সাংবাদিকদের পেশাগত সততা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। দুই সংগঠনই তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে পৃথক বিবৃতিতে তারা এ দাবি জানায়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠন দুটি।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে গোপনে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে আইজিপি বলেছেন, মাদকের টাকা না পেলে সাংবাদিকদের একাংশ পুলিশকে ‘অকার্যকর’ উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করেন। তাঁর এ বক্তব্যকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী ও পেশাগত মর্যাদার জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সাংবাদিক সংগঠনগুলো।
ডিআরইউর প্রতিবাদ ও দাবি
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এক যৌথ বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে এমন ঢালাও মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের বক্তব্য স্বাধীন সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডিআরইউ নেতারা বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কাছে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা উচিত। প্রমাণ ছাড়া সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।
তাঁরা আইজিপিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন।
ক্র্যাবের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম
আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। সংগঠনটির সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল ও সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ্ এক যৌথ বিবৃতিতে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। বিবৃতিটি সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক ইসমাঈল হুসাইন ইমুর স্বাক্ষরে প্রকাশ করা হয়।
ক্র্যাবের নেতারা বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বলেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সাংবাদিকদের সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
ক্র্যাবের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় প্রকাশ করা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব। পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনামূলক সংবাদকে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে টাকা না পাওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিত্রিত করলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ক্র্যাবও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
যে বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
সোমবার সকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। সেখানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাদক, এগুলোর বিরুদ্ধে আপনারা মুভ করতেছেন না। সেখান থেকে গোপনে টাকা নিতেছেন। সাংবাদিক সাহেবরা ওখান থেকে যখন পয়সা না পাইতেছেন, তখন লিখতেছেন পুলিশ এই দেশে অকার্যকর হয়ে গেছে।’
মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সাংবাদিকদের একাংশ অর্থ নেন—এমন অভিযোগের পক্ষে অনুষ্ঠানে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সাংবাদিকের নাম বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ নেই।
একই অনুষ্ঠানে আইজিপি দাবি করেন, বিগত সরকারের আমলে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছিল। তৎকালীন সরকারি দলের কিছু নেতা মাদক ব্যবসা থেকে মাসোহারা পেতেন এবং পুলিশের কিছু সদস্যও এতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর কথাও জানান আইজিপি। এসব বক্তব্য তাঁর দাবি হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সাংবাদিকদের নিয়ে বক্তব্যে পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা
আইজিপির বক্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশ সদর দপ্তরও ব্যাখ্যা দেয়। ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত ব্যাখ্যায় বলা হয়, সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যটি অসাবধানতাবশত হয়েছে। সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও নেতিবাচক মন্তব্য করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।
একই অনুষ্ঠানে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির মন্তব্যেরও ব্যাখ্যা দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের দাবি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার কথা বোঝাতে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেননি; বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন।
অভিযোগ থাকলে তদন্তের দাবি
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ এবং পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ—দুটি বিষয়ই পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর বক্তব্যে উঠে এসেছে। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। একইভাবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও তথ্য-প্রমাণ ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন—ডিআরইউর দাবি, ইউএনবি—ক্র্যাবের প্রতিবাদ, কালবেলা—আইজিপির বক্তব্য, ঢাকা ট্রিবিউন—পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা।





