October 29, 2026 3:20 pm
October 29, 2026 3:20 pm

কাজিম রেজাকে স্মরণ: সাংবাদিকতা, আন্দোলন ও জীবনসংগ্রাম

কাজিম রেজাকে স্মরণ: সাংবাদিকতা, আন্দোলন ও জীবনসংগ্রাম

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় কাজিম রেজার পথচলা ছিল দীর্ঘ। সংবাদকক্ষ ছিল তাঁর কর্মজীবনের প্রধান ঠিকানা। কিন্তু সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা ছিল না। সাংবাদিকের অধিকার, সত্য প্রকাশ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রশ্নেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল কঠিন।

সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শেষ কর্মস্থল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) থেকে তাঁকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটে ছিলেন। গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদনও করতে হয়েছিল।

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই আবেদন পরিণত হয় শোকবার্তায়।

ফিলিপস পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ গোলাম বতুল কাজিম রেজা ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথ

কাজিম রেজা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের সংবাদপেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কর্মস্থলগুলোর মধ্যে ছিল দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক দেশ, সাপ্তাহিক রোববার এবং দৈনিক জনকণ্ঠ। বিভিন্ন সময়ে তিনি প্রতিবেদন লেখা ও সম্পাদনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

একাধিক সূত্রে তাঁকে দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক দেশ এবং সাপ্তাহিক রোববারের প্রধান প্রতিবেদক বা চিফ রিপোর্টার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা বাসসের সঙ্গে যুক্ত হন। বাসসই ছিল তাঁর শেষ কর্মস্থল।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের তিনি ছিলেন সিনিয়র সদস্য। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি সম্মানজনক ফিলিপস পুরস্কারও পান।

সাংবাদিকদের অধিকার আন্দোলনে

কাজিম রেজার পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাংবাদিক ইউনিয়নের আন্দোলন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সংগঠন দুটির যৌথ শোকবার্তায় বলা হয়, তিনি সারাজীবন গণতন্ত্র, সত্য প্রকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে লড়াই করেছেন। পেশাগত জীবনে অন্যায় ও মিথ্যার সঙ্গে আপস করেননি বলেও শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়।

সাংবাদিক নেতাদের ভাষায়, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন “আপসহীন কাণ্ডারি”।

অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া

সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তিনি শুধু নিজের কর্মজীবনে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানবাধিকারবিষয়ক সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়। ডানিডার মানবাধিকার প্রকল্পের আওতায় একাধিক কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কোর্সে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। আর এভাবে পেশাগত অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

চাকরি হারানোর পর

কাজিম রেজার জীবনের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ সম্ভবত তাঁর কর্মহীনতা। বিএফইউজে ও ডিইউজের যৌথ শোকবার্তায় অভিযোগ করা হয়েছে, “ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে” তাঁর শেষ কর্মস্থল বাসস থেকে তাঁকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর তিনি দীর্ঘ সময় বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটে ছিলেন বলে সাংবাদিক নেতারা উল্লেখ করেন। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মহীনতার পর তাঁর জীবনের শেষ সময় ছিল অর্থনৈতিকভাবে কঠিন।

জীবনের শেষ লড়াই

আগস্টের শেষ সপ্তাহে কাজিম রেজার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন প্রকাশিত হয়। তখন তিনি কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। মগবাজারের একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। ২৯ আগস্ট প্রকাশিত একটি সংবাদে তাঁর চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চাওয়া হয়। কিন্তু সেই আহ্বানের মাত্র কয়েক দিন পর, ২ সেপ্টেম্বর, তিনি মারা যান।

একজন প্রবীণ সাংবাদিকের জীবনের শেষ দিনগুলোর এই বাস্তবতা বাংলাদেশের সংবাদপেশার জন্যও একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়। দীর্ঘদিন কাজ করার পর একজন সাংবাদিকের পেশাগত নিরাপত্তা কোথায়? কর্মহীন হলে তাঁর সামাজিক সুরক্ষা কী? এবং গুরুতর অসুস্থতার সময়ে চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে?

জন্ম ও পরিবার

সৈয়দ গোলাম বতুল কাজিম রেজার পৈতৃক বাড়ি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ মুসা কাজিম নুরী। মা ছিলেন চাঁদপুরের প্রথম নারী শিক্ষিকা হিসেবে পরিচিত সৈয়দা সাইয়েদা বানু। মৃত্যুকালে তিনি দুই কন্যাসন্তান রেখে গেছেন বলে তাঁর পরিবারের বরাত দিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

তাঁর স্ত্রী সুফিয়া বেগমও সাংবাদিকতা ও সরকারি তথ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার পর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং পরে তথ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে অবসর নেন। কাজিম রেজার মৃত্যুর মাত্র এক মাসেরও কম আগে সুফিয়া বেগম মারা যান। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিবারটি হারায় দুই অভিভাবককে।

শেষ বিদায়

২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাজিম রেজার মৃত্যু হয়। সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাজধানীর বাসাবোর কদমতলায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর পাশে তাঁর শেষ ঠিকানা হয়।

যে প্রশ্ন রেখে গেলেন

কাজিম রেজার জীবনকে শুধু একজন প্রবীণ সাংবাদিকের মৃত্যু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবনে সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল। ছিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজের ইতিহাস। ছিল সাংবাদিক ইউনিয়নের আন্দোলন। ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সত্য প্রকাশের পক্ষে অবস্থান।

কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসেছে কর্মহীনতা, আর্থিক সংকট এবং চিকিৎসার জন্য সহায়তার আবেদন। এই বৈপরীত্যই তাঁর জীবনকে আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। যে মানুষটি সারাজীবন সংবাদপেশায় ছিলেন, সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে তিনিই আর্থিক সংকটে চিকিৎসার জন্য সহায়তা চেয়েছেন।

কাজিম রেজা আর নেই।

কিন্তু তাঁর জীবন সাংবাদিক সমাজের সামনে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন রেখে গেছে। সাংবাদিকের স্বাধীনতা কি শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতা? নাকি এর সঙ্গে যুক্ত পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদাও? একজন সাংবাদিক চাকরি হারালে তাঁর অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আর দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে একজন সাংবাদিকের সামাজিক নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাও হয়তো কাজিম রেজাকে স্মরণ করার একটি অর্থবহ উপায়।

FoEBD গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক, সাংবাদিক ইউনিয়নকর্মী এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ কাজিম রেজাকে স্মরণ করছে।

তথ্যসূত্র


সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যের প্রতিবাদ, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম
সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান

সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যের প্রতিবাদ, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

সাংবাদিকদের পেশাগত সততা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন

বিস্তারিত »
ব্রিটেনে মিডিয়া এক্সিলেন্স সম্মাননা পেলেন আ স ম মাসুম
মিডিয়া ও গণমাধ্যম

ব্রিটেনে মিডিয়া এক্সিলেন্স সম্মাননা পেলেন আ স ম মাসুম

ব্রিটিশ বাংলাদেশি গণমাধ্যমে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মিডিয়া এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন সাংবাদিক আ স ম মাসুম। ২৫ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে আয়োজিত চতুর্থ ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাওয়ার্ড

বিস্তারিত »
পাবনার সাংবাদিকতায় স্মরণীয় নাম আব্দুল জব্বার
স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

পাবনার সাংবাদিকতায় স্মরণীয় নাম আব্দুল জব্বার

সাংবাদিকতা, কলাম লেখা ও বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল জব্বার। সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের নানা

বিস্তারিত »
গণমাধ্যম সংস্কারে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
মিডিয়া ও গণমাধ্যম

গণমাধ্যম সংস্কারে পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তনের দাবি

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। তাঁরা বলেছেন, বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে গণমাধ্যমের দীর্ঘদিনের সংকট দূর হবে

বিস্তারিত »
‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ

১৯২৪ সালের অক্টোবর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। বইটির সব কপি জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের অভিযোগ

বিস্তারিত »
রথো রাফি: সাংবাদিকতা, কবিতা ও অনুবাদে স্বতন্ত্র এক কণ্ঠ
স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

রথো রাফি: সাংবাদিকতা, কবিতা ও অনুবাদে স্বতন্ত্র এক কণ্ঠ

কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি বাংলা কবিতায় নিজস্ব কণ্ঠ তৈরি করেছিলেন। কবিতার পাশাপাশি বিশ্বকবিতার অনুবাদ এবং সাংবাদিকতায়ও রেখেছেন অবদান। দীর্ঘ দুই দশকের কবিতাচর্চা, ছোটকাগজের

বিস্তারিত »