বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ এম. মিরাজ হোসাইন আর নেই। ২২ আগস্ট ২০২৬ দুপুরে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরিবার ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সূত্রে জানা যায়, ২৯ জুলাই তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে টিউমার অপসারণ করা হয়েছিল। পরে বায়োপসি পরীক্ষায় নন-হজকিন লিম্ফোমা শনাক্ত হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর সময় তিনি দৈনিক বণিক বার্তার বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে দীর্ঘদিন দৈনিক ভোরের কাগজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বরিশাল প্রেসক্লাব, বরিশাল সাংবাদিক ফোরাম এবং বরিশাল টেলিভিশন ও মাল্টিমিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
তবে একজন সাংবাদিককে স্মরণ করার ক্ষেত্রে শুধু তাঁর পদবি বা কর্মস্থলের তালিকা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনি কী নিয়ে লিখেছেন, কোন বাস্তবতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত তাঁর রিপোর্টগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন, সমস্যা ও সম্ভাবনা ছিল তাঁর সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নদীভাঙন, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, অবকাঠামো, স্থানীয় শিল্প ও অর্থনীতি—বিভিন্ন বিষয়ে তিনি রিপোর্ট করেছেন। বণিক বার্তায় তাঁর নামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একটি পৃথক লেখক-আর্কাইভও রয়েছে।
একজন আঞ্চলিক সাংবাদিক তাঁর এলাকার মানুষের কণ্ঠকে বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেন। স্থানীয় সমস্যাকে জাতীয় আলোচনার অংশ করে তোলেন। একই সঙ্গে তিনি শুধু সংকটের কথা বলেন না; নিজের অঞ্চলের সম্ভাবনা, উদ্যোগ ও পরিবর্তনের গল্পও তুলে ধরেন।
মিরাজ হোসাইনের সাংবাদিকতায় এই দুই দিকই দেখা যায়। তাঁর রিপোর্টে যেমন নদীভাঙন, স্বাস্থ্য ও কৃষির সমস্যা এসেছে, তেমনি বরিশালের শিল্প ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ তাঁর কাজের পরিসর কেবল ঘটনাভিত্তিক সংবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্থানীয় সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে বরিশাল প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, সাংবাদিক ফোরাম, বরিশাল টেলিভিশন ও মাল্টিমিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক জানানো হয়েছে। এসব প্রতিক্রিয়া তাঁর দীর্ঘ পেশাগত ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার একটি ধারণা দেয়।
তাঁর সাংবাদিক পরিচয়ের আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। বরিশাল দর্পণ নামের একটি স্থানীয় সংবাদপোর্টালের ওয়েবসাইটে তাঁকে প্রকাশক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদ পরিবেশনের একটি প্ল্যাটফর্মের প্রকাশনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
মিরাজ হোসাইনের কোনো গ্রন্থ বা সাহিত্যকর্মের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাজও তাঁর সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তিনি যে খবরগুলো লিখেছেন, সেগুলোর অনেকগুলো হয়তো বইয়ের মতো সাহিত্যিক ভাষায় লেখা নয়; কিন্তু সেগুলোতে রয়েছে একটি সময়ের মানুষের জীবন, সমস্যা, সংগ্রাম, সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের নথি।
এম. মিরাজ হোসাইনের মৃত্যু তাই শুধু তাঁর পরিবার ও সহকর্মীদের জন্য নয়, বরিশালের সাংবাদিকতা জগতের জন্যও একটি বড় ক্ষতি।
তাঁর মৃত্যু আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতা শুধু রাজধানীর সংবাদকক্ষকে ঘিরে তৈরি হয় না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য সাংবাদিক মানুষের কথা তুলে ধরেন। তাঁদের রিপোর্টের মধ্য দিয়েই বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র জানতে পারে প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা, স্থানীয় সমস্যার গভীরতা এবং সম্ভাবনার কথা। এম. মিরাজ হোসাইন সেই ধারারই একজন সাংবাদিক ছিলেন।
মৃত্যুর আগে একটি হত্যা মামলার আসামিও ছিলেন মিরাজ
মৃত্যুর আগে এম. মিরাজ হোসাইনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা চলমান ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার মেরুল বাড্ডা এলাকায় আল-আমিন নামে এক ব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনায় পরবর্তী সময়ে ঢাকার হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। ওই মামলায় বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, এম. মিরাজ হোসাইন এবং তৌহিদুল মাজিদ মীর্জা রিমনসহ কয়েকজন সাংবাদিককে আসামি করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মিরাজ হোসাইনকে মামলার ৮৪ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা ও অন্যান্য লঙ্ঘনের ঘটনা মনিটরিং ও যাচাইয়ের সময় তৎকালীন Article 19, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া অফিসের একজন সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে মিরাজ হোসাইনের সঙ্গে মামলার বিষয়ে আমার মোবাইলে যোগাযোগ হয়েছিল। সে সময় মামলার বিষয়ে তিনি দাবি করেছিলেন যে, ৫ আগস্টের ঘটনার দিন তিনি তাঁর নিজ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর ভাষায়, “আপা, আমি ঘটনার দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট নিজ এলাকায় ছিলাম। অথচ আমি সহ তিন সাংবাদিকের নামে হত্যা মামলা দেয়া হয়েছে।”
মিরাজের ওই বক্তব্য তাঁর নিজের অবস্থান সম্পর্কে একটি প্রত্যক্ষ সূত্র হিসেবে নথিবদ্ধ। তবে ঘটনার দিন তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা আদালতের সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। একইভাবে, তাঁর বিরুদ্ধে মামলায় আনা অভিযোগের সত্যতাও আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর সময় মামলাটি তাঁর বিরুদ্ধে বিচারাধীন ছিল।
একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর সংবাদ নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি মৃত্যুর সময় তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। মিরাজ হোসাইনের ক্ষেত্রেও এই মামলাটি তাঁর জীবনের শেষ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য।
তাঁর কাজ ও স্মৃতি সংরক্ষিত থাকুক।
ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন বাংলাদেশ (FoEBD) তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা, যায়যায়দিন, ভোরের কাগজ, রাইজিংবিডি, বরিশাল নিউজ , বরিশাল দর্পণ।





