মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের কথা বলার অধিকার নয়। এর মধ্যে মতামত ধারণ, তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকারও রয়েছে। তাই এই অধিকার ব্যক্তি স্বাধীনতার পাশাপাশি গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
জাতিসংঘের Human Rights Committee বলেছে, মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি। মানবাধিকার সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এই অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি সীমাহীন? রাষ্ট্রের দায়িত্বই বা কী? একজন সাংবাদিককে তার কাজের কারণে হুমকি দেওয়া হলে রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়? সরাসরি সেন্সরশিপ না থাকলেও ভয় ও সহিংসতার কারণে মানুষ কথা বলা বন্ধ করলে সেটি কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সমস্যা?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নীতিগত কাঠামো তৈরি করেছে।
Article 19: আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ভিত্তি
১৯৪৮ সালের Universal Declaration of Human Rights (UDHR)-এর Article 19 মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর Article 19 এই অধিকারকে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষা দেয়।
ICCPR-এর Article 19 অনুযায়ী প্রত্যেকের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই মতামত ধারণের অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সব ধরনের তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকার রয়েছে—সীমান্ত নির্বিশেষে, মৌখিক, লিখিত, মুদ্রিত, শিল্প বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে ICCPR-এ accession করে। ফলে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দায়বদ্ধতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে Article 19 একটি গুরুত্বপূর্ণ reference point।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি শুধু কথা বলার অধিকার?
না।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্য খোঁজা ও গ্রহণের অধিকার। এ কারণে সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, জনস্বার্থের তথ্য এবং রাষ্ট্রীয় তথ্য পাওয়ার প্রশ্নও Article 19-এর বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
Human Rights Committee-এর General Comment No. 34-এ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য, জনস্বার্থের বিষয়ে আলোচনা, মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা, সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকর্ম, শিক্ষা ও ধর্মীয় বক্তব্যের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু জনপ্রিয় বা স্বস্তিদায়ক/আরামদায়ক বক্তব্যের জন্য নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে সমালোচনামূলক ও অস্বস্তিকর বক্তব্যের সুরক্ষাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই অধিকার সীমাহীন নয়
আন্তর্জাতিক আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। ICCPR Article 19(3) অনুযায়ী, এসব বিধিনিষেধ অবশ্যই আইনে নির্ধারিত হতে হবে এবং অন্যের অধিকার বা সুনাম, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা নৈতিকতার মতো স্বীকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। একই সঙ্গে বিধিনিষেধটি প্রয়োজনীয় হতে হবে।
এই জায়গায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কোনো restriction বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো সামনে আসে:
Legality → Legitimate Aim → Necessity and Proportionality
অর্থাৎ— আইনে নির্ধারিত কি?
হস্তক্ষেপটির কি বৈধ উদ্দেশ্য আছে?
এবং সেই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ব্যবস্থাটি কি প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক?
শুধু কোনো আইন আছে বলেই একটি restriction স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। Human Rights Committee-এর ব্যাখ্যায় মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধকে necessity এবং proportionality-এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সুরক্ষা: কোথায় আদালত আছে?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সুরক্ষা শুধু জাতিসংঘের treaty ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকা অঞ্চলে binding human rights treaties-এর অধীনে বিশেষায়িত আদালত গড়ে উঠেছে।
ইউরোপ- European Convention on Human Rights-এর Article 10 মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করে। European Court of Human Rights-এর বিচারব্যবস্থায় এই অধিকারকে গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইউরোপীয় আদালতের দৃষ্টিতে সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো public watchdog হিসেবে কাজ করা। সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ এবং জনস্বার্থের বিষয়ে তথ্য প্রকাশের কাজ Article 10-এর সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আফ্রিকা- African Charter on Human and Peoples’ Rights-এর Article 9 তথ্য গ্রহণ এবং মতামত প্রকাশ ও প্রচারের অধিকার স্বীকৃতি দেয়।
African Court on Human and Peoples’ Rights-এর Lohé Issa Konaté v. Burkina Faso মামলায় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে defamation-সংক্রান্ত কারাদণ্ডের বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। আদালতের নথিতে মামলাটি African Charter-এর Article 9 এবং ICCPR-এর Article 19-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং লঙ্ঘন পাওয়া যায়।
আমেরিকা- American Convention on Human Rights-এর Article 13 মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ এবং প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত করে।
Claude Reyes v. Chile মামলায় Inter-American Court রাষ্ট্রের কাছে থাকা তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়। মামলাটিতে Chile-এর বিরুদ্ধে Article 13-সহ একাধিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নির্ধারিত হয়।
এই তিনটি আঞ্চলিক ব্যবস্থার গুরুত্ব হলো—এখানে treaty-based regional courts মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে binding judicial decisions দিতে পারে।
অন্যদিকে ICCPR একটি binding international treaty হলেও এর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের প্রধান ব্যবস্থা হলো UN Human Rights Committee, যা একটি treaty body, আদালত নয়। এই পার্থক্যটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার ব্যবস্থার প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব: শুধু হস্তক্ষেপ না করাই যথেষ্ট নয়
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বকে শুধু “রাষ্ট্র কী করবে না”—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
Human Rights Committee-এর General Comment No. 34-এর আলোচনায় রাষ্ট্রের তিন ধরনের দায়িত্বের কথা পাওয়া যায়: অধিকারকে সম্মান করা বা হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা; private persons বা entities-এর কারণে ক্ষতি হলে due diligence-এর মাধ্যমে সুরক্ষা, তদন্ত, শাস্তি ও প্রতিকার নিশ্চিত করা; এবং অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া।
সহজভাবে বলা যায়:
Negative obligation- রাষ্ট্র নিজে যেন অযৌক্তিকভাবে মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ না করে। যেমন—সরকারের সমালোচনা করার কারণে সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া বা সাংবাদিককে শাস্তি দেওয়া।
Positive obligation- রাষ্ট্রকে প্রয়োজনে এমন ব্যবস্থা নিতে হতে পারে, যাতে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হুমকি, সহিংসতা বা অন্য ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাস্তবে নষ্ট না হয়।
European Court of Human Rights স্পষ্টভাবে বলেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কার্যকর প্রয়োগ শুধু রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার ওপর নির্ভর করে না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি-ব্যক্তির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের positive protective measures প্রয়োজন হতে পারে।
সাংবাদিকের ওপর হামলা কেন Freedom of Expression-এর বিষয়?
ধরা যাক, একজন সাংবাদিক দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এরপর তিনি বিশ্বাসযোগ্য হত্যার হুমকি পেলেন। সরকার হয়তো তার প্রতিবেদন বন্ধ করেনি। অর্থাৎ সরাসরি censorship ঘটেনি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি হুমকিটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছে? প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিয়েছে? অপরাধীকে শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করেছে?
যদি রাষ্ট্র এসব ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সমস্যা থাকে না। তার freedom of expression এবং জনসাধারণের তথ্য পাওয়ার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
European Court-এর সাম্প্রতিক thematic guidance-এ বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের কার্যকরভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার জন্য রাষ্ট্রের positive protection measures প্রয়োজন হতে পারে এবং সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে তার পেশাগত কাজের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কটি কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
Khadija Ismayilova v. Azerbaijan মামলায় আদালত সাংবাদিকের পেশাগত কাজের সঙ্গে হুমকি ও আক্রমণের সম্ভাব্য সম্পর্ক বিবেচনা করে Article 10-এর অধীনে রাষ্ট্রের positive protection-এর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। তদন্তে গুরুতর ত্রুটি ও বিলম্বও আদালতের বিবেচনায় আসে।
Impunity কীভাবে Chilling Effect তৈরি করে
কোনো সাংবাদিককে হামলা করা হলো, কিন্তু তদন্ত হলো না। মামলা এগোল না। অপরাধীর বিচার হলো না। এর প্রভাব শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। অন্য সাংবাদিকরা ভাবতে পারেন: “এই বিষয়ে রিপোর্ট করলে আমারও একই পরিণতি হতে পারে।” এভাবে সরাসরি censorship ছাড়াই ভয়, হুমকি, মামলা বা সহিংসতা মানুষের আচরণ বদলে দিতে পারে। এটিই chilling effect-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
European Court বলেছে, সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি পরিবেশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত যেখানে তারা ভয় ছাড়া জনআলোচনায় অংশ নিতে পারেন—এমনকি তাদের বক্তব্য সরকারি কর্তৃপক্ষ বা সমাজের বড় অংশের মতের বিরোধী, বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর হলেও।
অর্থাৎ impunity শুধু অতীতের অপরাধের বিচার না হওয়ার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের মতপ্রকাশকেও প্রভাবিত করতে পারে।
Public Watchdog: সাংবাদিকতার সামাজিক ভূমিকা
সাংবাদিকদের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তাদের public watchdog ভূমিকা। সাংবাদিকরা সরকার, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য জনসমক্ষে আনতে পারেন। তাই সাংবাদিকের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের জানার অধিকারও যুক্ত।
European Court-এর Article 10 guide-এ সংবাদমাধ্যমকে public watchdog হিসেবে বিশেষ সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে bloggers ও social-media users-ও public watchdog-এর ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
তবে public watchdog-এর বিশেষ সুরক্ষা মানে সাংবাদিক বা অন্য কোনো বক্তার কোনো দায়িত্ব নেই—এমন নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে duties and responsibilities-ও যুক্ত।
তথ্য পাওয়ার অধিকারও মতপ্রকাশের অংশ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শুধু “কথা বলার অধিকার” হিসেবে দেখলে এর একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। মানুষকে তথ্য খুঁজতে, পেতে এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে স্বাধীন মতামত গঠন ও জনআলোচনায় অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়।
Claude Reyes v. Chile মামলায় Inter-American Court রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন তথ্য পাওয়ার অধিকারকে Article 13-এর সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুতরাং:
কথা বলার অধিকার + তথ্য পাওয়ার অধিকার + তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকার
—এই তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত।
সবাই কি সমানভাবে কথা বলতে পারে?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো equality। আইন যদি বলে সবাই কথা বলতে পারবে, তাতেই কি বাস্তবে সবাই সমানভাবে কথা বলতে পারে? বাস্তবে মানুষের কাছে সমান অর্থ, প্রযুক্তি, প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক প্রভাব বা শ্রোতা থাকে না। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার বক্তব্য কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটিও ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই কারণে freedom of expression-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে:
কে কথা বলতে পারছে, কে শুনতে পাচ্ছে এবং কার কণ্ঠ অন্যের কণ্ঠকে চাপা দিয়ে দিচ্ছে? এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও equality-এর সম্পর্ককে সামনে আনে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানের Article 39-এ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতা, আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ICCPR-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র; জাতিসংঘের treaty records অনুযায়ী বাংলাদেশ ৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে এতে accession করে। ফলে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গেলে জাতীয় সংবিধান ও আইন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও একটি গুরুত্বপূর্ণ reference framework।
একজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হলে শুধু “কোন আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে”—এ প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। আরও প্রশ্ন করতে হয়:
- মতপ্রকাশের অধিকার কি প্রভাবিত হয়েছে?
- রাষ্ট্র নিজে কি হস্তক্ষেপ করেছে?
- হস্তক্ষেপের আইনি ভিত্তি কী?
- উদ্দেশ্যটি কি বৈধ?
- বিধিনিষেধটি কি প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক?
- সাংবাদিক কোনো private actor-এর হুমকি বা হামলার শিকার হলে রাষ্ট্র কী করেছে?
- তদন্ত হয়েছে কি?
- কার্যকর প্রতিকার পাওয়া গেছে কি?
- অপরাধের বিচার না হওয়ায় কি impunity তৈরি হয়েছে?
- ঘটনার ফলে অন্য সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হতে পারে কি?
এই প্রশ্নগুলো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে বৃহত্তর freedom of expression analysis-এর দিকে নিয়ে যায়।
শেষ কথা
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রের সেন্সরশিপ থেকে মুক্ত থাকার অধিকার নয়। এটি একই সঙ্গে মতামত ধারণ, তথ্য খোঁজা, তথ্য পাওয়া, তথ্য প্রকাশ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থের বিষয়ে ভয় ছাড়া কথা বলার পরিবেশের অধিকার।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও তাই শুধু “হস্তক্ষেপ না করা”-তে শেষ হয় না। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে মানুষকে private actors-এর হুমকি ও সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে, অভিযোগ তদন্ত করতে এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হয়। কারণ একজন সাংবাদিককে সরাসরি চুপ করিয়ে দেওয়া যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি, তেমনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি হওয়াও গুরুতর সমস্যা—যেখানে হামলা, হুমকি বা বিচারহীনতার ভয়ে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ নিজেরাই কথা বলা বন্ধ করে দেন।
তাই প্রশ্নটি শুধু— “আমাকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে কি?” নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— “আমি কি ভয় ছাড়া কথা বলতে পারছি, তথ্য পেতে পারছি এবং অন্যের কথাও শুনতে পারছি?”
একটি কার্যকর freedom of expression framework-এর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ শুধু কথা বলার অধিকারই পাবে না—কথা বলার বাস্তব সুযোগ, তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাও পাবে।
গবেষণা-নোট: এই লেখাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে বিভিন্ন প্রাথমিক ও প্রামাণ্য উৎস পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রধান উৎস ও রেফারেন্স
- Universal Declaration of Human Rights — Article 19
- International Covenant on Civil and Political Rights — Article 19
- UN Human Rights Committee — General Comment No. 34
- European Convention on Human Rights — Article 10
- European Court of Human Rights — Guide on Article 10: Freedom of Expression
- European Court of Human Rights — Khadija Ismayilova v. Azerbaijan
- European Court of Human Rights — Gaši and Others v. Serbia
- African Charter on Human and Peoples’ Rights — Article 9
- African Court on Human and Peoples’ Rights — Lohé Issa Konaté v. Burkina Faso
- American Convention on Human Rights — Article 13
- Inter-American Court of Human Rights — Claude Reyes et al. v. Chile
- Constitution of Bangladesh — Article 39
- UN Treaty Collection — Bangladesh and ICCPR
