বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ইতিহাস লিখতে গেলে কিছু মানুষের নাম শুধু তাঁদের কর্মস্থল দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের জীবন জড়িয়ে থাকে একটি সময়ের সঙ্গে। শাহেদ কামাল ছিলেন তেমনই একজন। তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পূর্ব পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের পরিসর ছিল ভিন্ন। দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। সাংবাদিকতার পেশায় তাঁর প্রবেশ ১৯৫৭ সালে। এরপর পেরিয়ে গেছে ছয় দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। আবার শিক্ষক হিসেবে তৈরি করেছেন সাংবাদিকতার নতুন প্রজন্ম।
সাংবাদিকতার শুরু পাকিস্তান আমলে
শাহেদ কামাল ১৯৫৭ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের শুরু তৎকালীন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি)-এ। পাকিস্তান আমলের সেই সময় থেকে শুরু হওয়া তাঁর পেশাগত জীবন স্বাধীনতার পরও অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এ যোগ দেন। সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করেন। একসময় তিনি বাসসের বার্তা সম্পাদক এবং পরে প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একজন সংবাদসম্পাদক হিসেবে তাঁর কাজ ছিল শুধু সংবাদ সম্পাদনা করা নয়। সংবাদ যাচাই, গুরুত্ব নির্ধারণ, ভাষা ও উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে একটি সংবাদ কীভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছাবে, তার সঙ্গে সম্পাদকের ভূমিকা সরাসরি যুক্ত। শাহেদ কামালের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন সেই সম্পাদকীয় দায়িত্বেরই একটি বড় অধ্যায়।
একটি পরিবর্তনশীল সময়ের সাংবাদিক
১৯৫৭ সালে সাংবাদিকতায় প্রবেশের অর্থ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরিবর্তনের সময়কে খুব কাছ থেকে দেখা। পাকিস্তান আমল। ভাষা আন্দোলনের পরের সময়। স্বায়ত্তশাসনের দাবি। মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এরপর নতুন রাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের বিকাশ। শাহেদ কামালের সাংবাদিকতা জীবন এই দীর্ঘ সময়কে অতিক্রম করেছে।
২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননা গ্রহণের সময় নিজের সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান আমল শেষ হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। তাঁর এই স্মৃতিচারণ একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি একটি সময়ের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসেরও অংশ।
সাংবাদিকতা থেকে সাংবাদিকতা শিক্ষায়
শাহেদ কামালের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন। পরে বিভাগটির নাম হয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি সেখানে পড়িয়েছেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরবর্তীতে দেশের সাংবাদিকতা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
এখানেই শাহেদ কামালের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। তিনি শুধু নিজে সাংবাদিকতা করেননি। সাংবাদিকতার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। একজন পেশাদার সাংবাদিকের newsroom experience যখন শ্রেণিকক্ষে যায়, তখন শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরের সাংবাদিকতার বাস্তব অভিজ্ঞতাও জানতে পারে। শাহেদ কামালের দীর্ঘ শিক্ষকতা সেই অর্থে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার ইতিহাসেরও অংশ।
‘হাঁটাচলা করা সাংবাদিকতার এনসাইক্লোপিডিয়া’
তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে শাহেদ কামালের জ্ঞানভাণ্ডারের কথা বারবার উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে সাংবাদিক মুন্নী সাহা তাঁকে নিজের ‘স্পিরিচুয়াল ফাদার’ হিসেবে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, শাহেদ কামালের কাছ থেকে অনেক শিক্ষার্থী সাংবাদিকতা ও জীবন সম্পর্কে শিখেছেন।
আরেকটি স্মৃতিচারণে তাঁকে সাংবাদিকতার ‘walking encyclopedia’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর জ্ঞান শুধু সাংবাদিকতার বই বা সংবাদকক্ষের অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ধ্রুপদী সংগীত, চারুকলা, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কেও তাঁর গভীর আগ্রহ ও জ্ঞান ছিল। এই বহুমাত্রিক জ্ঞান তাঁকে একজন আলাদা ধরনের শিক্ষকও করে তুলেছিল।
সাংবাদিকতা শিক্ষায় আজীবন সম্মাননা
শাহেদ কামালের সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকতা শিক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি আসে ২০১৭ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পাদক আবদুস সালাম স্মারক ট্রাস্ট ফান্ড তাঁকে আজীবন সম্মাননা দেয়। সাংবাদিকতার চর্চা এবং শিক্ষায় অবদানের জন্য তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এটি শুধু তাঁর সংবাদকর্মী হিসেবে অবদানকে নয়, সাংবাদিকতা শিক্ষায় তাঁর দীর্ঘ ভূমিকারও স্বীকৃতি ছিল।
সুফিয়া কামালের ছেলে শাহেদ কামাল
শাহেদ কামালের পরিচয়ের সঙ্গে তাঁর মা কবি সুফিয়া কামালের নাম গভীরভাবে যুক্ত। তিনি ছিলেন সুফিয়া কামালের বড় ছেলে। ফলে তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার পরিবেশও ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ। সুফিয়া কামাল শুধু কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন নারী অধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সেই পরিবারের পরিবেশ শাহেদ কামালের চিন্তা ও আগ্রহের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল বলে তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর বোনদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল এবং শিল্পী সাঈদা কামাল। শাহেদ কামাল ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ।
‘সাঁঝের মায়া’: একটি সাংস্কৃতিক পরিসর
শাহেদ কামালের পারিবারিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধানমন্ডির ‘সাঁঝের মায়া’। এটি ছিল তাঁর মা সুফিয়া কামালের বাসভবন। শাহেদ কামালের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ সেখানে রাখা হয়। স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা সেখানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। একটি স্মৃতিচারণে ‘সাঁঝের মায়া’কে টিকাটুলির পুরোনো সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে শাহেদ কামালকে সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে। এই পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর জীবনকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শাহেদ কামালের আগ্রহ ছিল শুধু সংবাদে নয়। সাহিত্য, শিল্প, সংগীত এবং ইতিহাসেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা
শাহেদ কামাল বাংলাদেশের স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি স্কাউট আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর কর্মজীবন কেবল সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজ ও তরুণদের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠনেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অবিবাহিত
শাহেদ কামাল আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর ভাইবোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। তাঁর জীবিত দুই বোন ও এক ভাইয়ের কথা সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনকে খুব বেশি নিজেকে জনসমক্ষে না এনে তিনি মূলত নিজের কাজের মধ্যেই ছিলেন। সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, পাঠ ও সংস্কৃতিচর্চাই ছিল তাঁর দীর্ঘ জীবনের বড় অংশ।
জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ
শাহেদ কামালের ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর বিস্তৃত পাঠ ও সাংস্কৃতিক আগ্রহ। ধ্রুপদী সংগীত, চারুকলা, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল বলে মৃত্যুর পর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন সাংবাদিকের জন্য এই ধরনের বিস্তৃত আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতা শুধু তথ্য সংগ্রহের পেশা নয়। সমাজ, মানুষ, ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝারও একটি পথ। শাহেদ কামালের দীর্ঘ কর্মজীবনে এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ ছিল।
শেষ বিদায়
৪ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর সিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহেদ কামালের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরদিন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। সেখানে তাঁর সহকর্মী, শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর জাতীয় প্রেসক্লাবেও তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিকেলে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর মা সুফিয়া কামালের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
একটি দীর্ঘ জীবন যেন শেষ পর্যন্ত ফিরে গেল নিজের শিকড়ে। মায়ের পাশে।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর ছাত্রদের মধ্যে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এবং সংবাদপেশার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের স্মৃতিতে তাঁর সেই দীর্ঘ পথচলা থেকে যাবে।
FoEBD গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক, শিক্ষক ও সাংবাদিকতা শিক্ষার নিবেদিত কর্মী শাহেদ কামালকে স্মরণ করছে।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো — আজীবন সম্মাননা পাওয়া শাহেদ কামাল
- বিডিনিউজ২৪ — সাংবাদিক-শিক্ষক শাহেদ কামালের মৃত্যু
- বিডিনিউজ২৪ — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ শ্রদ্ধা
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) — শাহেদ কামালের মৃত্যু ও কর্মজীবন
- দ্য ডেইলি স্টার — Veteran journalist and educator Shahed Kamal dies
- এনটিভি — শাহেদ কামালের জীবন ও কর্মজীবন





