বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ একটি গৌরবোজ্জ্বল কিন্তু বেদনাময় অধ্যায়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা খুব ভালো করেই বুঝেছিল, একটি জাতিকে পরাজিত করতে হলে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করলেই হবে না; ধ্বংস করতে হবে সেই জাতির চিন্তাশক্তি, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং মুক্তচিন্তার মানুষদের। এ কারণেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় অসংখ্য শিক্ষক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীকে।
এই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন ছিলেন এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূতদের একজন, একজন সম্পাদক, লেখক, সমাজকর্মী এবং স্বাধীনতার পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর। যখন সামরিক শাসনের ভয়, সেন্সরশিপ এবং দমন-পীড়নের কারণে অনেকেই নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন সেলিনা পারভীন তাঁর সম্পাদিত সাময়িকী ‘শিলালিপি’-এর মাধ্যমে বাঙালির জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শুধু কলম দিয়েই লড়েননি। বিভিন্ন স্মৃতিচারণ, গবেষণা এবং ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন, আশ্রয় দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর এই দৃঢ় অবস্থানই তাঁকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাত্র তিন দিন আগে, আলবদর-রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ঢাকার বাসা থেকে অপহরণ করে। এরপর তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে উদ্ধার হওয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মরদেহের মধ্যে তাঁর মরদেহও শনাক্ত করা হয়।
তিনি শুধু একজন শহীদ সাংবাদিক নন; তিনি বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকতার ইতিহাসে সাহস, পেশাগত সততা এবং দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতীক। স্বাধীনতার জন্য তাঁর আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণমাধ্যম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজও সেলিনা পারভীনের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর স্বাধীন বিবেক, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
সেলিনা পারভীন ১৯৩১ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার (বর্তমান ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলা) এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী, মেধাবী এবং সমাজসচেতন। পরিবারের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর শৈশব কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন উপমহাদেশে নারীশিক্ষা ও নারীর কর্মজীবনে অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন।
কৈশোর থেকেই বই পড়া, লেখালেখি এবং সমসাময়িক সমাজ নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা এবং মুক্তচিন্তাই সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি। পরবর্তীকালে এই বিশ্বাসই তাঁকে সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার জগতে নিয়ে আসে।
তাঁর সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, সেলিনা পারভীন ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা এবং দায়িত্বশীল একজন মানুষ। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা, কিন্তু নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। সমাজে নারীর মর্যাদা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি সবসময় সচেতন ছিলেন।
এই মানবিক ও প্রগতিশীল মূল্যবোধই পরবর্তীকালে তাঁর সাংবাদিকতা, সম্পাদনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার ভিত্তি তৈরি করে।
সাংবাদিকতা জীবন: কলমকে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার
সেলিনা পারভীনের সাংবাদিকতা কোনো পেশাগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল তাঁর আদর্শ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দেশপ্রেমের প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংবাদপত্র কেবল খবর পরিবেশনের মাধ্যম নয়—এটি মানুষের চিন্তা-চেতনা জাগিয়ে তোলার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার এবং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
ষাটের দশকের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্য এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন সেলিনা পারভীন লেখালেখি ও সম্পাদনার মাধ্যমে সেই সময়ের জাতীয় চেতনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তিনি সমাজ, সংস্কৃতি, নারী অধিকার এবং বাঙালির আত্মপরিচয় নিয়ে নিয়মিত লিখতেন।
তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্পষ্ট বক্তব্য, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব। তিনি কখনোই সাংবাদিকতাকে ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের অধিকার ও সত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
‘শিলালিপি’: একটি সাময়িকী, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন
সেলিনা পারভীনের সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ‘শিলালিপি’ সাময়িকীর প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে নারীদের সম্পাদিত সাময়িকী ছিল অত্যন্ত বিরল। এই বাস্তবতায় ‘শিলালিপি’ শুধু একটি সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
পত্রিকাটিতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, শিক্ষা, নারী অধিকার এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হতো। তরুণ লেখকদের লেখাও তিনি উৎসাহের সঙ্গে প্রকাশ করতেন। তাঁর সম্পাদনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—গুণগত মানের সঙ্গে আপস না করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
পিআইবি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শাসনের কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যেও তিনি স্বাধীনচেতা লেখালেখি অব্যাহত রাখেন। পাকিস্তানি সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ার অন্যতম কারণও ছিল তাঁর সম্পাদিত এই সাময়িকী এবং স্বাধীনতার পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান।
নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সেলিনা পারভীনের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়, কারণ তিনি এমন এক সময়ে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন সংবাদমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সাংবাদিকতা কিংবা সম্পাদনা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের পেশা নয়; যোগ্যতা, সাহস এবং সততাই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়। তাঁর নেতৃত্বে ‘শিলালিপি’ শুধু পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়নি; অনেক নারীও লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় উৎসাহিত হয়েছেন। নারীশিক্ষা, নারীর আত্মমর্যাদা, সামাজিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ নিয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন।
আব্দুল হাই শিকদারের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, সেলিনা পারভীন ছিলেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, কর্মঠ এবং দৃঢ়চেতা একজন মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতা কখনোই তাঁর কর্মস্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর অবস্থান
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের সময় সেলিনা পারভীনের লেখালেখিতে বাঙালির জাতীয়তাবাদ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম একটি ঐতিহাসিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তাঁর অবস্থান আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিজের সমর্থন গোপন করেননি।
এই সময় তাঁর বাসা ও তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিসর ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন এবং নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা না ভেবেই তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন। এই কর্মকাণ্ডই পরবর্তীকালে তাঁকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী আলবদর বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
মুক্তিযুদ্ধে সেলিনা পারভীনের ভূমিকা: নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার পর সমগ্র পূর্ববাংলা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদপত্রের কার্যালয়, রাজনৈতিক নেতাদের বাসভবন এবং সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়; সেন্সরশিপ ও দমন-পীড়নের কারণে অধিকাংশ গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ হারায়।
এই পরিস্থিতিতে সেলিনা পারভীন নিজের আদর্শ থেকে একচুলও সরে আসেননি। যুদ্ধকালীন সময়েও তিনি স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে কাজ চালিয়ে যান। পাকিস্তানি সামরিক সরকারের ভয়ভীতি, নজরদারি এবং সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের আশঙ্কা সত্ত্বেও তিনি আত্মগোপনে না গিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল কেবল তথ্য প্রকাশের পেশা নয়; এটি ছিল জাতির সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি নৈতিক দায়িত্ব।
মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় নীরব অবদান
মুক্তিযুদ্ধে সেলিনা পারভীনের অবদান সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন।
পিআইবির তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা দিতেন। প্রয়োজনে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা করতেন। যুদ্ধকালীন ঢাকায় এমন কর্মকাণ্ড ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের সহযোগী আলবদর ও আলশামস বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালাত। তবু সেলিনা পারভীন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে দেশের স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, তিনি প্রায়ই বলতেন—দেশ স্বাধীন না হলে মানুষের মর্যাদা, নারীর অধিকার কিংবা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা—কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত হবে না। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি মুক্তিযুদ্ধকে নিজের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
পাকিস্তানি বাহিনীর নজরদারিতে
মুক্তিযুদ্ধ যতই শেষ পর্যায়ের দিকে এগোতে থাকে, পাকিস্তানি সামরিক সরকার ততই বুঝতে পারে যে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পরাজয় অনিবার্য। তখন তারা একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র শুরু করে—বাংলাদেশের মেধাবী ও প্রভাবশালী মানুষদের নির্মূল করার পরিকল্পনা।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করা হয়। স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া সাংবাদিকদেরও বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়। সেলিনা পারভীন ছিলেন সেই তালিকার অন্যতম ব্যক্তি।
তাঁর সম্পাদিত ‘শিলালিপি’, স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ভূমিকার কারণে তিনি পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নজরে চলে আসেন। বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, যুদ্ধের শেষ মাসগুলোতে তাঁকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি।
ভয়কে জয় করেছিলেন যে নারী
১৯৭১ সালের ঢাকা ছিল আতঙ্কের শহর। প্রতিদিন মানুষ নিখোঁজ হচ্ছিল, অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জনের কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতেও সেলিনা পারভীন তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করা মানে অন্যায়কে শক্তিশালী করা। তাই তিনি ভয়কে নিজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেননি।
আব্দুল হাই শিকদারের স্মৃতিচারণে সেলিনা পারভীনের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা একজন দৃঢ়চেতা, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি জানতেন, তাঁর কর্মকাণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও তিনি পিছু হটেননি।
বিজয়ের প্রাক্কালে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। এই সময় আলবদর বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়া—যাতে বিজয়ের পর দেশ পুনর্গঠনে মেধাবী মানুষদের অভাব দেখা দেয়।
এই নৃশংস অভিযানের শিকার হন সাংবাদিক সেলিনা পারভীনও। ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তাঁর জীবনের শেষ স্বাধীন দিন। সেদিন তাঁকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা বহু চেষ্টা করেও এরপর আর তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। সেই অপহরণের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সাংবাদিকতা হারায় তার অন্যতম সাহসী নারী সম্পাদককে।
অপহরণ, নির্যাতন ও শহীদ হওয়া
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরাজয় তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল একের পর এক মুক্ত হতে শুরু করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা একটি ভয়াবহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে—বাংলাদেশের মেধাবী, প্রগতিশীল এবং স্বাধীনতার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের প্রধান সহযোগী ছিল আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী ও সংস্কৃতিকর্মীদের তালিকা তৈরি করে একে একে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল অজ্ঞাত স্থানে। সেলিনা পারভীনও ছিলেন সেই তালিকার একজন।
১৩ ডিসেম্বর: শেষ বিদায়
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আলবদর সদস্যদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর লোকজন ঢাকায় তাঁর বাসভবনে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁকে জোরপূর্বক বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা ধারণাও করতে পারেননি যে এটাই হবে তাঁদের শেষ দেখা।
অপহরণের পর আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা বিভিন্ন স্থানে তাঁর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথাও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন সেই সময়ে শত শত মানুষের মতো তিনিও হয়ে যান নিখোঁজ।
যুদ্ধের শেষ কয়েক দিনে এমন অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের অপেক্ষার অবসান হয়েছে স্বাধীনতার পরে, বধ্যভূমিতে।
রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে উদ্ধার
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। বিজয়ের আনন্দের মধ্যেই শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক অনুসন্ধান। অপহৃত বুদ্ধিজীবীদের খোঁজে মানুষ ছুটে যায় ঢাকার বিভিন্ন নির্জন এলাকায়। স্বাধীনতার পর রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে অসংখ্য শহীদ বুদ্ধিজীবীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যেই ছিল সেলিনা পারভীনের মরদেহ।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, তাঁর মরদেহে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। নির্মম অত্যাচারের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে অপহরণের পর তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছিল কিংবা কীভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছিল—সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য আজও পাওয়া যায়নি। এই অজানা অধ্যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক দিক।
একটি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি
সেলিনা পারভীনের মৃত্যু কেবল একজন সাংবাদিকের মৃত্যু ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সম্পাদক, লেখক, সংগঠক এবং নারী জাগরণের কর্মী। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু বিজয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী একটি উদীয়মান রাষ্ট্রকে তার একজন মেধাবী কণ্ঠ থেকে বঞ্চিত করে।
সহকর্মীদের স্মৃতিতে সেলিনা পারভীন
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ গ্রন্থে লেখক আব্দুল হাই শিকদার সেলিনা পারভীনকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁকে একজন দৃঢ়চেতা, মানবিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে মানুষের কল্যাণ এবং দেশের স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করতেন।
তাঁর সহকর্মী ও পরিচিতজনদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন বিনয়ী, আন্তরিক এবং কর্মনিষ্ঠ একজন মানুষ—যিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য অনেক সময় জীবন দিয়েও দিতে হয়।
ইতিহাসের কাছে তাঁর পরিচয়
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য নারী বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউ চিকিৎসা দিয়েছেন, কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ তথ্য আদান-প্রদানে ভূমিকা রেখেছেন।
সেলিনা পারভীন সেই নারীদেরই একজন, যিনি কলম, বিবেক এবং আদর্শ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর বিশ্বাসের কারণে। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর স্বাধীনচেতা সাংবাদিকতার কারণে। কিন্তু তাঁর আদর্শকে হত্যা করা যায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি চিরকাল স্মরণীয় থাকবেন শহীদ সাংবাদিক, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংগ্রামী হিসেবে।
উত্তরাধিকার: বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সেলিনা পারভীনের স্থান
শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের জীবন ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি এমন এক সময়ে সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল সীমিত এবং নারীদের জন্য এই পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন সাংবাদিকের প্রকৃত দায়িত্ব কেবল সংবাদ সংগ্রহ বা প্রকাশ নয়; সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াও সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবিচল সমর্থন তাঁকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। কিন্তু তিনি নিজের নীতি ও আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। আজও বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের কাছে সেলিনা পারভীন পেশাগত সততা, সাহস এবং দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর গুরুত্ব
FoEBD-এর দৃষ্টিকোণ থেকে সেলিনা পারভীনের আত্মত্যাগ শুধু মুক্তিযুদ্ধের একটি ঘটনা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তিনি কোনো অস্ত্রধারী সেনাসদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সম্পাদক। একজন লেখক। একজন সাংবাদিক। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর চিন্তার জন্য। তাঁর কলমের জন্য।তাঁর বিশ্বাসের জন্য। এই কারণেই সেলিনা পারভীনের নাম বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া সাংবাদিকদের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
FoEBD মনে করে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ওপরও আঘাত।
নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণা
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো আইনি জটিলতা, কখনো সহিংসতা কিংবা ভয়ভীতি—এসবের মধ্যেও সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেলিনা পারভীনের জীবন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেয়—
- সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো কখনো সহজ ছিল না।
- স্বাধীন সাংবাদিকতার মূল্য অনেক সময় জীবন দিয়েও দিতে হয়েছে।
- সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো রাষ্ট্রের দান নয়; এটি বহু মানুষের আত্মত্যাগের ফসল।
তাঁর আত্মত্যাগ তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার জন্যও একটি নৈতিক শিক্ষা।
তথ্যসূত্র:
১. রশীদ হায়দার (সম্পা.), স্মৃতি: ১৯৭১, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। (আব্দুল হাই শিকদার, “শহীদ সেলিনা পারভীন”)।
২. বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (PIB), Martyred Journalists, “Selina Parvin” অধ্যায়। এতে তাঁর সাংবাদিকতা, শিলালিপি, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা এবং শহীদ হওয়ার বিবরণ রয়েছে।
৩. প্রথম আলো, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন বিষয়ক প্রতিবেদন।
৪. Banglapedia, Selina Parvin—জীবনী ও ঐতিহাসিক তথ্য।
৫. The Daily Star, Shilalipi: A Legend Carved in Stone—সেলিনা পারভীনের জীবন ও তাঁর সম্পাদিত শিলালিপি পত্রিকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
৬. Dhaka Tribune, Sensing defeat, Al-Badr struck and silenced Selina Parveen—অপহরণ ও শহীদ হওয়ার প্রেক্ষাপট।
তথ্য প্রদানে যোগাযোগ করুন:
শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য, ছবি, দলিল, স্মৃতিচারণ বা সংশোধনী থাকলে যোগাযোগ করুন:
📧 ই-মেইল: info@foebd.org
📱 মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ: +৮৮০১৭৫১৯৬৩৪৮৪
সম্পাদকীয় নোট
এই ডকুমেন্টটি FoEBD-এর “বাংলাদেশের শহীদ ও নিহত সাংবাদিক আর্কাইভ” প্রকল্পের অংশ। এতে ব্যবহৃত তথ্য বাংলা একাডেমির স্মৃতিচারণ, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (PIB)-এর প্রকাশনা এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক উৎসের ভিত্তিতে সংকলিত ও সম্পাদিত হয়েছে। বিভিন্ন উৎসে তথ্যগত পার্থক্য থাকলে তা যাচাই করে উপস্থাপন করা হয়েছে। নতুন তথ্য, সরকারি নথি, পারিবারিক দলিল বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া গেলে এই ডকুমেন্ট হালনাগাদ করা হবে।





