October 29, 2026 12:46 pm
October 29, 2026 12:46 pm

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬: মতপ্রকাশের দিক থেকে খসড়ার ধারাগুলো কী বলছে?

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬: মতপ্রকাশের দিক থেকে খসড়ার ধারাগুলো কী বলছে?

‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ হলো সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ পরিবর্তনের একটি প্রস্তাবিত খসড়া। এটি নতুন করে একটি সম্পূর্ণ সাইবার আইন করার প্রস্তাব নয়। বরং ২০২৬ সালের বর্তমান আইনের কয়েকটি ধারা পরিবর্তন, নতুন ধারা যোগ এবং কিছু বিধান সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রণীত হয়। আইনের ধারা ১(২) অনুযায়ী, আইনটি ২১ মে ২০২৫ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের খসড়াটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই খসড়ায় বর্তমান আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে আছে—

  • অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা;
  • কোন কোন সংস্থা এ ধরনের ব্যবস্থা চাইতে পারবে;
  • মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিং-সংক্রান্ত বিধান;
  • সাইবার স্পেসে গুজব ও ‘অপতথ্য’ প্রচারের নতুন অপরাধ;
  • কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের দায়;
  • তল্লাশি ও তথ্য সংরক্ষণ;
  • সাইবার অপরাধের বিচার;
  • এবং অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধি তৈরির সুযোগ।

এসব পরিবর্তনের কিছু অংশ সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বিশেষজ্ঞরা এই খসড়াটি শুধু প্রযুক্তি বা সাইবার অপরাধের আইন হিসেবে দেখাকে যথেষ্ট মনে করছেন না। এর কিছু বিধান সংবাদ প্রকাশ, অনলাইন বক্তব্য এবং তথ্য যাচাইয়ের কাজেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করেন।

এখন এর আইনি Status কী?

এটি এখনো আইন হয়নি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে খসড়াটি নিয়ে সর্বসাধারণের মতামত চেয়েছে। অর্থাৎ সরকার এখনো প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে মতামত গ্রহণের পর্যায়ে আছে। নোটিশের শিরোনামেও বলা হয়েছে, এটি ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনী প্রস্তাব অধিকতর পর্যালোচনার জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।

সুতরাং এই প্রতিবেদনে আমরা যেখানে ‘খসড়া’, ‘প্রস্তাবিত ধারা’ বা ‘প্রস্তাবিত আইন’ বলব, সেখানে সেটি বর্তমান আইন হিসেবে ধরা যাবে না।

মতামত দেওয়ার সময়সীমা

সরকারি নোটিশ অনুযায়ী, খসড়াটি নিয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে খসড়ায় আবার পরিবর্তন হতে পারে। তাই এই প্রতিবেদনে আলোচিত কোনো প্রস্তাবকেই চূড়ান্ত আইন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ নামে একটি পৃথক সংশোধনী আইন প্রণীত হয়। এটি ২০২৬ সনের ৮১ নং আইন ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনের জন্য প্রণীত এবং ২০২৬ সনের ৯৯ নং আইন হিসেবে চিহ্নিত। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মূল আইনের ধারা ২০ বিলুপ্ত করা হয়।

অন্যদিকে, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত সংশোধনী প্রস্তাবটি একটি নতুন খসড়া।

তাই এই প্রতিবেদনে দুটিকে আলাদা করে বলা হবে—

বিষয় Status
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ মূল আইন — ২০২৬ সনের ৮১ নং আইন
১ জুলাই ২০২৬-এর সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ১ জুলাই ২০২৬-এর পৃথক সংশোধনী — ২০২৬ সনের ৯৯ নং আইন
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংশোধনী প্রস্তাব বর্তমানে প্রস্তাবিত/খসড়া, এখনো আইন নয়

খসড়াটি কোথা থেকে এসেছে?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ১৫ জুলাই ২০২৬-এ জানিয়েছিল যে, ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক হয়েছে। সেখানে খসড়াটি আরও পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ যুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা সরকারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে সংশোধনী প্রস্তাবটি জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়।

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেখব- বর্তমান আইনে কী আছে? এবং খসড়ায় কী পরিবর্তন করা হচ্ছে? পরিবর্তনের ফলে সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম এবং অনলাইন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে কী নতুন আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে?

এবং এসব বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মানদণ্ডের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত?

২০০৬ → ২০২৬: বাংলাদেশের ডিজিটাল ও সাইবার আইন পরিবর্তনের Timeline

বাংলাদেশের ডিজিটাল ও সাইবার-সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রথম বিশেষায়িত আইন হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (ICT Act 2006)। এই আইনের ধারা ৫৭ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধরনের তথ্য প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করত। পরবর্তী সময়ে এই ধারার প্রয়োগ, পরিধি এবং মতপ্রকাশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

২০১৩ সালে ICT Act সংশোধন করে ধারা ৫৭-সহ কয়েকটি অপরাধের শাস্তি ও প্রয়োগের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। এরপর ২০১৮ সালে Digital Security Act (DSA) প্রণীত হলে ICT Act-এর ধারা ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ রহিত করা হয়। অর্থাৎ ধারা ৫৭ আর স্বতন্ত্রভাবে বহাল থাকেনি; পরবর্তী আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ ও বক্তব্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নতুন ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এক নজরে: ২০০৬ → ২০২৬ ধারাবাহিক পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত চিত্র —

২০০৬ — তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬

↓

২০১৩ — ICT Act সংশোধন; ধারা ৫৭-এর পরিবর্তিত প্রয়োগ

↓

২০১৮ — Digital Security Act, 2018

↓

২০২৩ — Cyber Security Act, 2023

↓

২০২৫ — Cyber Security Ordinance, 2025

↓

২০২৬ — Cyber Security Act, 2026

↓

১ জুলাই ২০২৬ — Cyber Security (Amendment) Act, 2026

↓

সেপ্টেম্বর ২০২৬ — Cyber Security Act, 2026 সংশোধনের প্রস্তাব

১. ২০০৬ — তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন:- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় এবং সাইবার/ডিজিটাল অপরাধের জন্য একটি বিশেষ আইনগত কাঠামো তৈরি হয়। এর ধারা ৫৭-এ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা আইনের নির্ধারিত শর্তের মধ্যে পড়ত। পরবর্তী সময়ে এই ধারায় মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যম, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। তাই পরবর্তী আইনগুলোর পরিবর্তন বুঝতে ধারা ৫৭-কে এই Timeline-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবে দেখা যায়।

২. ২০১৩ — ICT Act সংশোধন :- ২০১৩ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ICT Act-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানে পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে ধারা ৫৭-এর শাস্তি ও প্রয়োগের কাঠামোও পরিবর্তিত হয়। এই পর্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০১৮ সালে DSA প্রণয়নের আগে ডিজিটাল মাধ্যমে বক্তব্য ও তথ্য প্রকাশের জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামো এটিই ছিল।

৩. ২০১৮ — Digital Security Act: – ২০১৮ সালে Digital Security Act, 2018 প্রণীত হয়। এই আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে ICT Act-এর ধারা ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ রহিত করা হয়। ফলে ধারা ৫৭-এর পৃথক অস্তিত্ব শেষ হয়। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ, বক্তব্য এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি নতুন আইনের বিভিন্ন ধারায় পুনর্গঠিত হয়।

৪. ২০২৩ — Cyber Security Act: – ২০২৩ সালে Cyber Security Act, 2023 প্রণয়ন করে Digital Security Act, 2018 রহিত করা হয়। অর্থাৎ ২০১৮ সালের DSA-এর জায়গায় নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়।

৫. ২০২৫ — Cyber Security Ordinance: – ২০২৫ সালে Cyber Security Ordinance, 2025 জারি করা হয় এবং এর মাধ্যমে আগের আইনি কাঠামোয় আবার পরিবর্তন আসে।

৬. ২০২৬ — Cyber Security Act: – ১০ এপ্রিল ২০২৬ Cyber Security Act, 2026 প্রণীত হয়। আইনের ধারা ১ অনুযায়ী এটি ২১ মে ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা হয়েছে। এই আইনেই ২০২৩ সালের Cyber Security Act এবং ২০২৫ সালের Cyber Security Ordinance রহিত করার বিধান রাখা হয়।

৭. ১ জুলাই ২০২৬ — আলাদা সংশোধনী আইন:- ১ জুলাই ২০২৬ ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রণীত হয়। এটি সেপ্টেম্বরের আলোচিত সংশোধনী প্রস্তাব থেকে আলাদা একটি প্রণীত আইন (enacted law)। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ধারা ২০ রহিত করা হয়।

৮. সেপ্টেম্বর ২০২৬ — নতুন সংশোধনী প্রস্তাব: – সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Cyber Security Act, 2026-এর আরও কয়েকটি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব প্রকাশ করা হয় এবং সর্বসাধারণের মতামত আহ্বান করা হয়। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ধারা ২৫-এর পরিবর্তন, ধারা ২৬এ-তে সাইবার স্পেসে গুজব ও ‘অপতথ্য’ প্রচারকে নতুন অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব এবং ধারা ৮-এর content removal/blocking কাঠামোয় পরিবর্তন।

সেপ্টেম্বর ২০২৬ Draft: কোন কোন ধারা বদলাচ্ছে

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংশোধনী খসড়ায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর বেশ কয়েকটি ধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কিছু ধারা সরাসরি অনলাইন মতপ্রকাশের সঙ্গে যুক্ত।
কিছু ধারা প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত।
আবার কিছু ধারা সাইবার অপরাধের বিচার ও শাস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই অংশে প্রথমে পুরো পরিবর্তনের একটি তালিকা দেওয়া হলো। পরে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো আলাদা করে বিশ্লেষণ করা হবে।

এক নজরে প্রস্তাবিত পরিবর্তন

ধারা কী পরিবর্তনের প্রস্তাব মতপ্রকাশের সঙ্গে সম্পর্ক
ধারা ২ কিছু সংজ্ঞা ও পরিভাষায় পরিবর্তন পরোক্ষ
ধারা ৮ অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করার ব্যবস্থায় পরিবর্তন সরাসরি
ধারা ১২ জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের গঠনে পরিবর্তন পরোক্ষ
ধারা ১৪ কাউন্সিলের সভার সময়সূচিতে পরিবর্তন পরোক্ষ
ধারা ২৫ যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, বুলিং, মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার বিষয় যুক্ত/পরিবর্তন সরাসরি
ধারা ২৬এ সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ প্রচারকে নতুন অপরাধ করার প্রস্তাব সরাসরি
ধারা ২৮ সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিধানে পরিবর্তন আংশিক
ধারা ২৯ কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্ভাব্য শাস্তিতে পরিবর্তন সরাসরি/গুরুত্বপূর্ণ
ধারা ৩০ সংশ্লিষ্ট অপরাধের দায় ও শাস্তির বিধানে পরিবর্তন আংশিক
ধারা ৩১–৩২ রাষ্ট্র, জনশৃঙ্খলা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিধানে পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
ধারা ৩৪ তল্লাশি ও জব্দের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে
ধারা ৩৬ তথ্য/উপাত্ত সংরক্ষণের বিধানে পরিবর্তন সাংবাদিক ও ডিজিটাল তথ্যের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক
ধারা ৪০–৪২ তদন্ত, বিচার ও আপিলসংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
ধারা ৪৯ বিধি প্রণয়নের ক্ষমতার পরিধিতে পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

নোট: উপরের তালিকাটি খসড়ায় প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর বিষয়ভিত্তিক সারাংশ। প্রতিটি পরিবর্তনের পূর্ণ আইনি অর্থ বুঝতে সংশ্লিষ্ট ধারা বর্তমান আইনের সঙ্গে পাশাপাশি পড়তে হবে।

(ক) ধারা ২ — সংজ্ঞায় পরিবর্তন

খসড়ায় আইনের কিছু সংজ্ঞা ও পরিভাষা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনে কোনো শব্দের সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরে কোনো অপরাধ নির্ধারণের সময় সেই সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে অনলাইনে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন তথ্যকে কী বলা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাই ধারা ২-এর পরিবর্তনগুলো পরের ধারাগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

(খ) ধারা ৮ — অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক

এটি খসড়ার বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক ধারাগুলোর একটি। বর্তমান আইনেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কনটেন্ট অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করার ব্যবস্থা রয়েছে।

খসড়ায় এই ব্যবস্থার পরিধি পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধের কথা আছে। খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকে অনুরোধ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা;
  • জনশৃঙ্খলা;
  • ভয় বা ক্ষতির আশঙ্কা;
  • ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ;
  • জাতিগত সহিংসতা;
  • বিশৃঙ্খলা বা অপরাধে উৎসাহ;
  • কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানিকর তথ্য;
  • রাষ্ট্রকে অপমান করার মতো বিষয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। খসড়ায় কনটেন্ট ব্লক করার তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বর্তমান স্বচ্ছতা-বিধান পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়নি। বরং খসড়ায় বর্তমান ধারা ৮(৩)-এর কাঠামো রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত ধারা ৮(৪) অনুযায়ী, কনটেন্ট অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করার পর সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন তিন দিনের মধ্যে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন না পাওয়া গেলে বা ট্রাইব্যুনাল অনুমোদন না দিলে কনটেন্ট প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই অংশে একদিকে প্রশাসনিকভাবে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব আছে। অন্যদিকে পরবর্তী বিচারিক অনুমোদনের একটি প্রক্রিয়াও রাখা হয়েছে।

(গ) ধারা ১২ ও ১৪ — জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিল

ধারা ১২-তে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের গঠনে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বের কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।

ধারা ১৪-তে কাউন্সিলের নিয়মিত সভার ব্যবধান পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় নিয়মিত সভা তিন মাস অন্তর হওয়ার কথা। খসড়ায় তা ছয় মাস অন্তর করার প্রস্তাব রয়েছে। জরুরি সভার সুযোগ রাখা হয়েছে।

(ঘ) ধারা ২৫ — মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিং

মতপ্রকাশের দিক থেকে এটি অন্যতম প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন। খসড়ায় ধারা ২৫-এর আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন ও শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত উপাদানের পাশাপাশি মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা এবং বুলিংয়ের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল কনটেন্ট প্রকাশের বিষয়ও রাখা হয়েছে। খসড়ায় এ ধরনের কনটেন্টের মধ্যে লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিক্স এবং সম্পাদিত বা AI-নির্মিত উপাদানের কথাও এসেছে।

শাস্তির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে বর্তমান আইনে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। খসড়ায় তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুকে লক্ষ্য করে অপরাধের ক্ষেত্রে বর্তমান সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা। খসড়ায় তা বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।

(ঙ) নতুন ধারা ২৬ক — ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’

খসড়ার নতুন প্রস্তাবগুলোর একটি হলো ধারা ২৬ক। প্রস্তাবিত ধারাটির শিরোনাম—‘সাইবার স্পেসে গুজব, অপতথ্য ইত্যাদি প্রচার ও উহার দণ্ড।’ খসড়ায় বলা হয়েছে, সাইবার স্পেসে গুজব ও ‘অপতথ্য’ প্রকাশ বা প্রচার অপরাধ হবে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখানে দুটি শব্দের আলাদা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

‘গুজব’ বলতে এমন অসমর্থিত বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানো হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বা করতে পারে।

অন্যদিকে ‘অপতথ্য’ বলতে এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য বোঝানো হয়েছে, যা কাউকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:

‘যাচাই করা হয়নি’ এবং ‘মিথ্যা’—এই দুটি বিষয় একই নয়।

একজন সাংবাদিক কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সেটি যাচাই না করলে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কোনো তথ্য এখনো যাচাই করা হয়নি বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এই কারণে প্রস্তাবিত ধারা ২৬ক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য।

(চ) ধারা ২৯ — কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের দায়

খসড়ায় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের দায়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মালিক, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিনিধির দায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে খসড়ায় একটি প্রতিরক্ষার সুযোগও রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি দেখাতে পারেন যে—

  • তার জ্ঞান ছাড়া অপরাধটি ঘটেছে; অথবা
  • অপরাধ ঠেকাতে তিনি যথাযথ সতর্কতা বা দায়িত্বশীল ব্যবস্থা নিয়েছিলেন,

তাহলে সেই বিষয়ে আইনি প্রতিরক্ষার সুযোগ থাকবে। খসড়ায় প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রমের ওপর আদালতের আদেশের বিষয়ও এসেছে।

(ছ) ধারা ৩০, ৩১ ও ৩২ — অন্যান্য সাইবার অপরাধ

খসড়ায় ধারা ৩০, ৩১ ও ৩২-এও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এসব ধারার মধ্যে কিছু বিষয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

(জ) ধারা ৩৪ — তল্লাশি ও জব্দ

খসড়ায় তল্লাশি ও জব্দের বিধানেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হতে পারে, অথবা সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত কোনো স্থানে আছে—এমন পরিস্থিতিতে তল্লাশি ও জব্দের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধরনের ক্ষমতার পরিধি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনগত সুরক্ষা এবং প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের কাছে কখনো কখনো—

  • সূত্রের পরিচয়;
  • যোগাযোগের তথ্য;
  • নথি;
  • ছবি বা ভিডিও;
  • অপ্রকাশিত তথ্য;
  • ডিজিটাল যোগাযোগ

থাকতে পারে। ফলে তল্লাশি ও জব্দের বিধানের প্রয়োগ সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

(ঝ) ধারা ৩৬ — তথ্য বা উপাত্ত সংরক্ষণ

খসড়ায় ডিজিটাল তথ্য বা উপাত্ত সংরক্ষণের বিধানেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ধরনের বিধানের উদ্দেশ্য সাধারণত তদন্তের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা।

তবে সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কারণ কোনো তদন্তে সংরক্ষিত তথ্যের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সাংবাদিকতার সূত্র-সংক্রান্ত তথ্য থাকতে পারে। তাই এখানে দুটি বিষয় দেখা দরকার—

কোন তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে? এবং কতদিন ও কোন প্রক্রিয়ায় তা সংরক্ষণ করা যাবে?

(ঞ) ধারা ৪০–৪২ — তদন্ত, বিচার ও আপিল

খসড়ায় তদন্ত ও বিচারসংক্রান্ত কয়েকটি ধারাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে কোন অপরাধ কোন আদালত বা ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে, সে বিষয়ে পরিবর্তন আছে। সব অপরাধ একইভাবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে—এমনভাবে বিষয়টি বলা ঠিক হবে না। খসড়ায় বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিচারিক এখতিয়ার আলাদা করে নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া আপিলের কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বক্তব্য বা প্রকাশনা অপরাধ হিসেবে অভিযোগ হলে শুধু অপরাধের সংজ্ঞাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোথায় বিচার হবে, কীভাবে বিচার হবে এবং আপিলের সুযোগ কী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

(ট) ধারা ৪৯ — ভবিষ্যতে বিধি তৈরির সুযোগ

বর্তমান ধারা ৪৯ সরকারকে আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়। বর্তমান ধারা ৪৯। খসড়ায় এই বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্র আরও নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব আছে। এর মধ্যে অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার সময় ও প্রক্রিয়া নির্ধারণের মতো বিষয়ও রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। কারণ মূল আইনে কোনো ক্ষমতা দেওয়ার পর তার ব্যবহার কীভাবে হবে, তার অনেক বিস্তারিত বিষয় পরে বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে।

বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তনগুলো: –

সেপ্টেম্বরের খসড়ার সব পরিবর্তনের প্রকৃতি বা প্রয়োগের ক্ষেত্র এক নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বা সম্ভাব্যভাবে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. ধারা ৮ — কনটেন্ট অপসারণ, স্থানান্তর ও ব্লক করার ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

২. ধারা ২৫ — মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিং-সংক্রান্ত বিধান এবং শাস্তির পরিবর্তন।

৩. নতুন ধারা ২৬ক — গুজব ও ‘অপতথ্য’ প্রচারের নতুন অপরাধ।

৪. ধারা ২৯ — কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের দায় এবং সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।

৫. ধারা ৩৪ ও ৩৬ — তল্লাশি, জব্দ এবং তথ্য সংরক্ষণের বিধান।

৬. ধারা ৪০–৪২ — তদন্ত, বিচার ও আপিলের কাঠামো।

৭. ধারা ৪৯ — অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণসহ কিছু বিষয়ে পরবর্তী বিধি তৈরির সুযোগ।

এর মধ্যে মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কয়েকটি বিধান আলাদাভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। পরবর্তী অংশে প্রস্তাবিত ধারা ২৬ক-এর ‘গুজব’, ‘যাচাই না করা তথ্য’ ও ‘অপতথ্য’ সংক্রান্ত বিধানটি বিস্তারিতভাবে দেখা হবে।

ধারা ২৬ক: গুজব, যাচাই না করা তথ্য ও ‘অপতথ্য’

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ধারা ২৬ক নামে নতুন একটি বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বিষয় হলো—সাইবার স্পেসে গুজব ও ‘অপতথ্য’ প্রকাশ বা প্রচার। খসড়ায় এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে।

‘গুজব’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

খসড়ার ব্যাখ্যায় ‘গুজব’ বলতে এমন অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— অযাচাইকৃত তথ্য এবং মিথ্যা তথ্য এক জিনিস নয়।

কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রথম পর্যায়ে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতি, দুর্যোগ, সংঘাত বা দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনায় প্রাথমিক তথ্য অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। BLAST-ও এই পার্থক্যটি তুলে ধরে ধারা ২৬ক বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে।

‘অপতথ্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

খসড়ায় ‘অপতথ্য’ বলতে মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা কোনো ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা হয়—এমন তথ্য বোঝানো হয়েছে।

এখানে ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-এর মধ্যে একটি পার্থক্য দেখা যায়।

  • গুজবের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে তথ্যটি অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত এবং তা বিভ্রান্তি/আতঙ্ক/অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
  • অপতথ্যের ক্ষেত্রে মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি বা প্রচারের উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পার্থক্য সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি কোথায়?

একজন সাংবাদিক কোনো ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। সেই তথ্য তখনও সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা না-ও হতে পারে। সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো—

  • তথ্যের উৎস যাচাই করা;
  • সম্ভব হলে একাধিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা;
  • সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া;
  • তথ্যের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করা;
  • ভুল হলে সংশোধন করা;
  • এবং প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই করা।

সুতরাং “যাচাই করা হয়নি” এবং “ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য তৈরি করা হয়েছে”—এই দুটি বিষয়কে একইভাবে দেখা হচ্ছে কি না, সেটি ধারা ২৬ক বিশ্লেষণের একটি এখানে প্রশ্ন হলো।

CPJ-ও খসড়ার এমন বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে, যেখানে কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো প্রতিবেদন ‘unverified’ মনে হলে সাংবাদিকতার ওপর অপরাধমূলক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্ক

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কারণে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগও রয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে ICCPR-এর ১৯ অনুচ্ছেদেও মতামত ধারণের স্বাধীনতা এবং তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ ও প্রচারের অধিকার স্বীকৃত।

তাই ধারা ২৬ক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু কোনো প্রভাব ফেলতে পারে তথ্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য আছে কি না—এটি দেখলেই হবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে:

১. অপরাধের সংজ্ঞা কতটা স্পষ্ট;

২. অযাচাইকৃত তথ্য ও মিথ্যা তথ্যের পার্থক্য যথেষ্ট পরিষ্কার কি না;

৩. অপরাধ প্রমাণে উদ্দেশ্য বা knowledge কীভাবে নির্ধারিত হবে;

৪. জনস্বার্থে প্রকাশিত তথ্য কীভাবে বিবেচিত হবে;

৫. সাংবাদিকতার ভুল, অসম্পূর্ণতা ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারকে কীভাবে আলাদা করা হবে;

৬. এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির কার্যকর আইনি প্রতিকার কী থাকবে।

সরকারের অবস্থান

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনের উদ্দেশ্য মতপ্রকাশ বা সাংবাদিকতা দমন করা নয়; বরং সাইবার স্পেসে প্রভাব ফেলতে পারে ও বিভ্রান্তিকর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে খসড়া নিয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।

ধারা ২৫: মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা ও Bullying

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংশোধনী খসড়ায় ধারা ২৫-এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান আইনের ধারা ২৫ মূলত ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন-সংক্রান্ত উপাদান এবং সেক্সটর্শনের মতো গুরুতর অনলাইন অপরাধ নিয়ে।

খসড়ায় এই ধারার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে যোগ হচ্ছে—

  • মানহানি;
  • হেয়প্রতিপন্ন করা;
  • bullying;
  • এবং এসব উদ্দেশ্যে প্রভাব ফেলতে পারে বা ভীতি প্রদর্শক ডিজিটাল কনটেন্ট প্রকাশ বা প্রচারের বিষয়।

একই সঙ্গে শাস্তিও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে

১. বর্তমান ধারা ২৫ কী নিয়ে?

বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ধারা ২৫-এ ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন-সংক্রান্ত উপাদান এবং সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে প্রভাব ফেলতে পারে বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিওভিজ্যুয়াল, গ্রাফিক্স ইত্যাদি প্রকাশ বা প্রচারের বিষয় রয়েছে। বর্তমান ধারা ২৫।

এই বিধান নারী ও শিশুকে লক্ষ্য করে সংঘটিত গুরুতর অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ বর্তমান ধারার মূল লক্ষ্য ছিল অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং ও সংশ্লিষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করা। সেপ্টেম্বরের খসড়ায় এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

২. খসড়ায় কী যোগ হচ্ছে?

খসড়ায় ধারা ২৫-এর শিরোনাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘মানহানিকর তথ্য’-এর বিষয়টি যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে হেয়প্রতিপন্ন করা বা bullying করার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল কনটেন্ট প্রকাশের বিষয়ও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। খসড়ায় লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টের কথাও রয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু সাধারণ লেখা বা পোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

৩. মানহানি বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

খসড়ায় ‘মানহানি’ বলতে Penal Code-এর মানহানির ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের Penal Code-এর ধারা ৪৯৯-এ মানহানির সংজ্ঞা দেওয়া আছে।

সেখানে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে এমন কথা, লেখা, চিহ্ন বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার কথা বলা হয়েছে, যা তার সুনাম ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে করা হয় বা যার ফলে তার সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা জানা বা বিশ্বাস করার কারণ থাকে। তবে ধারা ৪৯৯-এ কিছু ব্যতিক্রমও আছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • সত্য কথা প্রকাশ, যদি তা জনস্বার্থে করা হয়;
  • সরকারি কর্মচারীর সরকারি দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সৎ বিশ্বাসে মতামত;
  • জনস্বার্থের বিষয়ে সৎ বিশ্বাসে মতামত;
  • এবং কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রম বা জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত বিষয়ে সৎ বিশ্বাসে মন্তব্য।

এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানহানি এবং বৈধ সমালোচনা একই বিষয় নয়।

৪. ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’ বা Demeaning কী?

খসড়ায় ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’ বা demeaning-এর ধারণা আলাদাভাবে আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যাখ্যায় এমন কথা, ছবি, প্রকাশনা বা আচরণের বিষয় রয়েছে, যা কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সুনাম বা সামাজিক অবস্থান ক্ষুণ্ণ করে বা তাকে অন্যদের তুলনায় অপমানিত বা নিকৃষ্ট হিসেবে উপস্থাপন করে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। মানহানি মূলত সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে হেয়প্রতিপন্ন করা-র ধারণায় মর্যাদা, অপমান বা সামাজিক অবস্থানের বিষয়ও যুক্ত হচ্ছে।

এই দুই ধারণার মধ্যে আইনি পার্থক্য কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটি তাই গুরুত্বপূর্ণ।

৫. Bullying বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

খসড়ায় bullying-এর জন্যও একটি সংজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে মূল বিষয়গুলো হলো—

  • আচরণটি ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিত;
  • তা বারবার বা ধারাবাহিকভাবে করা;
  • কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর বাস্তব বা ধারণাগত ক্ষমতা ব্যবহার করা;
  • এবং এর ফলে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি, ভয় বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়া।

অর্থাৎ খসড়ার ভাষায় bullying শুধু একটি একক অপমানজনক মন্তব্যের ধারণা নয়। এতে পুনরাবৃত্ত আচরণ ও ক্ষতির বিষয় রয়েছে।

এটি একটি পার্থক্য।

৬. তাহলে সমালোচনা কি Bullying?

এখানে সরাসরি উত্তর দেওয়া যায় না। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা এবং কাউকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে ভয় দেখানো বা হয়রানি করা একই বিষয় নয়।

উদাহরণ হিসেবে— “এই সিদ্ধান্তটি ভুল এবং এর কারণে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

এটি একটি মতামত বা সমালোচনা।

অন্যদিকে—

কাউকে লক্ষ্য করে বারবার হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো বা ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি করা

আলাদা ধরনের আচরণ।

তাই bullying-এর সংজ্ঞা প্রয়োগের সময় বক্তব্যের বিষয়, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট, পুনরাবৃত্তি এবং বাস্তব ক্ষতি—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST) এই জায়গাটিই বিশেষভাবে তুলেছে। তাদের ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বক্তব্যে বলা হয়েছে, bullying-এর সংজ্ঞা ফৌজদারি অপরাধের জন্য আরও নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তারা গুরুতর, ইচ্ছাকৃত ও বারবার সংঘটিত ডিজিটাল হয়রানি, হুমকি বা নির্যাতনের মধ্যে অপরাধটির সীমা রাখার কথা বলেছে।

৭. সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি কোথায়?

একজন সাংবাদিকের কাজের মধ্যে থাকতে পারে—

  • কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে অনুসন্ধান;
  • অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ;
  • সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা;
  • কোনো প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন;
  • জনস্বার্থে কঠোর ভাষায় মতামত;
  • সাক্ষাৎকার বা নথির ভিত্তিতে প্রতিবেদন;
  • এবং কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

এসবের কোনোটি শুধু অপছন্দনীয় বা বিব্রতকর হলেই তা মানহানি বা bullying হয়ে যায় না। আবার সাংবাদিক পরিচয় থাকলেই কোনো বক্তব্য আইনের বাইরে থাকবে—এমনটিও নয়।

যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারও সুনাম ক্ষুণ্ণ করেন, অথবা কাউকে ধারাবাহিকভাবে ভয় দেখান বা হয়রানি করেন, তাহলে সেটি আলাদা বিষয়।

তাই এখানে আসল প্রশ্ন হলো— আইন কীভাবে বৈধ সাংবাদিকতা ও প্রভাব ফেলতে পারে অনলাইন আচরণের মধ্যে পার্থক্য করবে?

৮. AI-generated কনটেন্ট কেন যুক্ত করা হয়েছে?

খসড়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টের কথাও রাখা হয়েছে। বর্তমান সময়ে ছবি, ভিডিও বা অডিও পরিবর্তন করে কাউকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর বা প্রভাব ফেলতে পারে কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। তাই AI-generated বা AI-edited কনটেন্টকে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কিন্তু এখানেও একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। AI দিয়ে তৈরি হয়েছে বলেই কোনো কনটেন্ট অপরাধ নয়।

অপরাধ হবে কি না, তা নির্ভর করবে কনটেন্টটি কী, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—তার ওপর।

৯. শাস্তি কতটা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে?

এখানে খসড়ার পরিবর্তনটি স্পষ্ট।

সাধারণ ক্ষেত্রে: –

বর্তমান ধারা ২৫ অনুযায়ী সর্বোচ্চ— ২ বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।

খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে— ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।

নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুকে লক্ষ্য করে:- 

বর্তমান আইনে সর্বোচ্চ— ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।

খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে— ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।

এই তুলনাটি খসড়ার পরিবর্তনটি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খসড়ার পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত তুলনামূলক পাঠ।

১০. মানহানির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

খসড়ায় মানহানির ধারণার সঙ্গে Penal Code-এর ধারা ৪৯৯-এর সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ Penal Code-এর ধারা ৪৯৯-এ শুধু অপরাধের সংজ্ঞা নেই। কিছু ব্যতিক্রমও আছে।

বিশেষ করে সত্য কথা জনস্বার্থে প্রকাশ এবং জনস্বার্থের বিষয়ে সৎ বিশ্বাসে মতামতের মতো বিষয় সেখানে উল্লেখ রয়েছে। Penal Code, section 499.

তাই প্রস্তাবিত ধারা ২৫ প্রয়োগের ক্ষেত্রে এসব বিদ্যমান আইনি ধারণা কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সেটি এখানে প্রশ্ন।

১১. সরকারি অবস্থান কী?

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইন সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেবে এবং সাইবার bullying কমাতে সহায়তা করবে।

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত আইন সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেবে, সাইবার bullying কমাবে এবং অনলাইন পরিবেশে শালীনতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে। তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা এবং চরিত্রহনন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে abusive language এক বিষয় নয়।

১২. নাগরিক অধিকার সংগঠনের প্রশ্ন কী?

BLAST বলেছে, নারী ও শিশুদের অনলাইন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তবে তাদের মতে, bullying-এর সংজ্ঞা এমনভাবে নির্দিষ্ট করা দরকার যাতে বৈধ মতবিরোধ, রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থের আলোচনা অপরাধের আওতায় না পড়ে।

Transparency International Bangladesh (TIB)-ও খসড়ার ‘demeaning’, ‘defamatory’ ও ‘bullying’-এর মতো সংজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, অস্পষ্ট সংজ্ঞা ভুল ব্যাখ্যা বা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

Blocking — বর্তমান আইন ও নতুন খসড়ার পার্থক্য কোথায়?

 বর্তমানে কার্যকর আইনে কী আছে?

বর্তমান আইনের ধারা ৮(১) অনুযায়ী, মহাপরিচালক কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলে তা অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করার ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রয়োজন হলে তিনি বিটিআরসিকেও অনুরোধ করতে পারেন।

খসড়ায় নতুন কী?

সেপ্টেম্বরের খসড়ায় ধারা ৮-এ blocking-এর কোন পরিস্থিতিতে এবং কার অনুরোধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—সেটি আরও বিস্তৃতভাবে লেখা হয়েছে। খসড়ার প্রস্তাবিত ৮(২)-এ বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বাস করার কারণ থাকলে যে কোনো অনলাইন তথ্য—

  • দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা ক্ষুণ্ণ করে;
  • জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করে;
  • ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বা জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি করে;
  • সহিংসতার উদ্রেক করে;
  • বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দেয়;

তাহলে মহাপরিচালকের মাধ্যমে অপসারণ, স্থানান্তর বা blocking-এর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখানে মূল পার্থক্য হলো:

বিষয় বর্তমান আইন সেপ্টেম্বরের খসড়া
Blocking ক্ষমতা আছে আছে
মূল ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহাপরিচালক মহাপরিচালক
সাইবার নিরাপত্তার হুমকি ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি বহাল
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা বর্তমান ধারা ৮(১)-এ এভাবে আলাদা ভিত্তি নেই আলাদা করে প্রস্তাব করা হয়েছে
জনশৃঙ্খলা/সহিংসতা/সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বর্তমান ৮(১)-এর সাধারণ “সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি” ভাষা খসড়ায় নির্দিষ্ট ভিত্তি হিসেবে যোগ/স্পষ্ট করার প্রস্তাব
Blocking-এর পর ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন ২০২৬ আইনে ৩ দিনের মধ্যে অনুমোদনের বিধান আছে খসড়াতেও ৩ দিনের মধ্যে অনুমোদনের বিধান রাখা হয়েছে
Blocking-এর স্বচ্ছতা বর্তমান আইনের ৮(৩)-এ ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য প্রকাশের বিধান আছে খসড়াতেও এই স্বচ্ছতার বিধান রাখা হয়েছে

বর্তমান আইনের ধারা ৮(৩) অনুযায়ী, কোনো কনটেন্ট ব্লক করা হলে স্বচ্ছতার স্বার্থে সরকারকে ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। খসড়াতেও এই বিধান রাখা হয়েছে।

Judicial review-এর জায়গায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে

বর্তমান আইন এবং খসড়া—দুটির ক্ষেত্রেই blocking-এর পর আদালত/ট্রাইব্যুনালের ভূমিকার কথা আছে।

বর্তমান আইনের ধারা ৮(৪) অনুযায়ী, অপসারণ, স্থানান্তর বা blocking করার ৩ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অনুমতি না পাওয়া গেলে বা ট্রাইব্যুনাল অনুমতি না দিলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পুনরায় অবমুক্ত করার বিধান রয়েছে।

খসড়াতেও একই ধরনের ৩ দিনের অনুমোদন ব্যবস্থার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বরং দুটি বিষয় আলাদাভাবে দেখতে হবে:

প্রথমত — blocking করার ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত — সেই ক্ষমতা ব্যবহারের পর কী ধরনের বিচারিক পরীক্ষা ও প্রতিকার থাকছে।

সহজ উদাহরণ:- ধরা যাক, একটি অনলাইন প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশ হলো যা কর্তৃপক্ষ মনে করছে জনশৃঙ্খলার জন্য প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান আইনে:- সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে বিবেচিত হলে ধারা ৮-এর অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

খসড়ায়:- জনশৃঙ্খলা, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত বিদ্বেষ, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনার মতো বিষয়গুলোকে blocking-এর ভিত্তি হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো: এই শব্দগুলোর প্রয়োগের সীমা কতটা স্পষ্ট?

উদাহরণস্বরূপ, “জনশৃঙ্খলা” বা “বিদ্বেষ সৃষ্টি” বলতে ঠিক কোন ধরনের কনটেন্ট বোঝানো হবে? কোনো সংবাদ প্রতিবেদন, সমালোচনা, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক বক্তব্য বা জনস্বার্থের তথ্য কখন এই সীমায় পড়বে? আইনের প্রয়োগের সময় এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

 Article 39 ও Article 19-এর সঙ্গে সম্পর্ক

বাংলাদেশের সংবিধানের Article 39 মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, মানহানি, আদালত অবমাননা ও অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট কারণে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগ রাখে।

ICCPR Article 19ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে। তবে সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণে কনটেন্ট অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করার বিধান পর্যালোচনার ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমতাটি আছে কি না, তা দেখাই যথেষ্ট নয়। কোন কনটেন্টে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, কার অনুরোধে বা কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা করা যাবে, কী মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত হবে, বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ ও সময়সীমা কী এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকারের ব্যবস্থা কী—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসে।

Media Organisation-এর Liability

ধারা ২৯-এ কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মালিক, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক, ম্যানেজার, কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিনিধির দায়ের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দায় নির্ধারণে “প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা”, অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞান এবং তা প্রতিরোধে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে তাই কোনো প্রতিবেদনের জন্য দায় নির্ধারণের সময় কয়েকটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হতে পারে—

  • অভিযোগিত কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল;
  • তার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা কীভাবে নির্ধারিত হবে;
  • এবং প্রতিষ্ঠানের editorial বা fact-checking ব্যবস্থা দায় নির্ধারণে কীভাবে বিবেচিত হবে।

সেপ্টেম্বরের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোতে নতুন বা বিস্তৃত কয়েকটি কনটেন্ট-সম্পর্কিত অপরাধের প্রস্তাব থাকায়, এসব ক্ষেত্রে ধারা ২৯-এর দায়ের কাঠামো কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা বাস্তব প্রয়োগে পর্যবেক্ষণের বিষয়।

 বর্তমান আইন বনাম খসড়া — এক নজরে

বিষয় বর্তমান আইন সেপ্টেম্বরের খসড়া
কোম্পানির দায় ধারা ২৯-এ রয়েছে নতুন/পরিবর্তিত অপরাধের ক্ষেত্রে এই দায় কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ
ব্যক্তিগত দায় প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নতুন কনটেন্ট-অপরাধের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন থাকবে
আত্মপক্ষ সমর্থন অজ্ঞাতসারে হওয়া বা প্রতিরোধে যথাসাধ্য চেষ্টার সুযোগ আছে প্রস্তাবিত অপরাধের ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ
Media organisation কোম্পানি হিসেবে দায়ের আওতায় নতুন কনটেন্ট-অপরাধ যুক্ত হলে newsroom-এর জন্য প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে

অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সাংবাদিকতার স্বাভাবিক editorial process-এর সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সীমারেখা কোথায় থাকবে।

সাংবাদিকতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংশোধনী খসড়ার সব বিধান সাংবাদিকতাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে কনটেন্ট প্রকাশ, তথ্য যাচাই, মানহানি এবং কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার বিধানগুলোর প্রয়োগ সাংবাদিকতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে প্রধান প্রশ্ন হলো—একজন সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম কোন পরিস্থিতিতে আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন এবং সেই ঝুঁকির সীমা কতটা স্পষ্ট।

তথ্য প্রকাশ ও সাংবাদিকতার প্রক্রিয়া

প্রস্তাবিত ধারা ২৬ক-এ “গুজব” ও “অপতথ্য” এবং ধারা ২৫-এ মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার বিষয় রয়েছে। এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগে যাচাই না করা তথ্য, ভুল তথ্য এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠিত সত্য—এই তিনটির পার্থক্য স্পষ্ট রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।

তাই একটি প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস, যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা এবং প্রতিবেদনের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ নথি হয়ে উঠতে পারে।

উৎসভিত্তিক বক্তব্য

১. সরকারের বক্তব্য: –

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর stakeholder consultation-এ তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালীব রহমান বলেন, প্রস্তাবিত আইন দিয়ে free thought, press freedom বা journalists-কে দমন করার কোনো উদ্দেশ্য সরকারের নেই। তিনি বলেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং অনলাইনে ক্ষতিকর ও অশালীন কনটেন্ট মোকাবিলা করা।

মন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার এমন কোনো অস্পষ্ট ভাষা রাখতে চায় না, যা ভবিষ্যতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি আইন চূড়ান্ত করার আগে media professionals-এর মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। BSS — Govt has no intention to muzzle press freedom thru proposed Cyber Security Act

১৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত আইন সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা, cyberbullying প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল পরিসরে শালীনতা রক্ষায় সহায়ক হবে। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের অধিকার সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের অধীন এবং constructive criticism ও character assassination বা abusive language এক বিষয় নয়। BSS — Cyber law to protect journalists, curb cyberbullying, restore decency online

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ১৩ সেপ্টেম্বর খসড়াটি সর্বসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করে। ফলে এই পর্যায়ে এটি চূড়ান্ত আইন নয়; এটি পর্যালোচনাধীন সংশোধনী প্রস্তাব। সরকারি নোটিশেও খসড়াটি অধিকতর পর্যালোচনার জন্য প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। ICT Division — সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর সর্বসাধারণের মতামত সংক্রান্ত নোটিশ

TIB-এর বক্তব্য:Ñ Transparency International Bangladesh (TIB) ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে খসড়াটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। TIB-এর বক্তব্য অনুযায়ী, খসড়ায় cybercrime, cybersecurity এবং freedom of expression—এই তিনটি পৃথক বিষয়কে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে।

TIB আরও বলেছে, “rumour”, “misinformation”, “demeaning”, “defamatory” এবং “insulting to the state”-এর মতো ধারণার সংজ্ঞা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা থাকলে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। TIB খসড়াটি stakeholder মতামত ও আন্তর্জাতিক ভালো চর্চার আলোকে ব্যাপকভাবে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। TIB — খসড়া সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

BLAST-এর বক্তব্য :- Bangladesh Legal Aid and Services Trust (BLAST) ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বক্তব্যে খসড়ার কয়েকটি নির্দিষ্ট বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। BLAST বিশেষভাবে—

  • ধারা ২৫-এর মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করা;
  • bullying-এর বিস্তৃত প্রয়োগ;
  • ধারা ২৬এ-এর গুজব ও অপতথ্য;
  • এবং অনলাইন কনটেন্ট blocking-এর কাঠামো

নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

BLAST-এর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যাচাই না করা তথ্য এবং মিথ্যা তথ্যকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। তারা আরও বলেছে, bullying-এর সংজ্ঞা এমন হওয়া উচিত নয় যাতে বৈধ মতবিরোধ, রাজনৈতিক বক্তব্য, satire, consumer complaint, investigative journalism বা public-interest expression-এর মতো বৈধ প্রকাশের ধরনও এর আওতায় পড়ে। BLAST — প্রস্তাবিত Cyber Security (Amendment) Act, 2026 নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

CPJ-এর বক্তব্য:- Committee to Protect Journalists (CPJ) ১৪ সেপ্টেম্বর খসড়া নিয়ে পৃথক বক্তব্য প্রকাশ করে। CPJ-এর প্রধান উদ্বেগ হলো, কর্তৃপক্ষের কাছে “unverified” বলে বিবেচিত reporting-এর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা। CPJ বলেছে, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংগৃহীত ও fact-checked তথ্য প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে—এমনকি সেই তথ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত না হলেও।

CPJ আরও বলেছে, খসড়ায় সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে blocking এবং প্রতিষ্ঠানের licence suspend বা cancel করার মতো ব্যবস্থার সম্ভাবনা রয়েছে। CPJ — Bangladeshi journalists face 10-year jail terms for “unverified” reporting under draft cybercrime law

সাংবাদিক ও মিডিয়া অংশীজনদের বক্তব্য

১০ সেপ্টেম্বরের stakeholder consultation-এ বিভিন্ন সম্পাদক, সাংবাদিক ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। The Daily Star-এর প্রতিবেদনে তাঁদের কয়েকজনের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

কামাল আহমেদ — The Daily Star: – তিনি বলেন, আইন যত কঠোরই হোক, অপব্যবহার হলে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে misuse ঠেকানোর ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উঠে আসে।

সাজ্জাদ শরীফ — Prothom Alo:- তিনি প্রস্তাবিত ধারা ২৫ ও ২৬ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানহানিকে গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা বিষয়টিকে আরও জটিল করতে পারে।

মাসুমুর রহমান খলিলী — Naya Diganta:- তিনি ধারা ৮(২)-এ রাষ্ট্রকে অবমাননাকর বক্তব্যসংক্রান্ত বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক নেতারা যে ধরনের শব্দ বা বক্তব্য ব্যবহার করেন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও যদি একই বিধান প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সাংবাদিকরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

জুবায়ের বাবু — Somoy Television:- তিনি Meta-কে বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়ে মত দেন।

এম আবদুল্লাহ — Amar Desh: – তিনি Digital Security Act-এর anti-media বিধানের কিছু বিষয় নতুন খসড়ায় ফিরে আসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।The Daily Star — Proposed changes to cyber law: Press warns of anti-media provisions

গুরুত্বপূর্ণ: উপরোক্ত ব্যক্তিরা consultation meeting-এ বক্তব্য দিয়েছেন। এটিকে তাঁদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়া হবে না, যদি না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পৃথকভাবে একই অবস্থান প্রকাশ করে।

বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন অগ্রাধিকার:- উৎসগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, খসড়াটি নিয়ে আলোচনায় বিভিন্ন পক্ষ একই বিষয়কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিয়েছে।

সরকারি বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে—

  • cybercrime ও cybersecurity;
  • online harassment ও cyberbullying;
  • সামাজিক শৃঙ্খলা;
  • অনলাইনে ক্ষতিকর বা অশালীন কনটেন্ট মোকাবিলা;
  • এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা।

অন্যদিকে TIB, BLAST ও CPJ-এর বক্তব্যে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—

    • অপরাধের সংজ্ঞার স্পষ্টতা;
    • অপব্যবহারের ঝুঁকি;
    • মতপ্রকাশের পরিসর;
    • সাংবাদিকতার স্বাধীনতা;

সাংবাদিক ও মিডিয়া অংশীজনদের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে আইনটি বাস্তবে প্রয়োগ হলে newsroom, সাংবাদিক এবং সংবাদপ্রকাশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—সে প্রশ্ন।

আইনি মানদণ্ড কী?

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর খসড়ায় কোনো বিধান মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা বা তথ্যপ্রবাহকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে—তা মূল্যায়নের জন্য তিনটি আইনি কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ:  বাংলাদেশের সংবিধানের Article 39 → ICCPR Article 19 → General Comment No. 34।

এখানে লক্ষ্য হবে খসড়াটিকে রাজনৈতিকভাবে ভালো বা খারাপ বলা নয়; বরং কোনো সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা পরীক্ষা করা।

১. বাংলাদেশের সংবিধান: Article 39: – বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৯(২)-এ নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সংবিধান নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থে আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের সুযোগ রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনা।

অতএব Article 39-এর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হয়: কোন অধিকার সুরক্ষিত? এবং কোন সীমাবদ্ধতা আইনসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধান — Article 39

২. ICCPR Article 19:- বাংলাদেশ ৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ তারিখে ICCPR-এ accession করে। UN Treaty Collection অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য চুক্তিটি ৬ ডিসেম্বর ২০০০ থেকে কার্যকর হয়। ICCPR Article 19 তিনটি বিষয় আলাদা করে:

  • মতামত ধারণের স্বাধীনতা;
  • মতপ্রকাশের স্বাধীনতা;
  • তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকার।

এই সুরক্ষা অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। Human Rights Committee-এর General Comment No. 34-এ journalism, public affairs নিয়ে commentary, human rights নিয়ে আলোচনা ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে Article 19-এর সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। OHCHR — International Covenant on Civil and Political Rights

৩. মতপ্রকাশ সীমিত করার মূল আইনি পরীক্ষা:- ICCPR Article 19(3) অনুযায়ী মতপ্রকাশের ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা বৈধ হওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে পরীক্ষা করতে হয়।

(ক)আইনে নির্ধারিত কি না- Restriction-এর পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে।

(খ) বৈধ উদ্দেশ্য আছে কি না- Article 19(3) নির্দিষ্ট বৈধ উদ্দেশ্যের কথা বলে—যেমন অন্যের অধিকার বা সুনাম রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য বা নৈতিকতা রক্ষা।

(গ) প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক কি না- শুধু বৈধ উদ্দেশ্য থাকলেই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট restriction-টি সেই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় হতে হবে এবং ব্যবস্থাটি তার উদ্দেশ্যের তুলনায় অতিরিক্ত বিস্তৃত বা অধিক হস্তক্ষেপকারী হওয়া উচিত নয়।

Human Rights Committee-এর General Comment No. 34 অনুযায়ী restriction-এর সঙ্গে যে নির্দিষ্ট প্রয়োজনের ভিত্তিতে তা আরোপ করা হচ্ছে, তার সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হবে। Committee necessity ও proportionality-এর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।

সুতরাং Article 19(3)-এর মূল কাঠামোকে চারটি স্বাধীন শর্ত হিসেবে না লিখে—“আইনগত ভিত্তি + বৈধ উদ্দেশ্য + প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা”—এইভাবে উপস্থাপন করা বেশি নির্ভুল।

৪. আইনের ভাষা স্পষ্ট কি না:- “আইনে নির্ধারিত” হওয়ার প্রশ্নটি শুধু কোনো বিধান আইনে লেখা আছে কি না—এতটুকু নয়। মানুষকে যুক্তিসঙ্গতভাবে বুঝতে পারার সুযোগ থাকতে হবে—

তাই “গুজব”, “অপতথ্য”, “হেয়প্রতিপন্ন”, “বুলিং” বা অনুরূপ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু উদ্দেশ্য নয়, সংজ্ঞা, উপাদান এবং প্রয়োগের সীমাও গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে, যেখানে অসম্পূর্ণ তথ্য, ভুল তথ্য এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য এক বিষয় নয়।

৫. সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মানদণ্ডটির গুরুত্ব:- General Comment No. 34 অনুযায়ী Article 19-এর সুরক্ষার মধ্যে journalism রয়েছে। তথ্য ও ধারণা সংগ্রহ, গ্রহণ এবং প্রকাশ করাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ। তাই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আইন বিশ্লেষণের সময় শুধু প্রকাশিত বক্তব্য নয়, বরং—

তথ্য সংগ্রহ → যাচাই → প্রকাশ → সংশোধন/জবাবের সুযোগ —এই পুরো প্রক্রিয়ার ওপর বিধানের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে General Comment No. 34-এর আলোচনায় সাংবাদিকতা ও public-interest information-এর গুরুত্ব আলাদাভাবে উঠে এসেছে।

৬. মানহানি ও জনস্বার্থের বক্তব্য:- ICCPR Article 19(3) অন্যের অধিকার বা সুনাম রক্ষাকে একটি বৈধ উদ্দেশ্য হিসেবে স্বীকার করে। তবে কোনো বক্তব্য মানহানির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেই restriction স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। সেই restriction-এর আইনগত ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে জনস্বার্থের বিষয়ে সমালোচনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বক্তব্যের প্রকৃতি, তথ্যের ভিত্তি এবং সম্ভাব্য ক্ষতির সম্পর্ক বিবেচনা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ—

মানহানি একটি বৈধ আইনি বিষয় হতে পারে; কিন্তু মানহানির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো restriction-ও আইনি পরীক্ষার বাইরে নয়।

৭. Blocking বা content removal-এর ক্ষেত্রেও একই পরীক্ষা:- কোনো অনলাইন কনটেন্ট remove বা block করার ক্ষমতা থাকলেই আইনি বিশ্লেষণ শেষ হয় না। দেখতে হবে—

  • কোন কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে;
  • কোন বৈধ উদ্দেশ্যে;
  • নির্দিষ্ট ক্ষতির সঙ্গে ব্যবস্থাটির সম্পর্ক আছে কি না;
  • ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক কি না;
  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত ভিত্তি কতটা স্পষ্ট;
  • এবং আক্রান্ত ব্যক্তির কার্যকর review বা remedy-এর সুযোগ আছে কি না।

কারণ Article 19 তথ্য seek, receive and impart করার অধিকারও সুরক্ষিত করে।

৮. Remedy: আইনি পরীক্ষার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ safeguard:- Remedy-কে Article 19(3)-এর পৃথক চতুর্থ শর্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে মতপ্রকাশ সীমিত করার ক্ষেত্রে procedural safeguard এবং কার্যকর প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ। কোনো content block, removal, investigation বা অন্য কোনো restrictive action ভুলভাবে প্রয়োগ হলে—

  • সিদ্ধান্তটি কে পর্যালোচনা করবে;
  • কত দ্রুত পর্যালোচনা হবে;
  • আক্রান্ত ব্যক্তি কীভাবে আপত্তি জানাবেন;
  • এবং প্রয়োজন হলে কীভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে— এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

৯. আইনি পরীক্ষার কাঠামো

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর খসড়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধারাকে পরবর্তী অংশে আমরা এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষা করব:

Legal Test / Safeguard মূল প্রশ্ন
Legal basis বিধানটির আইনগত ভিত্তি কি যথেষ্ট স্পষ্ট?
Legitimate aim কোন বৈধ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য restriction করা হচ্ছে?
Necessity ওই উদ্দেশ্যে restriction-টি প্রয়োজনীয় কি?
Proportionality ব্যবস্থাটি কি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বিস্তৃত বা অধিক হস্তক্ষেপকারী?
Remedy / Review আক্রান্ত ব্যক্তির কার্যকর review বা প্রতিকারের সুযোগ আছে কি?

এখানে প্রথম চারটি প্রশ্ন Article 39 ও ICCPR Article 19-এর substantive legal scrutiny-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। Remedy / Review হলো প্রয়োগের procedural safeguard, যা আলাদাভাবে নথিবদ্ধ করা হবে।

সারকথা:- 

Article 39 আমাদের বলে—মতপ্রকাশ ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা সুরক্ষিত, তবে নির্দিষ্ট স্বার্থে আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের সুযোগ আছে।

ICCPR Article 19 বলে—মতপ্রকাশের মধ্যে তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং প্রকাশ করার অধিকারও রয়েছে। বাংলাদেশ ২০০০ সালে ICCPR-এর পক্ষভুক্ত হয়েছে।

আর General Comment No. 34 দেখায়—কোনো restriction থাকলেই তা যথেষ্ট নয়; তার আইনি ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা পরীক্ষা করতে হবে। সাংবাদিকতা ও public-interest information-এর ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষা প্রযোজ্য।

এই মানদণ্ড খসড়ার কোন ধারায় কীভাবে প্রযোজ্য?

উপরের আইনি মানদণ্ডগুলো সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর খসড়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রাসঙ্গিক।

ধারা প্রধান বিষয় প্রাসঙ্গিক Legal Test মূল প্রশ্ন
৮ Content removal/blocking Necessity + Remedy কোন পরিস্থিতিতে এবং কতটুকু blocking করা যাবে?
২৫ Defamation/Demeaning/Bullying Legal certainty + Proportionality বৈধ সমালোচনা ও অপরাধের সীমা কতটা স্পষ্ট?
২৬ক Rumour/Misinformation Legal certainty + Proportionality Unverified, false ও intentional misinformation-এর পার্থক্য স্পষ্ট কি?
২৯ Institutional liability Proportionality + Remedy ব্যক্তির কাজের দায় কীভাবে প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর প্রযোজ্য হবে?
৩৪ Search/Seizure Necessity + Proportionality তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় safeguards কী?
৩৬ Data preservation Necessity + Proportionality কত ধরনের data, কত সময় এবং কোন উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করা হবে?
৪০–৪২ Investigation/Trial/Appeal Remedy কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনা ও প্রতিকারের সুযোগ কী?
৪৯ Rule-making Legal basis + Legal certainty গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার সীমা মূল আইনে কতটা স্পষ্ট?

এই প্রয়োগে বিশেষভাবে দেখা প্রয়োজন—আইনের ভাষা কতটা স্পষ্ট, ক্ষমতার প্রয়োগের সীমা কী, এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কার্যকর প্রতিকারের সুযোগ কতটা রয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের আইন — সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬

২. সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬

৩. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ — ২০২৬ সালের সংশোধনী খসড়া নিয়ে সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি

৪. বাংলাদেশের সংবিধান — Article 39: Freedom of Thought and Conscience, and of Speech

৫. International Covenant on Civil and Political Rights — Article 19

৬. UN Human Rights Committee — General Comment No. 34: Article 19
এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা এবং Article 19(3)-এর restriction framework নিয়ে জাতিসংঘের ব্যাখ্যা রয়েছে।

৭. Transparency International Bangladesh (TIB) — Draft Cyber Security Act নিয়ে বক্তব্য

৮. BLAST — Draft Cyber Security (Amendment) Act, 2026

৯. Committee to Protect Journalists (CPJ) — Draft law and journalists

১০. The Daily Star — Proposed changes to cyber law
১১. BSS — Govt has no intention to muzzle press freedom through proposed Cyber Security Act

১২. Digital Security Act, 2018 — Bangladesh Laws

১৩. Cyber Security Ordinance, 2025 — Bangladesh Laws

১৪. Information and Communication Technology Act, 2006


সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্য: আব্বাসীকে আইনি নোটিশ
আইন ও অধিকার

সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্য: আব্বাসীকে আইনি নোটিশ

সাংবাদিকদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও তাঁদের পেটানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ইসলামী বক্তা ড. সৈয়দ মুহাম্মদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে

বিস্তারিত »
আমাদের হাত বাঁধলে ক্ষতি সরকারেরই
আইন ও অধিকার

আমাদের হাত বাঁধলে ক্ষতি সরকারেরই

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করলে শেষ পর্যন্ত সরকারেরই ক্ষতি হবে বলে মন্তব্য করেছেন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান

বিস্তারিত »
হেইট স্পিচ কখন অপরাধ? রাবাতের ৬ মানদণ্ড
আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড

হেইট স্পিচ কখন অপরাধ? রাবাতের ৬ মানদণ্ড

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো, তাদের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা কিংবা তাদের ওপর হামলার আহ্বান জানানো বৈষম্য, ভয়ভীতি ও

বিস্তারিত »
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে অধিকার, সীমা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে অধিকার, সীমা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের কথা বলার অধিকার নয়। এর মধ্যে মতামত ধারণ, তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকারও

বিস্তারিত »
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
বাংলাদেশর আইন

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

অ্যাডভোকেট মানিক আকবর, আইনজীবী ও সাংবাদিক। ভূমিকা: বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের

বিস্তারিত »
সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের উদ্বেগ, সংশোধনে বিশেষজ্ঞ কমিটি
আইন ও অধিকার

সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের উদ্বেগ, সংশোধনে বিশেষজ্ঞ কমিটি

প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে সরকার। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত

বিস্তারিত »