প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ ১২ দফা সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের কারণে গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও জব্দের আগে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। রোববার (১৮ অক্টোবর) সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব সুপারিশ জানানো হয়।
সুপারিশগুলো তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর জন্য প্রধান তথ্য কর্মকর্তার দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকতার জন্য আইনি সুরক্ষা
সম্পাদক পরিষদ বলেছে, জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামতকে শুধু সমালোচনামূলক হওয়ার কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত এবং ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও জব্দের আগে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন বা পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে। পেশাগত সাংবাদিকতার কারণে কোনো অভিযোগকে অজামিনযোগ্য করা যাবে না বলেও সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ।
অস্পষ্ট অপরাধের সংজ্ঞা বাদ দেওয়ার দাবি
ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের পৃথক সংজ্ঞা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যকে শুধু এ কারণে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। মানহানি, হেয় করা, বুলিং, যৌন হয়রানি ও যৌন নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইল বা সেক্সটর্শনের মতো বিষয়েও স্পষ্ট সংজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশের ক্ষতি ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছতা
সংবাদ, পোস্ট, ভিডিও বা অন্য কোনো ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণ কিংবা ব্লক করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। লিখিত কারণ জানাতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বা আদালতে আপিলের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন বা পর্যালোচনা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
অনলাইন মানহানিকে নতুন বা অধিকতর কঠোর সাইবার অপরাধে পরিণত না করে এ ধরনের অভিযোগ বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগে মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিচার না করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদমাধ্যম ও তথ্যসূত্রের সুরক্ষা
একটি প্রতিবেদনের কারণে পুরো সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিল বা কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না বলে সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের পরিচয় গোপন রাখার আইনি সুরক্ষাও চাওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রেস কাউন্সিলের প্রক্রিয়া কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকেও প্রেস কাউন্সিলের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে গণমাধ্যম, আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি এবং কাউন্সিলের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সম্পাদক পরিষদের মতে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইনটির প্রয়োগে স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি এবং বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
তথ্যসূত্র:
১. দ্য ডেইলি স্টার: সাংবাদিক গ্রেপ্তারে বিচারিক অনুমোদন চায় সম্পাদক পরিষদ
২. দৈনিক সংবাদ: সাইবার আইনে সাংবাদিকতার সুরক্ষায় ১২ দফা সুপারিশ





