বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে তাঁর নিয়োগের পাশাপাশি দুই সাংবাদিককে তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানানো হয়।
তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাংবাদিক এস এ এম মাহফুজুর রহমান ও খান মোহাম্মদ আবুল হোসেন। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ১৫(১) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ দিয়েছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত পরিচয়
নাহরিন ইসলাম খান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে জার্মানির ফিলিপস ইউনিভার্সিটি অব মারবুর্গ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। জার্মানির ফ্রেইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশনীতি ও পরিবেশগত বিরোধ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ন্যাচারাল রিসোর্সেস অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস (বোকু) থেকে জেন্ডার স্টাডিজে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক। সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশনেও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সংবাদমাধ্যমে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে দেখা গেছে।
দুই সাংবাদিক হলেন তথ্য কমিশনার
নতুন তথ্য কমিশনার এস এ এম মাহফুজুর রহমান ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের (ইউএনবি) সাবেক সম্পাদক। অন্যদিকে খান মোহাম্মদ আবুল হোসেন দৈনিক দিনকালের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে।
একই দিনে প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই তথ্য কমিশনার নিয়োগের ফলে কমিশনের নেতৃত্ব পুনর্গঠিত হলো। তবে কমিশনের নিয়মিত কার্যক্রম, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন নেতৃত্বহীন ছিল তথ্য কমিশন
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তথ্য কমিশনের নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেককে সরিয়ে দেওয়ার পর পদটি শূন্য ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হলো।
প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশনে তখন প্রায় ৮৫০টি অভিযোগ জমা ছিল। কমিশনার না থাকায় সেগুলোর নিষ্পত্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই সংখ্যা ২৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনভিত্তিক।
তথ্য কমিশনের দায়িত্ব ও নাগরিকের অধিকার
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিককে আইনটির আওতাভুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়ার অধিকার দেয়। নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পাওয়া, আবেদন প্রত্যাখ্যান বা আইন অনুযায়ী তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়লে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আপিল ও তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।
আইনের ১৩ ও ২৫ ধারায় কমিশনের ক্ষমতা এবং অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। আইনের বিস্তারিত পাওয়া যাবে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর সরকারি পাঠে।
তথ্য কমিশনের কার্যকারিতা শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা, তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং নাগরিকের জানার অধিকার বাস্তবায়নেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে।
নতুন কমিশনের সামনে অগ্রাধিকার
দীর্ঘ বিরতির পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন কমিশনের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে:
- জমে থাকা অভিযোগের হালনাগাদ সংখ্যা প্রকাশ এবং নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ।
- অভিযোগ গ্রহণ, শুনানি ও নিষ্পত্তির নিয়মিত কার্যক্রম চালু করা।
- তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
- কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ।
- নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সাধারণ নাগরিকের তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নাহরিন ইসলাম খানের নিয়োগ প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। তবে এই নিয়োগের বাস্তব তাৎপর্য নির্ভর করবে কমিশনের কার্যক্রম কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, অভিযোগের নিষ্পত্তি কতটা কার্যকর হয় এবং নাগরিকেরা তথ্য পাওয়ার অধিকার কতটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন, তার ওপর।
তথ্যসূত্র
১. প্রথম আলো — দুই বছর পর প্রধান তথ্য কমিশনার, দুই কমিশনার পেল তথ্য কমিশন।
২. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — প্রথম নারী প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক নাহরিন।
৪. দ্য ডেইলি স্টার — Bangladesh gets first woman chief information commissioner।
৫. বাংলাদেশের সরকারি আইনভান্ডার — তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯।
৬. তথ্য কমিশন বাংলাদেশ — সরকারি ওয়েবসাইট।





