সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনায় পৃথক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাবিত ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এখনো (জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত) কার্যকর হয়নি। যদিও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন একটি বিস্তৃত খসড়া প্রস্তাব করেছিল এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সেটির ভিত্তিতে একটি খসড়া প্রস্তুত করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের মতামতের জন্য পাঠায়, তবে এখন পর্যন্ত অধ্যাদেশটি জারি বা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি।
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা, ভয়ভীতি, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং তথ্য সংগ্রহে বাধার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সাংবাদিকদের জন্য একটি পৃথক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে।
কমিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া সংযুক্ত ছিল। পরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সেই খসড়া বিবেচনা করে সংশোধিত একটি সংস্করণ প্রস্তুত করে।
প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ বিধান
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের খসড়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল—
- পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানিকে পৃথক শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা।
- অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ন্যূনতম ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান।
- সাংবাদিককে তথ্যসূত্র (Source) প্রকাশে বাধ্য না করার আইনি সুরক্ষা।
- জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের কারণে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সুরক্ষার ব্যবস্থা।
- সাংবাদিকদের অবৈধ গ্রেপ্তার, আটক, তল্লাশি ও সম্পদ জব্দের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা।
- যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক হয়রানিকে আইনের আওতায় আনা।
- দণ্ড হিসেবে আদায়কৃত অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের সুযোগ।
- সাংবাদিকের কর্মস্থলেও ভয়ভীতি ও চাপমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিধান।
কী পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়?
২০২৫ সালের শেষার্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত খসড়ায় কমিশনের প্রস্তাবিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান আর রাখা হয়নি বা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে যেসব পরিবর্তনের কথা উঠে আসে, সেগুলোর মধ্যে ছিল—
- সাংবাদিক নির্যাতনের জন্য প্রস্তাবিত ১–৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান বাদ দেওয়া বা শিথিল করা।
- স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রস্তাব বাদ দেওয়া।
- সাংবাদিকদের সুরক্ষায় সরকারের বাধ্যবাধকতার ভাষা দুর্বল করা।
- সাংবাদিকের বাসা তল্লাশি, সম্পদ জব্দ এবং তদন্তসংক্রান্ত কিছু সুরক্ষা বিধান অপসারণ বা পরিবর্তন।
এসব পরিবর্তন নিয়ে সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, গণমাধ্যম গবেষক এবং অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাদের মতে, এতে প্রস্তাবিত আইনের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা
২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—
- অধ্যাদেশটি এখনো জারি হয়নি।
- রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ হিসেবে গেজেট প্রকাশ হয়নি।
- জাতীয় সংসদে আইন হিসেবে পাস হয়নি।
- কার্যকর হওয়ার কোনো সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
- সরকার এখনো বিষয়টি নিয়ে নীতিগত পর্যায়ে কাজ করছে।
অর্থাৎ, সাংবাদিকদের জন্য পৃথক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
মূল্যায়ন
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার, মামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়মিত নথিভুক্ত ও প্রকাশিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর, স্বাধীন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত আইন প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এমন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন—
- আইনটি যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
- সাংবাদিকদের সুরক্ষার পাশাপাশি আইনটির অপব্যবহার রোধে পর্যাপ্ত জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করা হয়।
- তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা, জনস্বার্থে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং স্বাধীন সংবাদ প্রকাশের অধিকার কার্যকরভাবে সুরক্ষিত থাকে।
- সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, কৌশলগত মামলা (SLAPP), অবৈধ গ্রেপ্তার, আটক এবং সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা হয়।
উপসংহার
‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাংলাদেশের সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রস্তাব। তবে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এটি এখনো কার্যকর আইন নয়। ফলে সাংবাদিকদের জন্য পৃথক আইনি সুরক্ষার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ভবিষ্যতে সরকার চূড়ান্তভাবে কী ধরনের আইন প্রণয়ন করে, তা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
অগ্রগতির টাইমলাইন
| সময় | গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি |
|---|---|
| নভেম্বর ২০২৪ | গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য পৃথক আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়নের সুপারিশ করে। |
| ২০২৫ (প্রথমার্ধ) | কমিশন ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রস্তুত করে। এতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি, তথ্যসূত্রের সুরক্ষা, স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অধিকার এবং পৃথক শাস্তির বিধান প্রস্তাব করা হয়। |
| আগস্ট ২০২৫ | তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কমিশনের খসড়া পর্যালোচনা করে নিজস্ব খসড়া প্রস্তুত করে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের মতামতের জন্য পাঠায়। প্রকাশিত খবরে জানানো হয়, সাংবাদিক নির্যাতনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। |
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | তথ্য উপদেষ্টা জানান, অংশীজনদের মতামত নিয়ে অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। |
| অক্টোবর ২০২৫ | বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত খসড়ায় কমিশনের প্রস্তাবিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেওয়া বা পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল সাংবাদিক নির্যাতনের জন্য ১–৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রস্তাব এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষাসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। |
| জুলাই ২০২৬ | সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অধ্যাদেশটি এখনো জারি হয়নি, গেজেট প্রকাশিত হয়নি এবং কার্যকর হয়নি। এটি এখনো নীতিগত ও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। |
বর্তমান অবস্থা (১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত)
অবস্থা: খসড়া পর্যায়ে
অধ্যাদেশ জারি: না
গেজেট প্রকাশ: না
কার্যকর: না
সর্বশেষ সরকারি অগ্রগতি: অংশীজনদের মতামত ও নীতিগত প্রক্রিয়া চলমান।
তথ্যসূত্র
১. গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন (২০২৫)।
২. The Business Standard বাংলা। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও সাংবাদিক সুরক্ষা আইন সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
৩. The Daily Star বাংলা। সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশের খসড়ায় পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
৪. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। তথ্য উপদেষ্টার সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বিষয়ে বক্তব্য।
৫. প্রথম আলো। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও সাংবাদিক নিরাপত্তা বিষয়ে মতামত নিবন্ধ।
৬. তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত খসড়া ও সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য (যেখানে প্রযোজ্য)।





