তথ্যের অধিকার নিয়ে নাগরিকদের সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও আইনটি ব্যবহারে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত বলে মনে করেন ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ নাগরিক। এর পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের সঙ্গে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয় যুক্ত করা উচিত কি না, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা হয়েছে।
২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত তথ্য অধিকার সম্মেলনে এসব বিষয় উঠে আসে। আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সম্মেলনের আয়োজন করে তথ্য অধিকার ফোরাম।
জরিপে তথ্য পাওয়ার ঘাটতির চিত্র
সম্মেলনে ‘বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬’–এর ফলাফল উপস্থাপন করেন জরিপের প্রধান গবেষক ড. অনন্য রায়হান। জরিপে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্যের প্রয়োজন, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতা এবং আইনটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ নাগরিক।
তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর আবেদন গ্রহণের স্বীকৃতি পাওয়ার হারও কমেছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশে। তথ্য পাওয়ার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এবং আইনগত সময়সীমা সম্পর্কে নাগরিকদের জ্ঞানেও ঘাটতি দেখা গেছে। ড. অনন্য রায়হানের মতে, এসব ঘাটতি কাটাতে স্বাধীন ও কার্যকর তথ্য কমিশন প্রয়োজন।
তথ্যের অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ
তথ্য অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম তথ্যের অধিকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যে তথ্য চাওয়ার সংস্কৃতি শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য—যেমন দুর্নীতি, অর্থের ব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও সরকারি কার্যক্রম—নাগরিকের জানার সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি গুরুত্ব দেন। তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে ভয়ও একটি বড় বাধা বলে আলোচনায় উঠে আসে।
তথ্য চাইতেও ভয়
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ভয় ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক মানুষ তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করেন না। দরিদ্র, প্রান্তিক ও ক্ষমতাহীন মানুষের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। তথ্য অধিকার কার্যকর করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্য কমিশনকে কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন।
অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন
সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোর একটি ছিল অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য নিয়ন্ত্রণের আইন নিয়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের সঙ্গে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ দুটি আলাদা বিষয়। তিনি বলেন, অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকলে তার জন্য আলাদা আইন করা যেতে পারে। তবে অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের নামে তথ্য পাওয়ার অধিকার সীমিত করা উচিত নয়।
অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে দুটি বিষয় আলাদা রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—একদিকে নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার, অন্যদিকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলার আইনি কাঠামো। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে। অপতথ্য মোকাবিলার আইন করতে গিয়ে সেই আইনের সংজ্ঞা, প্রয়োগ ও শাস্তির কাঠামো যেন বৈধ তথ্যপ্রবাহ বা নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারকে সীমিত না করে।
তথ্য কমিশনের কার্যকারিতা
তথ্য কমিশনের কার্যকারিতাও সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকায় নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হয়েছে। নতুন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন। তাঁর মতে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এমন কমিশনই মানুষের আস্থা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে তথ্য কমিশনের সচিব মো. শাহ আলম বলেন, তথ্য অধিকার ব্যবস্থায় চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের তথ্য চাইতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সরবরাহের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। তিনি জানান, তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের জন্য সার্চ কমিটি কাজ করছে।
তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের প্রশ্ন
সম্মেলনে তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও পৃথক আলোচনা হয়। সাবেক তথ্য কমিশনার নেপাল চন্দ্র সরকার, ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং হামিদুল ইসলাম হিল্লোল এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনার কেন্দ্র ছিল বর্তমান আইনের কার্যকারিতা, তথ্য পাওয়ার বাস্তব বাধা এবং আইনকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা।
তবে তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের সঙ্গে অপতথ্য নিয়ন্ত্রণকে একীভূত করার প্রশ্নটি আলাদা করে দেখা হয়েছে। এ জায়গাতেই ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ
তথ্য পাওয়ার জন্য প্রতিবার নাগরিককে আবেদন করতে হবে—এমন ব্যবস্থার বাইরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বপ্রণোদিতভাবে তথ্য প্রকাশ নিয়েও আলোচনা হয়। ই-গভর্ন্যান্স এবং proactive disclosure–এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট সেশনে। এ আলোচনায় ড. সাদিয়া শারমিন ও ক্যাথারিনা কোনিগসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য ও জবাবদিহি
তথ্য অধিকার শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিষয় নয়। স্থানীয় সরকার ও নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। সম্মেলনের সংশ্লিষ্ট আলোচনায় এ. কে. এম. আজিজুল হক, রফিকুল ইসলাম খোকন ও রুহী নাজ অংশ নেন। এ পর্যায়ে স্থানীয় সরকার, এনজিও কার্যক্রম এবং নাগরিক পর্যায়ে তথ্য ও জবাবদিহির বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
তথ্যের অধিকার বনাম অপতথ্য
পুরো আলোচনায় দুটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে। একটি হলো নাগরিকের সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার। অন্যটি হলো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অপতথ্য মোকাবিলা। আলোচকদের বক্তব্যে বিশেষ করে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো—দুটি সমস্যার সমাধান একই আইনি কাঠামোর মধ্যে করতে গেলে তথ্য পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তাই অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা আইনি কাঠামোর ধারণা আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে সেই আইনের প্রয়োগ যেন বৈধ তথ্যপ্রবাহ ও নাগরিকের জানার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার ১৭ বছর পরও নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অভিজ্ঞতায় ঘাটতি রয়ে গেছে। একই সময়ে অপতথ্য মোকাবিলার প্রশ্নও সামনে এসেছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে, সেটিই এখন আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো — তথ্য কমিশন গঠন নিয়ে বাংলাদেশ একটি বিব্রতকর বিশ্বরেকর্ডের মুখোমুখি: ইফতেখারুজ্জামান
- জাগো নিউজ — অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইনের বক্তব্য
- বাংলা ট্রিবিউন — তথ্য কমিশন ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য
- সমকাল — তথ্য অধিকার আইনে সচেতনতা বাড়লেও প্রয়োগে ভীতি ও ঘাটতি
- সংবাদ — অপতথ্য রোধে নতুন আইনের প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের
- স্টার নিউজ — তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের সঙ্গে অপতথ্য প্রতিরোধকে গুলিয়ে ফেলার প্রশ্ন





