বাংলাদেশের অপরাধ সাংবাদিকতায় মাঠের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত যে কজন সাংবাদিক দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন, আবু হেনা রাসেল তাঁদের একজন। প্রায় তিন দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি সংবাদ সংগ্রহ করেছেন ঘটনাস্থল থেকে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে, মর্গ থেকে, পুলিশ ও গোয়েন্দা দপ্তর থেকে। তাঁর সাংবাদিকতার বড় শক্তি ছিল মাঠে থাকা, তথ্যের পেছনে ছোটা এবং ঘটনার গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা।
আবু হেনা রাসেল ১৯৬৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি রাজশাহী সদরে। তবে তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে ঢাকায়। তবে তাঁর কর্মজীবনের যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায়—সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জীবনচর্চা।
সাংবাদিকতায় প্রবেশ এবং এক ভিন্ন সময়ের ক্রাইম রিপোর্টিং
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবু হেনা রাসেল প্রায় ২০০০ সালের দিকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। সেই সময় বাংলাদেশের সংবাদপত্রের অপরাধ সাংবাদিকতা আজকের ডিজিটাল সাংবাদিকতার মতো ছিল না। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রবাহের সুযোগ ছিল সীমিত। একটি খবরের জন্য সাংবাদিককে ঘটনাস্থলে ছুটতে হতো, হাসপাতাল, মর্গ, থানা, গোয়েন্দা কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো।
সহকর্মী আসাদ আল মাহমুদের স্মৃতিচারণে সেই সময়ের সাংবাদিকতার একটি জীবন্ত ছবি পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনায়, আবু হেনা রাসেল ছিলেন মাঠে সক্রিয় এবং অনুসন্ধানী মনোভাবের সাংবাদিক। কোনো ঘটনার পেছনের সত্য জানতে তিনি দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, পুলিশের তথ্য এবং হাসপাতালের খোঁজ—সব মিলিয়ে সংবাদ তৈরি করতেন। এই কাজের মধ্য দিয়েই তিনি অপরাধ সাংবাদিকতায় নিজের একটি পরিচিতি তৈরি করেন।
ভোরের কাগজ, সমকাল ও কালের কণ্ঠ
কর্মজীবনে আবু হেনা রাসেল দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক সমকাল এবং কালের কণ্ঠে কাজ করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁকে এসব সংবাদপত্রের অপরাধ বিভাগের প্রতিবেদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোরের কাগজে কাজ করার সময় থেকেই তিনি মাঠের সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সহকর্মীদের স্মৃতিতে তাঁর পরিচয় ছিল এমন একজন সাংবাদিক হিসেবে, যিনি বয়স বা পদমর্যাদাকে নিজের মাঠসাংবাদিকতার পথে বাধা হতে দেননি।
আসাদ আল মাহমুদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন কিংবা অপরাধসংক্রান্ত ঘটনাস্থল—যেখানেই খবর থাকুক, রাসেলকে প্রায়ই সবার আগে উপস্থিত হতে দেখা যেত।
কানাডা যাত্রা এবং দেশে ফিরে আবার সাংবাদিকতা
সাংবাদিকতার এক পর্যায়ে আবু হেনা রাসেল কানাডায় চলে যান। প্রবাসজীবন শেষে প্রায় ২০১৬ সালের দিকে বাংলাদেশে ফিরে তিনি আবার সাংবাদিকতায় সক্রিয় হন। দেশে ফিরে তাঁর সাংবাদিকতা আবারও মূলত মাঠকেন্দ্রিক ছিল। তিনি আগের অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা এবং নাগরিকজীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
খবর সংযোগে শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষ পর্যায়ে আবু হেনা রাসেল দৈনিক খবর সংযোগ-এর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্র্যাবের সদস্য তালিকাতেও তাঁকে খবর সংযোগের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খবর সংযোগে তাঁর নামে প্রকাশিত ২০২৬ সালের প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর কাজের পরিধি কেবল অপরাধ সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি রাজধানীর যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে লিখেছেন, সড়ক পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন, রমজানের সময় রাজধানীর ভয়াবহ যানজট নিয়ে তাঁর প্রতিবেদনে পথেই ইফতার করতে বাধ্য হওয়া মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে লিখেছেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা নিয়েও লিখেছেন। এতে তাঁর সাংবাদিকতার আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়—অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নগরব্যবস্থা, পরিবহন ও জননিরাপত্তার বিষয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল।
ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে নেতৃত্ব
বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন—ক্র্যাবের সঙ্গে আবু হেনা রাসেলের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। সংগঠনটির বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুর সময় তিনি ক্র্যাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।
২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ক্র্যাব নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্যের তিনটি পদের মধ্যে তিনি ২১৩ ভোট পেয়ে প্রথম হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান ১৩৪ ভোট। অর্থাৎ সহকর্মী সাংবাদিকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় এই নির্বাচনের ফলাফলে। মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে পাওয়া এই নির্বাচনী সমর্থন তাঁর দীর্ঘ পেশাগত সম্পর্ক, সহকর্মীদের আস্থা এবং সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততার গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
ডিআরইউর সঙ্গে সম্পর্ক
আবু হেনা রাসেল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিরও সদস্য ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর ডিআরইউ প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সংগঠনের নেতারা ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। পরে তাঁকে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। একজন সাংবাদিকের পেশাগত জীবনে রিপোর্টার্স ইউনিয়ন ও বিটভিত্তিক সাংবাদিক সংগঠন—দুই জায়গাতেই সক্রিয় থাকা তাঁর পেশাগত সম্পৃক্ততার বিস্তৃত পরিধি নির্দেশ করে।
সহকর্মীদের চোখে রাসেল
আবু হেনা রাসেলের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে ফিরে এসেছে, সেগুলো হলো—নিষ্ঠা, সততা, স্পষ্টবাদিতা, সাহসিকতা, পরিশ্রম, উদারতা ও মানবিকতা।
রাইজিংবিডিতে সহকর্মী আসাদ আল মাহমুদ লিখেছেন, রাসেল ছিলেন তাঁর চেয়ে প্রায় দুই দশকেরও বেশি বয়সে বড় এবং সাংবাদিকতায়ও অনেক সিনিয়র। কিন্তু সেই সিনিয়রিটি তিনি দূরত্ব তৈরির জন্য ব্যবহার করতেন না। বরং জুনিয়রদের ভুল হলে বুঝিয়ে দিতেন, ভালো কাজ করলে প্রশংসা করতেন এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াতেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের সংগ্রহ করা তথ্য সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর কোনো সংকোচ ছিল না। সাংবাদিকতার প্রতিযোগিতাকে তিনি সহকর্মীদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্কের বিরোধী মনে করতেন না। এ কারণেই তাঁর মৃত্যু শুধু একজন সংবাদকর্মীর মৃত্যু হিসেবে দেখা হয়নি; সহকর্মীদের স্মৃতিতে এটি ছিল একজন অভিভাবকতুল্য বড় ভাই ও সহযোদ্ধাকে হারানোর ঘটনা।
মাঠসাংবাদিকতার যে উত্তরাধিকার
আজকের সাংবাদিকতায় সংবাদ সংগ্রহের গতি অনেক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে তথ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তথ্যের গতি বাড়লেও সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব বদলায়নি—ঘটনাস্থলে যাওয়া, তথ্য যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট মানুষের বক্তব্য নেওয়া এবং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো।
আবু হেনা রাসেলের কর্মজীবন সেই পুরোনো অথচ অপরিহার্য মাঠসাংবাদিকতার একটি প্রতিনিধিত্বশীল অধ্যায়। সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ থেকে দেখা যায়, তিনি সংবাদকে ডেস্কে বসে পাওয়া তথ্যের সমষ্টি হিসেবে দেখতেন না; বরং ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলাকে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি মনে করতেন। তাঁর এই পেশাগত অভ্যাস নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও একটি শিক্ষা—প্রযুক্তি সাংবাদিকতার হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল শক্তি এখনো তথ্য যাচাই, অনুসন্ধান, মাঠের অভিজ্ঞতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
শেষ বিদায়
২২ জুলাই ২০২৬ তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে সাংবাদিক সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। ডিআরইউ প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর পর ক্র্যাবের নির্ধারিত ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানও স্থগিত করা হয়েছিল—যা সংগঠনটির কাছে তাঁর অবস্থান ও সহকর্মীদের কাছে তাঁর গুরুত্বের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক।
কয়েক দিন পর ক্র্যাবের উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণসভায় সহকর্মীরা আবারও তাঁর পেশাগত নিষ্ঠা, সততা, স্পষ্টবাদিতা, মাঠসাংবাদিকতার সাহস এবং অনুজদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতার কথা স্মরণ করেন।
স্মৃতিতে আবু হেনা রাসেল
একজন সাংবাদিকের জীবনের মূল্য শুধু তিনি কতটি প্রতিবেদন লিখেছেন, কতটি সংবাদপত্রে কাজ করেছেন কিংবা কত পদে নির্বাচিত হয়েছেন—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার তৈরি হয় তিনি সহকর্মীদের কী শিখিয়েছেন, পেশাকে কীভাবে দেখেছেন এবং মানুষের জন্য সংবাদকে কতটা অর্থবহ করেছেন—তার মধ্য দিয়ে। আবু হেনা রাসেলের জীবন ও কর্মের যে দলিলগুলো এখনো পাওয়া যায়, তাতে তাঁকে দেখা যায় একজন নিবেদিতপ্রাণ মাঠসাংবাদিক হিসেবে—যিনি সংবাদ সংগ্রহে পরিশ্রমী, সত্য অনুসন্ধানে আগ্রহী এবং সহকর্মীদের প্রতি উদার ছিলেন।
তাঁর কলম থেমে গেছে। কিন্তু হাসপাতালের করিডোর, অপরাধস্থল, সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন কিংবা নগরীর ব্যস্ত সড়কে সংবাদ খুঁজে বেড়ানো সেই সাংবাদিকের পদচিহ্ন তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
আবু হেনা রাসেলকে স্মরণ করার সবচেয়ে যথার্থ উপায় সম্ভবত এটাই—সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখার যে শিক্ষা তিনি তাঁর কর্মজীবনে রেখে গেছেন, তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র
১. ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (DRU) — তাঁর জন্ম, সাংবাদিকতায় প্রবেশ, কর্মজীবন, মৃত্যুর তথ্য ও জানাজার তথ্য।
২. বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (CRAB) — তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল, পূর্ববর্তী কর্মস্থল এবং ক্র্যাবের নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা।
৩. প্রথম আলো — মৃত্যু, সাংবাদিকতা, কর্মস্থল ও পারিবারিক তথ্য।
৪. UNB — ক্র্যাবের শোকবার্তা এবং তাঁর পেশাগত পরিচয় ও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য।
৫. খবর সংযোগ — তাঁর স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিল এবং তাঁর শেষ কর্মস্থল সম্পর্কিত তথ্য।
৬. রাইজিংবিডি — সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ ও তাঁর মাঠসাংবাদিকতা, পেশাগত নিষ্ঠা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য।
৭. নয়া দিগন্ত — তাঁর মৃত্যু ও সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন তথ্য।
৮. খবর সংযোগে প্রকাশিত আবু হেনা রাসেলের প্রতিবেদনসমূহ — তাঁর নিজস্ব সাংবাদিকতা ও লেখালেখির





