মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার
কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো, তাদের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা কিংবা তাদের ওপর হামলার আহ্বান জানানো বৈষম্য, ভয়ভীতি ও বাস্তব সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয়, জাতিগত ও বর্ণগত পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু হওয়া জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সমান অধিকার রক্ষায় কার্যকর সুরক্ষা প্রয়োজন।
কিন্তু ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধের নামে যেকোনো কঠোর সমালোচনা, বিতর্কিত মতামত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা সরকারের বিরোধিতাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সংকুচিত হতে পারে।
এই দুই ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?
জাতিসংঘের Rabat Plan of Action এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকারভিত্তিক কাঠামো দিয়েছে। এতে বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, বক্তার অবস্থান, উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু ও উপস্থাপন, প্রচারের ব্যাপ্তি এবং সম্ভাব্য ক্ষতি—এই ছয়টি মানদণ্ডের ভিত্তিতে গুরুতর উসকানি মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে।
হেইট স্পিচ বললেই কি বক্তব্যটি অপরাধ?
‘হেইট স্পিচ’ বা ঘৃণামূলক বক্তব্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত একটি পরিভাষা। তবে কোনো বক্তব্য আপত্তিকর বা অপমানজনক হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ হয়ে যায় না। বক্তব্যের প্রকৃতি, লক্ষ্যবস্তু, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করতে হয়।
কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ, সরকারি নীতি বা প্রতিষ্ঠানের কঠোর সমালোচনা এবং কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে বৈধ সমালোচনা ও ভিন্নমত দমনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দুটি বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) ১৯ অনুচ্ছেদ: মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়।
- ICCPR-এর ২০(২) অনুচ্ছেদ: জাতীয়, বর্ণগত বা ধর্মীয় বিদ্বেষের এমন প্রচার আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা দেয়, যা বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি হিসেবে গণ্য হয়।
এই দুটি অনুচ্ছেদ পরস্পরবিরোধী নয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি General Comment No. 34–এর ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করেছে, ১৯ ও ২০ অনুচ্ছেদ পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ, বিদ্বেষে উসকানি প্রতিরোধের জন্য নেওয়া ব্যবস্থাকেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধের প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
Rabat Plan of Action কী?
Rabat Plan of Action–এর পূর্ণ নাম Rabat Plan of Action on the prohibition of advocacy of national, racial or religious hatred that constitutes incitement to discrimination, hostility or violence।
২০১১ ও ২০১২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর আয়োজিত বিশেষজ্ঞ কর্মশালাগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে এটি তৈরি হয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত OHCHR-এর প্রতিবেদন A/HRC/22/17/Add.4-এর সংযোজন হিসেবে পরিকল্পনাটি অন্তর্ভুক্ত হয়।
দলিলটির মূল লক্ষ্য হলো, জাতীয়, বর্ণগত বা ধর্মীয় বিদ্বেষের এমন প্রচার প্রতিরোধ করা, যা বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি দেয়। একই সঙ্গে বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা।
Rabat Plan-এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো, কোনো বক্তব্যে ঘৃণাসূচক শব্দ আছে কি না, শুধু তা দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে বক্তব্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনার নির্দেশনা দেওয়া। গুরুতর উসকানির ক্ষেত্রে এটি উচ্চ আইনি সীমা (high threshold) বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
Rabat Plan-এর ছয়টি মানদণ্ড
Rabat Plan of Action-এর সবচেয়ে পরিচিত অংশ হলো গুরুতর উসকানি মূল্যায়নের ছয়টি মানদণ্ডভিত্তিক পরীক্ষা (six-part threshold test)। এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
১. প্রেক্ষাপট (Context)
বক্তব্যটি কোন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে?
একই বক্তব্য ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। কোনো অঞ্চলে একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উত্তেজনা, গুজব বা সহিংসতা চলতে থাকলে সেই সময়ে তাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী কেউ ওই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানালে বক্তব্যটি চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
তবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ থাকলেই সব সমালোচনামূলক বক্তব্য অপরাধ হয়ে যায় না। প্রেক্ষাপটের কাজ হলো বক্তব্যের অর্থ, উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করা।
২. বক্তার অবস্থান (Speaker)
বক্তার সামাজিক অবস্থান, কর্তৃত্ব, জনপ্রিয়তা এবং শ্রোতাদের ওপর প্রভাব কতটা?
একজন সাধারণ ব্যক্তি এবং বিপুল অনুসারীসম্পন্ন কোনো রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা বা জনপ্রভাবশালী ব্যক্তির বক্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাব এক নাও হতে পারে। বক্তার আহ্বানে শ্রোতারা সংগঠিতভাবে সাড়া দিতে পারেন কি না, সেটিও প্রাসঙ্গিক। তবে বক্তার পদ, পরিচিতি বা জনপ্রিয়তা অপরাধের প্রমাণ নয়। এটি বক্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের ছয়টি মানদণ্ডের একটি মাত্র।
৩. উদ্দেশ্য (Intent)
বক্তার উদ্দেশ্য কি কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি দেওয়া?
কোনো ব্যক্তি বা মতাদর্শের কঠোর সমালোচনা করা এবং মানুষকে একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিতে উসকে দেওয়া এক বিষয় নয়। উদ্দেশ্য মূল্যায়নের সময় বক্তব্যের ভাষা, পুনরাবৃত্তি, বক্তার আচরণ, শ্রোতাদের উদ্দেশে দেওয়া আহ্বান এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়। শুধু বক্তব্যটি আপত্তিকর, অসতর্ক বা বেপরোয়া—এমন কারণে গুরুতর উসকানির আইনি সীমা পূরণ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো নীতির সমালোচনা করে বলা হলো, “এই নীতি অন্যায্য, এটি বাতিল করতে হবে।” এটি রাজনৈতিক বক্তব্য। অন্যদিকে, কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর হামলা চালানো কিংবা তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আহ্বান ভিন্ন ধরনের বক্তব্য, যার প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
৪. বক্তব্যের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপন (Content and Form)
কী বলা হয়েছে, কীভাবে বলা হয়েছে এবং বক্তব্যটি কতটা প্রত্যক্ষ ও উসকানিমূলক?
শব্দচয়ন, বক্তব্যের সুর, যুক্তি উপস্থাপনের ধরন, লক্ষ্যবস্তু গোষ্ঠীকে কীভাবে চিত্রিত করা হয়েছে এবং শ্রোতাদের কী করতে বলা হয়েছে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গোষ্ঠী সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করা এবং সেই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানানো এক নয়। আবার সরাসরি সহিংসতার নির্দেশ না থাকলেও বক্তব্যের সামগ্রিক অর্থ ও উপস্থাপন গুরুতর উসকানির ইঙ্গিত দিতে পারে।
তাই বিচ্ছিন্ন কোনো শব্দ বা বাক্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বক্তব্যের পূর্ণ অর্থ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৫. বক্তব্যের প্রচার ও ব্যাপ্তি (Extent)
বক্তব্যটি কতজনের কাছে পৌঁছেছে, কতবার প্রচারিত হয়েছে এবং কোন মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে?
ব্যক্তিগত কথোপকথন, সীমিত শ্রোতার সামনে দেওয়া বক্তব্য এবং লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া ভিডিওর সম্ভাব্য প্রভাব এক নয়। প্রচারের পরিসর, পুনরাবৃত্তি, শ্রোতার সংখ্যা, ব্যবহৃত মাধ্যম এবং শ্রোতাদের বক্তব্য অনুযায়ী কাজ করার সক্ষমতা বিবেচনা করতে হয়।
ডিজিটাল মাধ্যমে মূল পোস্ট, পুনঃপ্রচার, ভিডিও ক্লিপ, লাইভ সম্প্রচার এবং বড় অনুসারীগোষ্ঠীর মাধ্যমে বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো পোস্টের ভিউ বা শেয়ারসংখ্যা বেশি হলেই তা অপরাধ প্রমাণ করে না। প্রচারের ব্যাপ্তি সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের একটি উপাদান মাত্র।
৬. ক্ষতির সম্ভাবনা ও নিকটতা (Likelihood, including imminence)
বক্তব্যের ফলে বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতা ঘটার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা কতটা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা আসন্ন?
এ ক্ষেত্রে বক্তব্যের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া, স্থানীয় উত্তেজনা, সংগঠিত তৎপরতা, লক্ষ্যবস্তু জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি এবং ক্ষতি ঘটার সম্ভাব্য সময় বিবেচনা করা যেতে পারে।
কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাধারণ বিদ্বেষ প্রকাশ এবং নির্দিষ্ট স্থানে ওই গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর হামলা চালানোর আহ্বান এক নয়। দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্ষতির প্রকৃতি ও নিকটতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ক্ষতির সম্ভাবনা মূল্যায়ন মানে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করা নয়। মূল্যায়নের ভিত্তি হতে হবে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও যুক্তিসংগত বিশ্লেষণ—অনুমান বা রাজনৈতিক চাপ নয়।
ছয়টি মানদণ্ড কি যান্ত্রিক চেকলিস্ট?
না। ছয়টি মানদণ্ডে টিক চিহ্ন দিলেই কোনো বক্তব্য অপরাধ প্রমাণিত হয় না। এগুলো বক্তব্যের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য ক্ষতি একসঙ্গে মূল্যায়নের কাঠামো।
Rabat Plan of Action গুরুতর উসকানির ক্ষেত্রে উচ্চ সীমা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়, যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ না হয়। পরিকল্পনাটিতে ছয়টি মানদণ্ডের প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ; কোনো একটি উপাদানকে বিচ্ছিন্নভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা উচিত নয়।
এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি: Rabat Plan of Action নিজে কোনো দেশের ফৌজদারি আইন নয়। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারভিত্তিক নির্দেশনামূলক কাঠামো। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় অপরাধ হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইনের বৈধতা, প্রমাণ, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং প্রযোজ্য মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে নির্ধারণ করতে হয়।
হেইট স্পিচ মোকাবিলায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কীভাবে রক্ষা করা যায়?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরম বা সীমাহীন অধিকার নয়। তবে এই অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। ICCPR-এর ১৯(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
১. আইনে নির্ধারিত হতে হবে। বিধিনিষেধের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট ও যথেষ্ট পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে।
২. বৈধ উদ্দেশ্য থাকতে হবে। যেমন অন্যের অধিকার বা সুনাম রক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা নৈতিকতা রক্ষা—অনুচ্ছেদে স্বীকৃত সীমার মধ্যে।
৩. প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। বিধিনিষেধের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা এবং তা বৈধ উদ্দেশ্যের তুলনায় অতিরিক্ত কঠোর কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির General Comment No. 34-এর ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ICCPR-এর ২০ অনুচ্ছেদের অধীনে নিষিদ্ধ বক্তব্যের ক্ষেত্রেও ১৯(৩) অনুচ্ছেদের শর্ত প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ, বিদ্বেষে উসকানি প্রতিরোধের উদ্দেশ্য থাকলেই যেকোনো আইন বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।
এর বাস্তব তাৎপর্য হলো, হেইট স্পিচ মোকাবিলার নামে সাংবাদিকতা, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আলোচনা, ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা, রাজনৈতিক বিরোধিতা বা জনস্বার্থের বিতর্ককে অযথা দমন করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতি, অনলাইন বক্তব্য এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো বক্তব্যের কারণে কোনো জনগোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তু হলে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্বেষ প্রতিরোধের ভাষা ব্যবহার করে বৈধ সমালোচনা বা ভিন্নমত দমনের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনটি কাজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বক্তব্য ও প্রমাণের নথি সংরক্ষণ। অভিযোগ ওঠার পর মূল বক্তব্য, প্রকাশের সময়, প্রাসঙ্গিক ভিডিও বা পোস্ট, সংশ্লিষ্ট লিংক এবং পরবর্তী ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সম্পাদিত ক্লিপ বা বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতির ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রেক্ষাপটভিত্তিক মূল্যায়ন। বক্তব্যের ভাষার পাশাপাশি বক্তার অবস্থান, উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণ, প্রচারের ব্যাপ্তি এবং সম্ভাব্য ক্ষতির প্রকৃতি বিবেচনা করতে হবে। অভিযোগ, যাচাইকৃত তথ্য এবং আইনি সিদ্ধান্তকে আলাদা রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিরোধ ও জবাবদিহি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। সচেতনতা, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, দ্রুত তথ্য যাচাই, লক্ষ্যবস্তু জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং প্রয়োজনে আইনসম্মত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া যেন অস্পষ্ট আইনের প্রয়োগ, নির্বিচার মামলা বা ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে নতুন মানবাধিকার সমস্যা তৈরি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
অনলাইন বক্তব্য মূল্যায়নে কোন প্রশ্নগুলো করা উচিত?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য নিয়ে হেইট স্পিচ বা উসকানির অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের জন্য নিচের প্রশ্নগুলো কাজে লাগতে পারে।
- মূল বক্তব্যটি কী ছিল এবং তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী?
- বক্তব্যটি কি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেছে?
- বক্তব্যে কি কেবল সমালোচনা বা অপমান রয়েছে, নাকি বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার আহ্বান রয়েছে?
- বক্তার অবস্থান ও শ্রোতাদের ওপর তার প্রভাব কতটা?
- বক্তব্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কী প্রমাণ পাওয়া যায়?
- বক্তব্যটি কতটা ছড়িয়েছে এবং কারা এর শ্রোতা?
- সম্ভাব্য ক্ষতির পক্ষে কী তথ্য রয়েছে? ক্ষতি কতটা বাস্তবসম্মত ও আসন্ন?
- বিধিনিষেধ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার আইনি ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
এগুলো প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা আইনি সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিকল্প নয়।
ঘৃণা প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষাও জরুরি
হেইট স্পিচ মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখা ঠিক নয়। একদিকে বৈষম্য ও সহিংসতায় উসকানির ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না; অন্যদিকে সেই ঝুঁকি মোকাবিলার নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অযৌক্তিকভাবে সংকুচিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। Rabat Plan of Action এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো দেয়। এটি বক্তব্যকে শুধু শব্দচয়নের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রেক্ষাপট, বক্তা, উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু, প্রচারের ব্যাপ্তি এবং সম্ভাব্য ক্ষতির আলোকে মূল্যায়নের নির্দেশনা দেয়।
বাংলাদেশে আইন প্রয়োগ, গণমাধ্যমের চর্চা কিংবা অনলাইন বক্তব্য পর্যবেক্ষণে এই কাঠামো প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে এর প্রয়োগ হতে হবে তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের দায়িত্ব শুধু ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়; এমন পরিবেশ নিশ্চিত করাও, যেখানে মানুষ ভয় ছাড়াই মত প্রকাশ করতে পারে, ক্ষমতার সমালোচনা করতে পারে এবং ভিন্নমত নিয়ে শান্তিপূর্ণ বিতর্কে অংশ নিতে পারে।
১. Rabat Plan of Action — OHCHR, A/HRC/22/17/Add.4
২. International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR) — OHCHR
