বাংলাদেশের স্থানীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন একটি বেদনাবিধুর দিন। সেদিন সাতক্ষীরা শহরে নিজ সংবাদপত্রের কার্যালয়ে গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সম্পাদক স. ম. আলাউদ্দীন। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও শেষ হয়নি। একই সঙ্গে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে, যা ঘটনাটিকে বাংলাদেশের সাংবাদিক নিরাপত্তা ও বিচারহীনতার আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেসে পরিণত করেছে।
কার্যালয়ে ঢুকে গুলি
১৯৯৬ সালের ১৯ জুন রাতে সাতক্ষীরা শহরে নিজের পত্রিকা অফিসে কাজ করছিলেন স. ম. আলাউদ্দীন। সে সময় মুখোশধারী বন্দুকধারীরা কার্যালয়ে প্রবেশ করে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসক তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। হত্যাকাণ্ডটি সাতক্ষীরা সদর থানার অদূরে সংঘটিত হয়েছিল, যা সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সাংবাদিক নাকি রাজনৈতিক কারণে হত্যা?
স. ম. আলাউদ্দীনের হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যেও কিছু পার্থক্য রয়েছে।
Committee to Protect Journalists (CPJ) তাঁকে নিহত সাংবাদিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে সংস্থাটি তাঁর কেসে “Suspected as work-related” উল্লেখ করে বলেছে, তাঁর মৃত্যু সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল কি না, তা নির্ধারণে তারা তদন্ত করছিল।
একই প্রতিবেদনে CPJ উল্লেখ করে, তিনি সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক অগ্রদূত (Ogrodoot)-এর সম্পাদক এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের জন্য একটি রাজনৈতিক বিরোধকে দায়ী করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৯৯৬ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে তাঁকে খুলনা অঞ্চলের সংবাদপত্র পত্রদূত-এর সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে—এমন জল্পনাও তখন বিদ্যমান ছিল।
সম্পাদক হিসেবে ভূমিকা
স. ম. আলাউদ্দীন সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত পত্রদূত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে পত্রিকাটি পরিচিতি লাভ করে।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সমাজ উন্নয়নকর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ভোমরা স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা, শিল্পায়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তাঁর অবদান স্থানীয়ভাবে এখনও স্মরণ করা হয়।
বিচার এখনও শেষ হয়নি
হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ এবং অন্যান্য কারণে মামলাটি বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় থেকে যায়।
স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন ও পরিবারের সদস্যরা প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট
স. ম. আলাউদ্দীনের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা, যেখানে সাংবাদিকতা, রাজনীতি এবং বিচারহীনতার প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে আসে।
CPJ ঘটনাটিকে সাংবাদিক হত্যা হিসেবে পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখেছে, যদিও সংস্থাটি সাংবাদিকতার কাজই হত্যার একমাত্র কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্ত দেয়নি। অন্যদিকে সরকারি সূত্র রাজনৈতিক বিরোধের কথা বলেছিল।
এই ভিন্নমুখী তথ্যই ঘটনাটিকে গবেষণা ও ডকুমেন্টেশনের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্নে স. ম. আলাউদ্দীনের হত্যাকাণ্ড এখনও একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।
তথ্যসূত্র
- Committee to Protect Journalists (CPJ) – Journalist Profile
- Committee to Protect Journalists, Attacks on the Press 1997 (Refworld)
- U.S. Department of State, Bangladesh Country Report on Human Rights Practices 1996
- দৈনিক পত্রদূত
তথ্য হালনাগাদে সহযোগিতা করুন
স. ম. আলাউদ্দীনের হত্যাকাণ্ড ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য, ছবি, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, সরকারি নথি বা সংশোধনী থাকলে FoEBD-কে জানান।
📧 ই-মেইল: info@foebd.org
📱 মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ: +৮৮০৩৪১১১০২৮২





