১৯২৪ সালের অক্টোবর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। বইটির সব কপি জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের অভিযোগ ছিল, বইটিতে এমন বক্তব্য রয়েছে, যা ব্রিটিশ ভারতের আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা সৃষ্টি করে। এ জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারার উল্লেখ করা হয়।
বাজেয়াপ্তির সরকারি বিজ্ঞপ্তির বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে The Daily Star-এর ‘Looking Back on Kazi Nazrul Islam’s Bisher Banshi’ শীর্ষক লেখায়। সেখানে শিশির করের নিষিদ্ধ নজরুল বই এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির বরাত দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের আগস্টে
বিষের বাঁশী একটি কাব্যগ্রন্থ। এতে ২৭টি কবিতা রয়েছে বলে The Daily Star-এর গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বইটি ১৯২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন “কল্লোল” পত্রিকার সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ।
নজরুল প্রথমে বইটির নাম রাখতে চেয়েছিলেন অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ড। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখেন বিষের বাঁশী। বইয়ের ‘কৈফিয়ত’ শীর্ষক ভূমিকায় তিনি নাম পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত গবেষণামূলক লেখায় বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আগে অভিযোগ
বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত বইটি সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ১৯২৪ সালের ২১ আগস্ট সরকারের পাবলিক ইনস্ট্রাকশন বিভাগকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে বইটির কয়েকটি শব্দ ও বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। পরে বিষয়টি পুলিশ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে যায়।
The Daily Star-এর লেখায় বলা হয়েছে, ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত পুলিশ কমিশনারকে বইটি সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বইটির বক্তব্য তরুণদের বিদ্রোহ ও আইন অমান্য করতে উৎসাহিত করতে পারে।
সরকারি আদেশ ও তারিখ
প্রকাশিত সূত্রে বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্তির আদেশের তারিখ ২২ অক্টোবর ১৯২৪ বলা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দিন চিফ সেক্রেটারি এ. এন. মোবারলির স্বাক্ষরে আদেশ জারি হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষক বাতায়নের একটি তথ্যভান্ডারে বইটি বাজেয়াপ্ত হওয়ার তারিখ ২৪ অক্টোবর ১৯২৪ উল্লেখ রয়েছে।
এ দুটি তারিখের পার্থক্য নিষ্পত্তি করার মতো মূল গেজেটের স্ক্যান এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তাই ২২ অক্টোবরকে আদেশ জারির তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে; ২৪ অক্টোবরের উল্লেখটি অন্য একটি প্রকাশিত সূত্রের তথ্য হিসেবে রাখা হলো।
বইয়ের কপি আটকানোর চেষ্টা
সরকারি আদেশে বইটির সব কপি বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছিল। বইটি কোথায় ছাপা হয়েছিল এবং কে প্রকাশ করেছিলেন, বিজ্ঞপ্তিতে তার উল্লেখ ছিল।
The Daily Star-এর লেখায় বলা হয়েছে, বইটি আটকাতে পুলিশ সম্ভাব্য বইয়ের দোকান ও ছাপাখানায় তল্লাশি চালায়। হুগলিতে নজরুলের বাড়িতেও তল্লাশির কথা ওই লেখায় রয়েছে। একই লেখায় নজরুলের বন্ধু মুজফ্ফর আহমদের স্মৃতিকথার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার পরও তরুণেরা বইটি সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। কিছু বই বাঁধাইকারীর মাধ্যমে গোপনে বিক্রি করা হতো বলেও স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
বিষের বাঁশীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে বলে The Daily Star-এর গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ রয়েছে। একই লেখায় বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগের একটি নথিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছিল। পরে ১৯৪৫ সালে সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে।
তবে এই অনুসন্ধানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মূল সরকারি আদেশ বা গেজেটের কপি সরাসরি পাওয়া যায়নি। তাই ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের তারিখটি প্রকাশিত গবেষণামূলক সূত্রের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হলো।
তথ্যসূত্র
১. ‘Looking Back on Kazi Nazrul Islam’s Bisher Banshi’ — The Daily Star
২. ‘নিষিদ্ধের শতবর্ষ’ — প্রথম আলো
৩. ‘ইসলাম, কাজী নজরুল’ — বাংলাপিডিয়া
৪. ‘নজরুলের প্রথম বাজেয়াপ্ত গ্রন্থ’–সংক্রান্ত তথ্য — শিক্ষক বাতায়ন





