October 29, 2026 2:31 pm
October 29, 2026 2:31 pm

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

অ্যাডভোকেট মানিক আকবর,
আইনজীবী ও সাংবাদিক।

ভূমিকা: বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এর সাংবিধানিক ভিত্তি হলো অনুচ্ছেদ ৩৯। এই অনুচ্ছেদ একদিকে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়; অন্যদিকে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। তবে এসব স্বাধীনতার ওপর আইনের মাধ্যমে কিছু যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপের সুযোগও সংবিধানে রাখা হয়েছে।

১. অনুচ্ছেদ ৩৯-এ কী বলা হয়েছে

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের শিরোনাম “চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা”।

অনুচ্ছেদ ৩৯(১)-এ বলা হয়েছে:

“চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।”

অনুচ্ছেদ ৩৯(২)-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে অথবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনার ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে—

(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার; এবং

(খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা

নিশ্চিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বাধীনতার নিশ্চয়তার পাশাপাশি সেই স্বাধীনতার সাংবিধানিক সীমারেখাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

২. ৩৯(১): চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা

৩৯(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।

এটি ৩৯(২)-এর বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা থেকে আলাদা করে পড়তে হয়। কারণ একজন ব্যক্তি কী চিন্তা করবেন বা কী মত ধারণ করবেন—এটি তার অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে সেই চিন্তা, মত বা ধারণা প্রকাশ করার বিষয়টি ৩৯(২)-এর অধীনে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত।

সংবিধানের কাঠামো তাই মত ধারণ করা এবং মত প্রকাশ করা—এই দুই বিষয়কে একই অনুচ্ছেদের মধ্যে রাখলেও তাদের সাংবিধানিক অবস্থান আলাদা করে দেখেছে।

৩. ৩৯(২): বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা

৩৯(২)(ক) অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।

“ভাবপ্রকাশ” শুধু মৌখিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম বা ধরন ভিন্ন হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের Article 19-এর ব্যাখ্যাতেও মতপ্রকাশের মধ্যে মৌখিক, লিখিত, মুদ্রিত, শিল্পের মাধ্যমে এবং অন্যান্য মাধ্যমের যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সুতরাং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু কথা বলার বিষয় নয়; তথ্য, ধারণা ও মত প্রকাশের বিভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।

৪. সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা

৩৯(২)(খ)-এ আলাদাভাবে “সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা” নিশ্চিত করা হয়েছে।

এর ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার একটি সরাসরি সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টও ৩৯ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে এই সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে একই সঙ্গে বলা হয়েছে যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ৩৯(২)-এ নির্ধারিত সীমাবদ্ধতার অধীন।

সুতরাং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সাংবিধানিক অধিকার হলেও তা সীমাহীন নয়।

৫. স্বাধীনতা কি পরম?

না।

৩৯(২)-এর ভাষা অনুযায়ী বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা “যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে” নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে যেকোনো কারণে মতপ্রকাশের ওপর বাধা দেওয়া যায়—সংবিধান এমন কথা বলে না। বাধানিষেধের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাংবিধানিক শর্ত রয়েছে:

প্রথমত, বাধানিষেধটি আইনের দ্বারা আরোপিত হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সেটি ৩৯(২)-এ উল্লেখ করা নির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ বা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে।

তৃতীয়ত, বাধানিষেধটি যুক্তিসঙ্গত হতে হবে।

সংবিধানে উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলো হলো:

১. রাষ্ট্রের নিরাপত্তা;

২. বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক;

৩. জনশৃঙ্খলা;

৪. শালীনতা বা নৈতিকতা;

৫. আদালত-অবমাননা;

৬. মানহানি;

৭. অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা।

অতএব, ৩৯ অনুচ্ছেদের কাঠামোতে স্বাধীনতা এবং তার ওপর বৈধ সীমাবদ্ধতা—দুটিই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

৬. “আইনের দ্বারা” বাধানিষেধ—এর অর্থ কী?

৩৯(২)-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “আইনের দ্বারা”।

অর্থাৎ শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ, মৌখিক আদেশ বা নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের The State v. Swadesh Roy and another, Contempt Petition No. 19 of 2015 মামলার রায়ে আদালত বলেছে, মতপ্রকাশ ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের পেছনে আইনের কর্তৃত্ব থাকতে হবে। আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, আইনি ভিত্তি ছাড়া নির্বাহী আদেশ বা প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা যায় না।

একই রায়ে আদালত আরও বলেছে, সংশ্লিষ্ট আইনকে সংবিধানের ৩৯(২)-এ উল্লেখিত সীমাবদ্ধতার অন্তত একটি ক্ষেত্রের মধ্যে পড়তে হবে। বিধিনিষেধটি যুক্তিসঙ্গত হতে হবে; অর্থাৎ তা অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া যাবে না। বিধিনিষেধ আরোপের পদ্ধতি ও প্রয়োগও ন্যায়সঙ্গত, সুবিচারসম্মত এবং যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। আদালত আরও উল্লেখ করেছে, এ ধরনের বিধিনিষেধের বৈধতা বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত।

৭. “যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ” বলতে কী বোঝায়?

“যুক্তিসঙ্গত” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। ৩৯(২)-এ কোনো বিধিনিষেধের কথা থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তিসঙ্গত হয়ে যায় না। বিধিনিষেধের মাত্রা, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং তার প্রভাবও বিবেচনার বিষয়।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের The State v. Swadesh Roy and another, Contempt Petition No. 19 of 2015 মামলার রায়ে আদালত বলেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ reasonable হতে হবে। আদালতের ভাষায়, বিধিনিষেধ অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ (excessive or disproportionate) হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে বিধিনিষেধ আরোপের পদ্ধতি ও প্রয়োগ ন্যায়সঙ্গত, সুবিচারসম্মত এবং যুক্তিসঙ্গত হতে হবে।

আদালত আরও বলেছে, কোনো বিধিনিষেধ এই শর্তগুলো পূরণ করে কি না, তার বৈধতা বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত। অর্থাৎ ৩৯(২)-এ উল্লিখিত কোনো একটি কারণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে—এটুকুই যথেষ্ট নয়; বিধিনিষেধটি যুক্তিসঙ্গত, অতিরিক্ত নয় এবং তার প্রয়োগের পদ্ধতিও ন্যায়সঙ্গত কি না, সেটিও আদালত পরীক্ষা করতে পারে।

৮. আদালত-অবমাননা ও মতপ্রকাশ

৩৯(২)-এ আদালত-অবমাননা (contempt of court)-কে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরোপযোগ্য সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের State v. Swadesh Roy and another, Contempt Petition No. 19 of 2015  মামলার রায়ে আদালত ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আদালত-অবমাননার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। আদালত উল্লেখ করেছে, কোনো মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এমন কোনো প্রকাশনা যদি বিচারপ্রক্রিয়ায় বাস্তব ও গুরুতরভাবে হস্তক্ষেপ করে এবং মামলার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনমনে পক্ষপাত সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তা আদালত-অবমাননার পর্যায়ে পড়তে পারে।

একই রায়ে আদালত আদালত ও বিচারকদের সমালোচনার বিষয়টিও আলোচনা করেছে। আদালত বলেছে, সমালোচনা ন্যায্য (fair) হওয়া উচিত এবং তা বিচারব্যবস্থাকে হেয় করা বা বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে করা হলে আদালত-অবমাননার প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—আদালতের সমালোচনা এবং আদালত-অবমাননা একই বিষয় নয়। কোনো বক্তব্য বা প্রকাশনা আদালত-অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না, তা বক্তব্যের ধরন, প্রেক্ষাপট, তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রযোজ্য আইনি নীতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হয়।

The State v. Swadesh Roy and another মামলাটি মূলত আদালত-অবমাননা সংক্রান্ত। মামলাটিতে Article 39-এর আলোচনা এসেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আদালত-অবমাননার সাংবিধানিক সীমার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার প্রেক্ষাপটে।

৯. মানহানি ও মতপ্রকাশ

৩৯(২)-এ মানহানিকে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরোপযোগ্য সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্য ব্যক্তির সুনাম রক্ষার আইনি সুরক্ষার মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে, প্রযোজ্য আইন ও সাংবিধানিক শর্ত বিবেচনা করতে হয়।

তবে কোনো বক্তব্য কারও জন্য অস্বস্তিকর, কঠোর বা সমালোচনামূলক হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানহানি হয়ে যায় না। কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য বা প্রকাশনা মানহানির আইনি উপাদান পূরণ করে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন, বক্তব্যের প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট এবং মামলার নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হয়।

এ কারণে ৩৯(২)-এ মানহানির উল্লেখকে এমনভাবে পড়া উচিত নয় যে সমালোচনামূলক বক্তব্যের ওপর যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধই সাংবিধানিকভাবে বৈধ। বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে আইনের ভিত্তি এবং যুক্তিসঙ্গততার শর্তও প্রযোজ্য।

১০. অপরাধে প্ররোচনা

৩৯(২)-এ “অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা”-কেও একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও সংবিধানের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে কোনো মত বা বক্তব্য অপছন্দনীয় হওয়ার বিষয় এবং কোনো অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা দেওয়ার বিষয় এক নয়।

কোনো বক্তব্য এই সাংবিধানিক সীমার মধ্যে পড়ে কি না, তা নির্ধারণের জন্য বক্তব্যের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং প্রযোজ্য আইনের বিধান বিবেচনা করতে হয়।

১১. ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং মৌলিক অধিকার কাঠামো

৩৯ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে—মৌলিক অধিকার অংশে রয়েছে। এ কারণে এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ার পরিবর্তে মৌলিক অধিকারের সামগ্রিক কাঠামোর সঙ্গে পড়া প্রয়োজন।

[অনুচ্ছেদ ২৬ — মৌলিক অধিকারের সহিত অসামঞ্জস্য আইন বাতিল] অনুযায়ী, তৃতীয় ভাগের বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো প্রচলিত আইন সেই অসামঞ্জস্যের পরিমাণে বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ২৬(২)-এ রাষ্ট্রকে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন না করার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে [অনুচ্ছেদ ৪৪(১) — মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ] অনুযায়ী, তৃতীয় ভাগে দেওয়া অধিকারসমূহ বলবৎ করার জন্য সংবিধানের [অনুচ্ছেদ ১০২(১) — হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশ ও আদেশ প্রদানের ক্ষমতা] অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ ৩৯ অনুচ্ছেদ শুধু একটি ঘোষণামূলক অধিকার নয়; এটি মৌলিক অধিকার বলবৎ করার সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ।

১২. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান দলিল হলো International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)। বাংলাদেশ ৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ তারিখে ICCPR-এ accession করে।

ICCPR-এর Article 19 অনুযায়ী প্রত্যেকের মতামত ধারণের অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। এটি মৌখিক, লিখিত বা মুদ্রিত বক্তব্য, শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ এবং ব্যক্তির পছন্দের অন্যান্য মাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

Article 19(3) অবশ্য এই স্বাধীনতার ওপর কিছু সীমাবদ্ধতার সুযোগ রাখে। তবে সেই সীমাবদ্ধতা অবশ্যই—

  • আইনে নির্ধারিত হতে হবে;
  • অন্যের অধিকার বা সুনামের প্রতি সম্মান রক্ষার জন্য অথবা
  • জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা নৈতিকতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় হতে হবে।

১৩. ICCPR Article 19 এবং বাংলাদেশের ৩৯ অনুচ্ছেদ: একটি তুলনা

দুটি বিধানের মধ্যে মিল রয়েছে, তবে ভাষা ও কাঠামো এক নয়।

বিষয় বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৯ ICCPR, Article 19
মতামত ধারণ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা মতামত ধারণের অধিকার
মতপ্রকাশ বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা
সংবাদমাধ্যম সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা সরাসরি উল্লেখিত Article 19-এর অধীনে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতা সুরক্ষিত
সীমাবদ্ধতা আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আইনে নির্ধারিত ও প্রয়োজনীয় সীমাবদ্ধতা
সীমাবদ্ধতার ভিত্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা/নৈতিকতা, আদালত-অবমাননা, মানহানি, অপরাধে প্ররোচনা অন্যের অধিকার/সুনাম, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা নৈতিকতা

১৪. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে “প্রয়োজনীয়তা” ও “সমানুপাতিকতা”

জাতিসংঘের Human Rights Committee-এর General Comment No. 34 Article 19-এর ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নথি। এতে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের ওপর কোনো বিধিনিষেধ শুধু আইনে লেখা থাকলেই যথেষ্ট নয়। বিধিনিষেধকে Article 19(3)-এর নির্ধারিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে এবং necessity বা প্রয়োজনীয়তার কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। Committee আরও ব্যাখ্যা করেছে যে বিধিনিষেধ অতিরিক্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট সুরক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার proportionality বা সমানুপাতিকতা থাকতে হবে।

এই আন্তর্জাতিক ব্যাখ্যা ৩৯ অনুচ্ছেদের “যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ” ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক তুলনামূলক কাঠামো প্রদান করে।

১৫. সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ৩৯ অনুচ্ছেদের গুরুত্ব

সাংবাদিকতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া—এসব কাজ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

জাতিসংঘের Human Rights Committee-এর General Comment No. 34-এও journalism-কে Article 19-এর সুরক্ষিত মতপ্রকাশের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রযোজ্য আইন, আদালত-অবমাননা, মানহানি এবং অন্যান্য বৈধ সীমাবদ্ধতার প্রশ্নও থাকতে পারে।

তাই কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের নির্দিষ্ট ঘটনায় ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য কি না নির্ধারণের সময় শুধু “সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল” এই তথ্য যথেষ্ট নয়। প্রকাশনার বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট আইন এবং আরোপিত পদক্ষেপের প্রকৃতিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

১৬. অনলাইন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ৩৯ অনুচ্ছেদ

বর্তমানে মতপ্রকাশ শুধু সংবাদপত্র, রেডিও বা টেলিভিশনের মাধ্যমে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষ তথ্য ও মতামত প্রকাশ করে। ICCPR-এর Article 19-এর ব্যাখ্যায় মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে “any other media” অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। General Comment No. 34-ও বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ ও প্রচারের মাধ্যমকে Article 19-এর পরিধির মধ্যে বিবেচনা করে।

তাই ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের ক্ষেত্রেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈধ সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন একই মানবাধিকার কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট অনলাইন বক্তব্য আইনসঙ্গত কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রযোজ্য আইন এবং বক্তব্যের নির্দিষ্ট তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

১৭. ৩৯ অনুচ্ছেদ বুঝতে কয়েকটি মূল প্রশ্ন

কোনো মতপ্রকাশ বা সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রাসঙ্গিক কি না বিশ্লেষণের সময় অন্তত কয়েকটি প্রশ্ন করা যায়:

১. কী ধরনের মতপ্রকাশ ঘটেছে? 
বক্তব্য, সংবাদ, মতামত, শিল্প, লেখা, অনলাইন পোস্ট বা অন্য কোনো মাধ্যম?

২. কার মতপ্রকাশের অধিকার প্রশ্নে এসেছে?
৩৯(২)(ক)-এ “প্রত্যেক নাগরিকের” বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে এবং ৩৯(২)(খ)-এ সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

৩. কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে কি?
গ্রেপ্তার, মামলা, প্রকাশনা বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অপসারণ, সেন্সরশিপ বা অন্য কোনো ব্যবস্থা?

৪. বিধিনিষেধের আইনি ভিত্তি কী?

৫. বিধিনিষেধটি ৩৯(২)-এ উল্লেখিত কোনো ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না?

৬. বিধিনিষেধটি যুক্তিসঙ্গত কি না?

৭. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ও সমানুপাতিকতার পরীক্ষার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?

এই প্রশ্নগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার আইনগত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিকল্প নয়। এগুলো একটি প্রাথমিক সাংবিধানিক বিশ্লেষণের কাঠামো।

১৮. মূল বিষয়গুলো

৩৯ অনুচ্ছেদকে একটি রেফারেন্স হিসেবে পড়লে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:

  • চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা সংবিধানে স্বীকৃত।
  • প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে।
  • সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
  • এই স্বাধীনতাগুলো পরম বা সীমাহীন নয়।
  • সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আইনের মাধ্যমে হতে হবে।
  • সংবিধান সীমাবদ্ধতার নির্দিষ্ট ক্ষেত্র উল্লেখ করেছে।
  • সীমাবদ্ধতাকে যুক্তিসঙ্গত হতে হবে।
  • মৌলিক অধিকারবিরোধী আইন সম্পর্কে অনুচ্ছেদ ২৬-এর সাংবিধানিক বিধান প্রাসঙ্গিক।
  • মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য অনুচ্ছেদ ৪৪ এবং ১০২-এর কাঠামো রয়েছে।
  • আন্তর্জাতিকভাবে ICCPR Article 19 মতামত ধারণ এবং তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ ও প্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষা দেয়।
  • জাতিসংঘের Human Rights Committee-এর General Comment No. 34 মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে legality, necessity এবং proportionality-এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে।

৩৯ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একটি মৌলিক সাংবিধানিক ভিত্তি। একই সঙ্গে এই অনুচ্ছেদ স্বাধীনতার ওপর আরোপযোগ্য সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র ও শর্তও নির্ধারণ করেছে।

তাই কোনো বক্তব্য, সংবাদ বা প্রকাশনার ক্ষেত্রে শুধু “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে” অথবা “আইনে নিষেধ আছে”—এই দুইটির যেকোনো একটিকে আলাদা করে দেখলে সাংবিধানিক কাঠামোটি সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না।

একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য দেখতে হয়—কোন অধিকার প্রয়োগ করা হয়েছে, কোন আইনের অধীনে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, সীমাবদ্ধতার সাংবিধানিক ভিত্তি কী, এবং সেই সীমাবদ্ধতা যুক্তিসঙ্গত কি না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে একই আলোচনায় আইনগত ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং সমানুপাতিকতার বিষয়গুলোও বিবেচনা করা হয়।

এই কারণে ৩৯ অনুচ্ছেদকে শুধু “বাক্-স্বাধীনতার অনুচ্ছেদ” হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতা ও তার সাংবিধানিক সীমারেখা—দুইয়ের একটি কাঠামো হিসেবে পড়া প্রয়োজন।

প্রাথমিক উৎস

১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৩৯
২. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২৬ ও ৪৪
৩. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, Appellate Division — Contempt Petition No. 19 of 2015, State v. Swadesh Roy and another
৪. International Covenant on Civil and Political Rights — Article 19
৫. UN Human Rights Committee — General Comment No. 34, Article 19: Freedoms of opinion and expression


সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬: মতপ্রকাশের দিক থেকে খসড়ার ধারাগুলো কী বলছে?
বাংলাদেশর আইন

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬: মতপ্রকাশের দিক থেকে খসড়ার ধারাগুলো কী বলছে?

‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ হলো সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ পরিবর্তনের একটি প্রস্তাবিত খসড়া। এটি নতুন করে একটি সম্পূর্ণ সাইবার আইন করার প্রস্তাব নয়। বরং ২০২৬

বিস্তারিত »
সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫: জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অগ্রগতি, বিতর্ক ও বর্তমান অবস্থা
বিশেষ প্রতিবেদন

সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫: জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অগ্রগতি, বিতর্ক ও বর্তমান অবস্থা

সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনায় পৃথক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাবিত ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এখনো (জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত) কার্যকর

বিস্তারিত »