October 29, 2026 6:23 am
October 29, 2026 6:23 am

‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ

‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ

১৯২৪ সালের অক্টোবর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। বইটির সব কপি জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের অভিযোগ ছিল, বইটিতে এমন বক্তব্য রয়েছে, যা ব্রিটিশ ভারতের আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা সৃষ্টি করে। এ জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারার উল্লেখ করা হয়।

বাজেয়াপ্তির সরকারি বিজ্ঞপ্তির বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে The Daily Star-এর ‘Looking Back on Kazi Nazrul Islam’s Bisher Banshi’ শীর্ষক লেখায়। সেখানে শিশির করের নিষিদ্ধ নজরুল বই এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির বরাত দেওয়া হয়েছে।

প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের আগস্টে

বিষের বাঁশী একটি কাব্যগ্রন্থ। এতে ২৭টি কবিতা রয়েছে বলে The Daily Star-এর গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বইটি ১৯২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন “কল্লোল” পত্রিকার সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ।

নজরুল প্রথমে বইটির নাম রাখতে চেয়েছিলেন অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ড। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখেন বিষের বাঁশী। বইয়ের ‘কৈফিয়ত’ শীর্ষক ভূমিকায় তিনি নাম পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত গবেষণামূলক লেখায় বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আগে অভিযোগ

বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত বইটি সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ১৯২৪ সালের ২১ আগস্ট সরকারের পাবলিক ইনস্ট্রাকশন বিভাগকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে বইটির কয়েকটি শব্দ ও বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। পরে বিষয়টি পুলিশ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে যায়।

The Daily Star-এর লেখায় বলা হয়েছে, ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত পুলিশ কমিশনারকে বইটি সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বইটির বক্তব্য তরুণদের বিদ্রোহ ও আইন অমান্য করতে উৎসাহিত করতে পারে।

সরকারি আদেশ ও তারিখ

প্রকাশিত সূত্রে বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্তির আদেশের তারিখ ২২ অক্টোবর ১৯২৪ বলা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দিন চিফ সেক্রেটারি এ. এন. মোবারলির স্বাক্ষরে আদেশ জারি হয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষক বাতায়নের একটি তথ্যভান্ডারে বইটি বাজেয়াপ্ত হওয়ার তারিখ ২৪ অক্টোবর ১৯২৪ উল্লেখ রয়েছে।

এ দুটি তারিখের পার্থক্য নিষ্পত্তি করার মতো মূল গেজেটের স্ক্যান এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তাই ২২ অক্টোবরকে আদেশ জারির তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে; ২৪ অক্টোবরের উল্লেখটি অন্য একটি প্রকাশিত সূত্রের তথ্য হিসেবে রাখা হলো।

বইয়ের কপি আটকানোর চেষ্টা

সরকারি আদেশে বইটির সব কপি বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছিল। বইটি কোথায় ছাপা হয়েছিল এবং কে প্রকাশ করেছিলেন, বিজ্ঞপ্তিতে তার উল্লেখ ছিল।

The Daily Star-এর লেখায় বলা হয়েছে, বইটি আটকাতে পুলিশ সম্ভাব্য বইয়ের দোকান ও ছাপাখানায় তল্লাশি চালায়। হুগলিতে নজরুলের বাড়িতেও তল্লাশির কথা ওই লেখায় রয়েছে। একই লেখায় নজরুলের বন্ধু মুজফ্‌ফর আহমদের স্মৃতিকথার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার পরও তরুণেরা বইটি সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। কিছু বই বাঁধাইকারীর মাধ্যমে গোপনে বিক্রি করা হতো বলেও স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

বিষের বাঁশীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে বলে The Daily Star-এর গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ রয়েছে। একই লেখায় বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগের একটি নথিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছিল। পরে ১৯৪৫ সালে সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে।

তবে এই অনুসন্ধানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মূল সরকারি আদেশ বা গেজেটের কপি সরাসরি পাওয়া যায়নি। তাই ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের তারিখটি প্রকাশিত গবেষণামূলক সূত্রের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হলো।

তথ্যসূত্র

১. ‘Looking Back on Kazi Nazrul Islam’s Bisher Banshi’ — The Daily Star

২. ‘নিষিদ্ধের শতবর্ষ’ — প্রথম আলো

৩. ‘ইসলাম, কাজী নজরুল’ — বাংলাপিডিয়া

৪. ‘নজরুলের প্রথম বাজেয়াপ্ত গ্রন্থ’–সংক্রান্ত তথ্য — শিক্ষক বাতায়ন


‘যুগবাণী’: নজরুলের যে বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘যুগবাণী’: নজরুলের যে বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার

১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বইটির সব কপি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া

বিস্তারিত »
‘সংস্কৃতির সংকট’: নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বদরুদ্দীন উমরের বই
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘সংস্কৃতির সংকট’: নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বদরুদ্দীন উমরের বই

‘সংস্কৃতির সংকট’-এ বাঙালি সংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি, ঊনিশ শতকে মুসলিম শিক্ষা ও মাতৃভাষা চর্চা, একুশে ফেব্রুয়ারি ও সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার মাধ্যম, ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং

বিস্তারিত »
পাকিস্তান আমলে নিষেধাজ্ঞা ও বাজেয়াপ্তির মুখে পড়া সত্যেন সেনের ‘আলবেরুনী’-র প্রতীকী চিত্র।
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘আলবেরুনী’: পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ এক ঐতিহাসিক উপন্যাস

সত্যেন সেন ছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক সংগ্রাম—দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি শ্রমিক

বিস্তারিত »
‘সত্যের মতো বদমাশ’: অশ্লীলতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত এক গল্পগ্রন্থ
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘সত্যের মতো বদমাশ’: অশ্লীলতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত এক গল্পগ্রন্থ

আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক। ১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক ষাটের দশকেই বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র

বিস্তারিত »
১৯৮৩ সালে সামরিক শাসনের সময়ে মিনার মনসুরের ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ বাজেয়াপ্ত হওয়ার প্রতীকী চিত্র।
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’: সামরিক শাসনে বাজেয়াপ্ত এক কাব্যগ্রন্থ

মিনার মনসুর বাংলাদেশের কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। তাঁর জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বরলিয়া গ্রামে। লেখালেখির শুরু সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ

বিস্তারিত »
একটি কবিতা, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও দীর্ঘ নির্বাসনের প্রতীকী চিত্র।
তথ্যভাণ্ডার

দাউদ হায়দার: একটি কবিতা, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও নির্বাসন — ১৯৭৪

দাউদ হায়দার ছিলেন বাংলাদেশের কবি, লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তিনি তরুণ কবি হিসেবে পরিচিতি পান এবং দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।

বিস্তারিত »