গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। তাঁরা বলেছেন, বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে গণমাধ্যমের দীর্ঘদিনের সংকট দূর হবে না। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের নিজস্ব জবাবদিহি ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) চট্টগ্রামে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
‘খণ্ডিত পদক্ষেপে সমাধান হবে না’
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ শুধু কমিশনের সদস্যদের মতামত নয়। এগুলো সম্পাদক, মালিক, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত মতামতের প্রতিফলন। তিনি বলেন, আইন সংশোধন করে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নিলে গণমাধ্যমের বর্তমান সংকটের টেকসই সমাধান হবে না।
কামাল আহমেদ একটি স্বাধীন ও স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের নিজস্ব নৈতিক আচরণবিধির ভিত্তিতে কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, নিজেদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার কঠোর ও বিতর্কিত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেতে পারে।
সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষার তাগিদ
সভায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক ও সম্পাদকরা মনে করেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় শক্তিশালী সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রয়োজন। সরকার, গণমাধ্যমের মালিক, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক পক্ষের চাপ মোকাবিলায় সংবাদকক্ষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পেশাগত মান বজায় রাখতে হবে। ভুল সংবাদ বা পাঠক-দর্শকের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
অংশগ্রহণকারীদের মতে, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গেলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সহজ হবে।
সাংবাদিকদের বেতন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
সভায় সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষকে নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে হবে। সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর না করে পেশাগত মানোন্নয়ন ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
স্ব-নিয়ন্ত্রণে জোর
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। এই আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
সভায় সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের মতামতও জরুরি
সভায় উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের নীতিগত আলোচনায় ঢাকার বাইরের সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতা এক নয়। তাই সংস্কারের কাঠামো তৈরির সময় আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের সমস্যাগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও জনআস্থা—সব বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করেই সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
অংশগ্রহণকারী
সভায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক, দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম রমিজউদ্দীন চৌধুরী, সুপ্রভাত বাংলাদেশের সম্পাদক রুশো মাহমুদ এবং দৈনিক পিপলস ভিউর সম্পাদক ওসমান গণি মনসুর।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি, চট্টগ্রাম এডিটরস ক্লাবের সভাপতি এম আলী হোসেন এবং চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ, টিভি জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি শামসুল হক হায়দারী সভায় অংশ নেন।
সভায় বিভিন্ন জেলার সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তথ্যসূত্র
১. জাগো নিউজ২৪: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ
২. চ্যানেল আই অনলাইন: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের তাগিদ
৩. চ্যানেল এস: চট্টগ্রামে এমআরডিআইয়ের গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিভাগীয় মতবিনিময় সভা





