প্রবীণ সাংবাদিক নূরুল হাসান খান আর নেই। ১৬ আগস্ট ২০২৬ রাজধানীর ডেল্টা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। এর আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কানাডার অন্টারিওর লেকরিজ হেলথ হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন শোক জানিয়েছে।
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামের সন্তান নূরুল হাসান খান বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল দৈনিক দিনকাল এবং অর্থনৈতিক সাংবাদিকতা। একই সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁর পরিচয় শুধু একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের একজন সংগঠকও।
দিনকাল থেকে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতায়
নূরুল হাসান খানের সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় দৈনিক দিনকালকে ঘিরে। বিভিন্ন সময় তিনি পত্রিকাটিতে প্রতিবেদক, বিশেষ প্রতিনিধি ও প্রধান প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মৃত্যুসংবাদেও তাঁকে দৈনিক দিনকালের প্রধান প্রতিবেদক ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তাঁর সাংবাদিকতার বিশেষ পরিচয় ছিল অর্থনৈতিক রিপোর্টিং। পুরোনো বিভিন্ন গবেষণা ও সংলাপের নথিতে তাঁকে দৈনিক দিনকালের Economic Reporter এবং পরবর্তী সময়ে Senior Economic Reporter হিসেবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতি, অর্থনৈতিক নীতি ও সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে রিপোর্ট করেছেন।
এই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল আজকের মতো দ্রুতগতির ডিজিটাল সাংবাদিকতা নয়। তথ্য সংগ্রহ, সরকারি নথি, বাজেট, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদ তৈরি করতে হতো। সেই সময়ের অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার ধারায় নূরুল হাসান খান নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠক
অর্থনৈতিক সাংবাদিকতায় তাঁর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পেশাগত সংগঠন Economic Reporters Forum (ERF)-এর সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ERF-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি সংগঠনটির ২০০৪–২০০৫ মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
একজন অর্থনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে তাঁর এই সংগঠন-সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার জায়গা তৈরিতে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা রয়েছে। নূরুল হাসান খান সেই সাংগঠনিক কাজেও সক্রিয় ছিলেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে নেতৃত্ব
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। ২০১১ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়েও প্রেস ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তাঁর পরিচয় সাংবাদিক মহলে সুপরিচিত ছিল। মৃত্যুর পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সঙ্গেও নূরুল হাসান খানের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। একাধিক প্রতিবেদনে তাঁকে ডিআরইউর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুক্ত এবং স্থায়ী সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিআরইউ বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সংগঠন। সংগঠনটির শুরুর সময় থেকে এর সঙ্গে যুক্ত থাকা নূরুল হাসান খানের সাংবাদিক-সংগঠক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলসহ সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখি
নূরুল হাসান খানের কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর বই। তাঁর নামে প্রকাশিত একটি গ্রন্থ হলো ‘রিপোর্টারের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির এক যুগ (১৯৯১–২০০৩)’। বইটি কথামেলা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত। বইটির ১৯২ পৃষ্ঠা এবং ISBN নম্বর 9847033600071। বইয়ের লেখক হিসেবে নূরুল হাসান খানের নাম উল্লেখ রয়েছে।
বইটির বিষয়বস্তু তাঁর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একজন রিপোর্টারের দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে এতে। ফলে বইটি তাঁর সাংবাদিকতা-জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
একজন সাংবাদিক যখন নিজের দীর্ঘ সময়ের রিপোর্টিং অভিজ্ঞতাকে বইয়ের মাধ্যমে ধরে রাখেন, তখন সেটি ব্যক্তিগত লেখালেখির বাইরে গিয়ে একটি সময়ের দলিলও হয়ে উঠতে পারে। নূরুল হাসান খানের এই বই সেই দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সাংবাদিকতার বাইরেও সংগঠক
নূরুল হাসান খান বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সময় তাঁকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংবাদিক সমিতি-ঢাকার সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য দায়িত্বে দেখা যায়।
এ ধরনের সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা দেখায়, সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের পেশা ছিল না; সহকর্মীদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক তৈরি এবং সাংবাদিকদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
শেষ সময়েও সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত
জীবনের শেষ পর্যায়েও নূরুল হাসান খান সাংবাদিক সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে পরিচিত মুখ ছিলেন। ২০২৬ সালের জুনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি তাঁর অসুস্থতার খবর জানিয়ে তাঁর জন্য দোয়া কামনা করেছিল। তখন তিনি কানাডার অন্টারিওর লেকরিজ হেলথ হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। দেশে ফিরে ঢাকার ডেল্টা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় প্রেস ক্লাব, ডিআরইউ, বিএফইউজে, ডিইউজে ও ইআরএফের নেতারা শোক প্রকাশ করেন। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরাও তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।
সাংবাদিকতার প্রজন্ম বদলায়। সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তি বদলায়। রিপোর্টিংয়ের ধরন বদলায়। কিন্তু যারা দীর্ঘ সময় ধরে সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, পেশাগত সংগঠন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা লিখিতভাবে রেখে যান, তাঁদের কাজ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্মৃতি ও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে।
নূরুল হাসান খানের সাংবাদিকতা-জীবনও সেই ধারার একটি অংশ। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গন হারাল দীর্ঘদিনের এক পরিচিত মুখ ও পেশাগত সংগঠককে। তাঁর কাজ, লেখা এবং সহকর্মীদের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন।
নূরুল হাসান খানের প্রতি শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), Economic Reporters Forum (ERF), Economic Reporters Forum (ERF), Centre for Policy Dialogue (CPD), The Daily New Nation, মেডিভয়েস





