংবাদপত্র ও প্রকাশনা জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ততা
আখতার হুসেন শুধু লেখক ছিলেন না। তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের একজন ছিলেন। উদীচীর শুরুর দিকের কয়েকটি নাটকের রচনা ও নির্দেশনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
খেলাঘরের কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের সংগঠনসংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তাঁর লেখা।
মুক্তিযুদ্ধ ও শব্দের লড়াই
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আখতার হুসেনও যুক্ত হন মুক্তির সংগ্রামে। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গান, লেখা ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে আজ জাগছে বাঙালিরা’ গানটি লেখেন। গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। গানটির সুর করেছিলেন অজিত রায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান। তাঁর লেখা গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে দেন। ঢাকার পরিস্থিতি নিয়েও তিনি প্রতিবেদন করেন। তাঁর নিজের বর্ণনায়, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর তাঁর গান প্রচারিত হওয়ার খবর তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
তাঁর আরেকটি পরিচিত গান ‘আয়রে আমার দামাল ছেলে’। মুক্তিযুদ্ধে ফিরে না-আসা তরুণদের জন্য অপেক্ষমাণ মায়ের বেদনা এই গানে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা পরবর্তী জীবনেও তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে।
শিশুসাহিত্যে দীর্ঘ অবদান
শিশু-কিশোর সাহিত্যেই আখতার হুসেন সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান। তাঁর লেখায় ছিল ছড়া, গল্প, কিশোর সাহিত্য ও নাটিকা। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘এক ঘড়া ছড়া’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘হৈহৈরৈরৈ’, ‘হালচাল’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘আমার দুটি ডানা’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণকবি মুকুন্দ দাস’। তাঁর লেখা ছড়া পাঠ্যবইয়েও স্থান পেয়েছে। বহু শিশুর কাছে তাঁর লেখা পরিচিত হয়ে ওঠে।
লেখক আনিসুল হক তাঁর স্মৃতিচারণে আখতার হুসেনের ‘সমুদ্র অনেক বড়’ বইটির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর লেখক হয়ে ওঠার পেছনে এই বইটির প্রভাব ছিল বলেও আনিসুল হক জানিয়েছেন।
আখতার হুসেনের সাহিত্যচর্চা মৌলিক লেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সম্পাদনা ও অনুবাদের কাজও করেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন সংকলন ও জীবনীগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আখতার হুসেন ২০১১ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা একাডেমির সরকারি তালিকায় তাঁকে ওই বছরের শিশুসাহিত্য শাখার পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৫-ও লাভ করেন। বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, তিনি এই পুরস্কারের ষষ্ঠ প্রাপক।
এ ছাড়া আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের সেতুবন্ধন
আখতার হুসেনের জীবন ছিল একাধিক সৃজনশীল পরিচয়ের সমন্বয়। সাংবাদিকতা তাঁকে সময় ও সমাজের কাছাকাছি রেখেছে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন তাঁকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে শব্দ ও গানের মাধ্যমে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর শিশুসাহিত্য তাঁকে কয়েক প্রজন্মের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
তাঁর জীবন তাই শুধু একজন শিশুসাহিত্যিকের জীবন নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি দীর্ঘ সময়ের সঙ্গেও যুক্ত।
স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
আখতার হুসেনের মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি দীর্ঘ সৃজনশীল অধ্যায়ের অবসান হলো। তাঁর লেখা ছড়া ও গল্প শিশু-কিশোরদের পাঠে থাকবে। তাঁর গান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাঁর সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
FoEBD আখতার হুসেনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানায়। তাঁর পরিবার, সহকর্মী, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি জানায় আন্তরিক সমবেদনা।
তথ্যসূত্র:





