October 29, 2026 3:20 pm
October 29, 2026 3:20 pm

আল মুজাহিদীকে স্মরণ: কবিতা, সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার জীবন

আল মুজাহিদীকে স্মরণ: কবিতা, সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার জীবন

আল মুজাহিদী ছিলেন কবি।
ছিলেন সাংবাদিক।
ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক।
ছিলেন গবেষক ও লেখক।

বাংলা সাহিত্য ও সংবাদপত্রে তাঁর পথচলা ছিল দীর্ঘ। কয়েক দশক ধরে তিনি লিখেছেন। সম্পাদনা করেছেন। নতুন লেখকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। সাহিত্যকে সংবাদপত্রের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

ষাটের দশকের কবি

আল মুজাহিদী ১৯৪৩ সালে টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ষাটের দশকের বাংলা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি গল্প লিখেছেন। উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থ। শিশুসাহিত্যেও কাজ করেছেন। অনুবাদ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থের সংখ্যাই ২০টির বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’। তাঁর লেখার পরিসর ছিল বিস্তৃত। সাহিত্য ছিল তাঁর প্রধান পরিচয়। কিন্তু তাঁর কাজ শুধু নিজের লেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না।

সংবাদপত্রের সাহিত্য সম্পাদক

আল মুজাহিদীর কর্মজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে দৈনিক ইত্তেফাকে। তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। এই সময়ে ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতার সঙ্গে তাঁর নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যায়। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি শুধু লেখা সম্পাদনা করতেন না। লেখক ও কবিদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

বিশেষ করে তরুণ লেখকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণে এসেছে। তাঁর সম্পাদকের কক্ষটি অনেক লেখকের কাছে ছিল দেখা করার একটি জায়গা। নতুন লেখা নিয়ে সেখানে আলোচনা হতো। লেখা প্রকাশের সুযোগ নিয়েও কথা হতো। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লেখক ও পাঠকের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করেছিলেন।

ইত্তেফাকের পর

ইত্তেফাকের দীর্ঘ অধ্যায়ের পরও তিনি সাহিত্য সম্পাদনা থেকে দূরে সরে যাননি। ২০১২ সালে তিনি যায়যায়দিনে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পরে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ষান্মাসিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’। অর্থাৎ সংবাদপত্রের চাকরি তাঁর কাছে শুধু একটি পেশাগত দায়িত্ব ছিল না। সাহিত্য সম্পাদনার কাজও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে গেছেন।

সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তার পরিসর

আল মুজাহিদীর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাংবাদিকতা। ২০০৬ সালের একটি প্রতিবেদনে তাঁকে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ও কবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে সংবাদপত্রের ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর বক্তব্যের কথাও পাওয়া যায়। তবে তাঁকে সরাসরি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। বরং তাঁর কাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি দীর্ঘ সময় সংবাদপত্রের সাহিত্য পরিসর পরিচালনা করেছেন। লেখক ও কবিদের জন্য সেই পরিসরটি সক্রিয় রেখেছেন। এটিই মতপ্রকাশের জগতের সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে স্পষ্ট সম্পর্ক।

আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ

আল মুজাহিদীর জীবন সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছাত্রজীবনে তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। এ সময় তাঁকে কারাবরণও করতে হয় বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ আছে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাঁর প্রজন্মের অনেক কবি ও লেখকের মতো তাঁর সাহিত্যেও দেশ, সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের নানা অভিজ্ঞতার ছাপ আছে।

অর্ধশতাধিক বই

আল মুজাহিদীর সাহিত্যকর্মের পরিসর ছিল বড়। ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘যুদ্ধ নাস্তি’, ‘মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা’, ‘প্রিজন ভ্যান’, ‘দিদেলাস ও ল্যাবিরিস্থ’, ‘প্রাচ্য পৃথিবী’, ‘পৃথিবীর ধুলো’সহ তাঁর বহু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি উপন্যাসও লিখেছেন। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম প্রেম’, ‘চাঁদ ও চিরকুট’, ‘লাল বাতির হরিণ’, ‘রূপোলি রোদ্দুর’ ও ‘খোকার যুদ্ধ’। গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ এবং শিশুসাহিত্যেও তাঁর কাজ ছিল। তাঁর সাহিত্যকর্মের এই বৈচিত্র্যই তাঁকে শুধু কবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

একুশে পদক

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য আল মুজাহিদী ২০০৩ সালে একুশে পদক পান। এটি ছিল তাঁর সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম বড় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তিনি আরও কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার এবং জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কারের কথা বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

নতুন লেখকদের পাশে

একজন সাহিত্য সম্পাদকের কাজ শুধু লেখা ছাপা নয়। কোন লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাবে, কোন লেখক নতুন করে সুযোগ পাবেন, সাহিত্যপাতায় কোন বিষয় জায়গা পাবে—এসব সিদ্ধান্তও একজন সম্পাদকের কাজের অংশ।

আল মুজাহিদী দীর্ঘ সময় সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতিচারণগুলোতে নতুন লেখকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা এসেছে। কেউ লেখা নিয়ে তাঁর কাছে গেছেন। কেউ পরামর্শ পেয়েছেন। কেউ পেয়েছেন প্রকাশের সুযোগ।

তাই তাঁর উত্তরাধিকার শুধু তাঁর নিজের বইয়ে নেই। যেসব লেখক তাঁর সম্পাদনার সময় সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় জায়গা পেয়েছেন, তাঁদের কাজের মধ্যেও তাঁর সম্পাদনাজীবনের কিছুটা ছাপ রয়ে গেছে।

শেষ অধ্যায়

জীবনের শেষ দিকে আল মুজাহিদী বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির সমস্যা ছিল।

২৩ এপ্রিল তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৫ জুন তাঁকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৬ জুন থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন বলে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।

১৯ জুন ২০২৬ দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

পরদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আল মুজাহিদী তাই শুধু একজন কবি হিসেবে নয়, বাংলা সাহিত্য ও সংবাদপত্রের দীর্ঘ এক সময়ের অংশ হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়তো তাঁর লেখা পড়া এবং যে সাহিত্যচর্চাকে তিনি দীর্ঘ জীবন ধরে এগিয়ে নিয়েছেন, সেটিকে সামনে রাখা।

FoEBD শ্রদ্ধার সঙ্গে কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদীকে স্মরণ করছে।

তথ্যসূত্র


সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যের প্রতিবাদ, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম
সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান

সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যের প্রতিবাদ, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

সাংবাদিকদের পেশাগত সততা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন

বিস্তারিত »
ব্রিটেনে মিডিয়া এক্সিলেন্স সম্মাননা পেলেন আ স ম মাসুম
মিডিয়া ও গণমাধ্যম

ব্রিটেনে মিডিয়া এক্সিলেন্স সম্মাননা পেলেন আ স ম মাসুম

ব্রিটিশ বাংলাদেশি গণমাধ্যমে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মিডিয়া এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন সাংবাদিক আ স ম মাসুম। ২৫ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে আয়োজিত চতুর্থ ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাওয়ার্ড

বিস্তারিত »
পাবনার সাংবাদিকতায় স্মরণীয় নাম আব্দুল জব্বার
স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

পাবনার সাংবাদিকতায় স্মরণীয় নাম আব্দুল জব্বার

সাংবাদিকতা, কলাম লেখা ও বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল জব্বার। সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের নানা

বিস্তারিত »
গণমাধ্যম সংস্কারে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
মিডিয়া ও গণমাধ্যম

গণমাধ্যম সংস্কারে পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তনের দাবি

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। তাঁরা বলেছেন, বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে গণমাধ্যমের দীর্ঘদিনের সংকট দূর হবে

বিস্তারিত »
‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ

১৯২৪ সালের অক্টোবর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। বইটির সব কপি জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের অভিযোগ

বিস্তারিত »
রথো রাফি: সাংবাদিকতা, কবিতা ও অনুবাদে স্বতন্ত্র এক কণ্ঠ
স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

রথো রাফি: সাংবাদিকতা, কবিতা ও অনুবাদে স্বতন্ত্র এক কণ্ঠ

কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি বাংলা কবিতায় নিজস্ব কণ্ঠ তৈরি করেছিলেন। কবিতার পাশাপাশি বিশ্বকবিতার অনুবাদ এবং সাংবাদিকতায়ও রেখেছেন অবদান। দীর্ঘ দুই দশকের কবিতাচর্চা, ছোটকাগজের

বিস্তারিত »