একজন সাংবাদিক প্রতিদিন অন্য মানুষের গল্প লেখেন। অন্যায়, দুর্নীতি, সহিংসতা, মানুষের কষ্ট এবং জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনেন। কিন্তু সেই সাংবাদিক নিজেই যখন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, পেশাগত অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা মানসিক চাপে পড়েন—তখন তাঁকে ধরে রাখার ব্যবস্থা কোথায়?
বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বরিশালে দৈনিক সমকালের কার্যালয় থেকে পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ছিলেন ৫৭ বছর বয়সী সাংবাদিক, সমকালের বরিশাল ব্যুরোর সাবেক প্রধান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ঘটনার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর রেখে যাওয়া পাঁচটি চিরকুটের তথ্য প্রকাশিত হয়।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা এবং চাকরি হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথাও এসেছে।
কিন্তু FOEBD-এর হাতে থাকা তাঁর পাঁচটি মূল হাতে লেখা চিরকুট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। চিরকুটগুলোতে দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা, পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং পাওনা অর্থের মতো একাধিক বিষয় উঠে এসেছে। তাই এই মৃত্যুর জন্য একটি মাত্র কারণ নির্ধারণ করা দায়িত্বশীল হবে না।
বরং প্রশ্নটি আরও বড়:- একজন সাংবাদিক ভেঙে পড়ার আগেই তাঁকে ধরে রাখার ব্যবস্থা কি আমাদের সংবাদমাধ্যমে আছে?
পাঁচটি চিরকুটে কী লিখে গেছেন পুলক?
FOEBD-এর হাতে থাকা পাঁচটি মূল হাতে লেখা চিরকুট সরাসরি পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাঁচটির মধ্যে তিনটিতে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ লেখা রয়েছে। অন্য দুটি—জাকির ও সুমনের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে—কোনো তারিখ লেখা নেই।
চিঠিগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত বক্তব্য প্রকাশ করছে না FOEBD। তবে সাংবাদিকতার স্বার্থে প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে।
একটি চিরকুটে দীর্ঘ অসুস্থতার কথা- একটি চিরকুটের ওপরে ‘সুইসাইড নোট’ লেখা রয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা ও যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে। সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসার চেষ্টা এবং ভারতের ভেলোরে চিকিৎসা নেওয়ার কথাও রয়েছে। চিরকুটটিতে মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার কথা এবং পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের অনুরোধ রয়েছে। চিরকুটটির কোনো নির্দিষ্ট প্রাপক উল্লেখ নেই। এর বিষয়বস্তু দেখে এটি প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা হয়ে থাকতে পারে। তবে FOEBD এ বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করছে না।
এই নথির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পুলক নিজেই দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা ও যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি, একটি চিরকুটে কোনো একটি বিষয় উল্লেখ থাকলেই সেটিকে মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে চিরকুট- আরেকটি চিরকুটে স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশে বিদায়ের কথা রয়েছে। মেয়েকে পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। স্ত্রীকে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এই চিরকুটে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ স্পষ্ট।
ভাইয়ের উদ্দেশে চিরকুট- ভাই দীপকের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে স্ত্রী ও মেয়ের দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ রয়েছে। এতে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং আর্থিক বিষয় তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিল।
জাকিরের উদ্দেশে চিরকুট- জাকিরের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে পরিবারের খোঁজ রাখার অনুরোধ রয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং প্রশাসনিক জটিলতা না হওয়ার বিষয়েও ব্যক্তিগত অনুরোধ করা হয়েছে। চিরকুটটিতে কোনো তারিখ লেখা নেই। তবে ময়নাতদন্তের বিষয়ে তাঁর নিজের একটি মতামত ছিল। এটি তাঁর ব্যক্তিগত অনুরোধ। ময়নাতদন্ত হবে কি না বা তদন্তের কী ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়।
সুমনের উদ্দেশে চিরকুট- সহকর্মী সুমনের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার কথা উল্লেখ করে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেখানে সমকালের কাছে তাঁর পাওনা অর্থ আদায় করে তাঁর স্ত্রীর হাতে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। চিরকুটটিতে কোনো তারিখ লেখা নেই।
এটি থেকে বলা যায়, পাওনা অর্থের বিষয়টি মৃত্যুর আগের সময়েও তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিল। কিন্তু এই চিরকুট থেকে বলা যায় না যে সমকালের কাছে পাওনা টাকা, চাকরি হারানো বা আর্থিক সংকটই তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।
পাঁচটি চিরকুট একসঙ্গে দেখলে বরং একাধিক ব্যক্তিগত, শারীরিক, পারিবারিক ও আর্থিক উদ্বেগের চিত্র পাওয়া যায়।
সাংবাদিকদের আত্মহত্যা কি বেশি?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা কি অন্য পেশার তুলনায় বেশি? বাংলাদেশের সাংবাদিকদের আত্মহত্যার হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি—এমন নির্ভরযোগ্য জাতীয় তুলনামূলক তথ্য FOEBD-এর হাতে নেই।
তাই এই প্রতিবেদন এমন কোনো দাবি করছে না। বরং আমরা অন্য একটি প্রশ্ন অনুসরণ করছি:
সাংবাদিকতার পেশায় কী ধরনের চাপ ও ঝুঁকি সাংবাদিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চাকরির নিরাপত্তা, বেতন, কর্মপরিবেশ, সহিংসতা, হুমকি, পেশাগত চাপ এবং ট্রমার দিকে তাকাতে হয়।
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য: গবেষণায় কী পাওয়া যাচ্ছে?
বাংলাদেশি মাঠসাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। Md Raisul Islam ও Muhammad Anwarus Salam-এর গবেষণায় ১০০ জন সাংবাদিকের survey এবং ১৫ জন সাংবাদিকের গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণায়—
- ১০ শতাংশ সাংবাদিকের মধ্যে সম্ভাব্য PTSD-এর লক্ষণ পাওয়া যায়;
- ১৫ শতাংশের মধ্যে মাঝারি থেকে গুরুতর বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া যায়;
- ২০ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগের লক্ষণ পাওয়া যায়;
- ৩০ শতাংশের মধ্যে উচ্চমাত্রার burnout পাওয়া যায়;
- ৬৫ শতাংশের মধ্যে অন্তত মৃদু depressive symptoms পাওয়া যায়।
গবেষণাটিতে সাংবাদিকদের পেশাগত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়ার অভিজ্ঞতাও সীমিত বলে উঠে এসেছে।
তবে এই গবেষণার সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় জরিপ নয়। নির্দিষ্ট একটি নমুনার মাঠসাংবাদিকদের নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। তাই এসব সংখ্যাকে বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির জাতীয় হার হিসেবে দেখা যাবে না।
তবু গবেষণাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে: সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যকে পেশাগত নিরাপত্তার আলোচনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই।
২০২৩ সালেই উঠে এসেছিল চাকরি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে ২০২৩ সালে Article 19 Bangladesh and South Asia এবং Free Press Unlimited-এর যৌথ উদ্যোগে একটি গোলটেবিল আলোচনা হয়েছিল।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে সাংবাদিকদের বেতন বিলম্ব, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, ভয়ভিত্তিক কর্মপরিবেশ, insurance-এর অভাব এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ উঠে আসে।
তখনও প্রশ্নগুলো ছিল—
- সাংবাদিক চাকরি হারালে কী হবে?
- বেতন সময়মতো না পেলে কী হবে?
- কাজের কারণে আহত বা অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা কী?
- সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের জন্য insurance কতটা কার্যকর?
- হুমকি বা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে প্রতিষ্ঠান কী করবে?
তিন বছর পর পুলক চ্যাটার্জির পাঁচটি চিরকুটের সামনে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নগুলো আবার ফিরে আসে।
চাকরির নিরাপত্তা কি শুধু বেতনের প্রশ্ন?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি, আটক ও চাকরি হারানোর ঘটনাও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৪৭৬টি ঘটনায় ১ হাজার ৭৩ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলা, মামলা, হত্যা, হুমকি, হয়রানি, আটক ও চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চাকরিচ্যুতি বা চাকরি থেকে অব্যাহতির ঘটনাও ছিল।
এই বাস্তবতা দেখায়, সাংবাদিকের নিরাপত্তা কেবল মাঠে হামলা থেকে বাঁচার বিষয় নয়। চাকরির নিরাপত্তা একজন সাংবাদিকের— পরিবারের আর্থিক স্থিতি, চিকিৎসার সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে:
চাকরি হারানো মানেই মানসিক বিপর্যয় নয়। আবার মানসিক বিপর্যয়ের কারণও শুধু চাকরি হারানো নয়।
প্রতিটি ঘটনার পেছনে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিস্থিতি আলাদা। পুলক চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেও তাই একটি মাত্র কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সাংবাদিকতার অদৃশ্য ঝুঁকি: ট্রমা
সাংবাদিকরা নিয়মিত এমন ঘটনা কাভার করেন, যা সাধারণ মানুষ হয়তো জীবনে একবারও প্রত্যক্ষ করেন না। হত্যা, দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সহিংসতা, দুর্যোগ, নির্যাতন, সংঘর্ষ কিংবা মৃত্যুর ঘটনা তাঁদের কাজের অংশ হয়ে যেতে পারে। একই সাংবাদিক বছরের পর বছর এসব ঘটনা কাভার করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় সাংবাদিকতার এই repeated exposure-এর সঙ্গে PTSD, anxiety, depression এবং burnout নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে।
অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
UNESCO-সমর্থিত গবেষণায় সাংবাদিকদের অনলাইন সহিংসতার মানসিক প্রভাবের পাশাপাশি self-censorship, নির্দিষ্ট beat এড়িয়ে চলা এবং পেশা থেকে সরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। অর্থাৎ অনলাইন হামলা শুধু অনলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর প্রভাব একজন সাংবাদিকের মানসিক স্বাস্থ্য এবং পেশাগত সিদ্ধান্তেও পড়তে পারে। এখানেই মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
সাংবাদিক চুপ করে গেলে ক্ষতি শুধু তাঁর নয়
সাংবাদিকের ওপর চাপের ফল সবসময় চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা আত্মহত্যা নয়। কখনও ফল হয় আরও নীরব। একজন সাংবাদিক কোনো সংবেদনশীল beat-এ যাওয়া বন্ধ করেন। কেউ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কমিয়ে দেন। কেউ অনলাইনে নিজের মত প্রকাশ কমিয়ে দেন। কেউ হুমকির কারণে self-censorship করেন। কেউ শেষ পর্যন্ত পেশা ছেড়ে দেন।
এসব সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে সাংবাদিকদের ওপর অনলাইন ও অফলাইন চাপ যখন তাঁদের কাজের পরিধি সংকুচিত করে, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে থাকে না। এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতারও বিষয়।
২০২৩ থেকে ২০২৬: প্রশ্নগুলো কি বদলেছে?
গত কয়েক বছরের তথ্য ও ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
২০২৩- সাংবাদিকদের বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, insurance এবং safety mechanism নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা।
২০২৪–২০২৫- সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি, আটক ও চাকরি হারানোর ঘটনা। TIB-এর হিসাবে, ১৫ মাসে ১ হাজার ৭৩ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ বা পেশাগত ক্ষতির শিকার হন।
২০২৫- বাংলাদেশি মাঠসাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় PTSD, depression, anxiety এবং burnout-এর উপস্থিতি উঠে আসে।
২০২৬- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এবং তাঁর পাঁচটি ব্যক্তিগত চিরকুট সামনে আসে।
এই ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে রাখলে প্রশ্নটি আর শুধু—
“একজন সাংবাদিক কেন আত্মহত্যা করলেন?” থাকে না।
প্রশ্নটি হয়ে যায়— সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?
সাংবাদিক নিরাপত্তা কি শুধু হামলা থেকে বাঁচানো?
সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করলে সাধারণত আমরা হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, হুমকি কিংবা হত্যার কথা বলি। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপত্তার আরও কিছু স্তর রয়েছে:
শারীরিক নিরাপত্তা। মানসিক নিরাপত্তা। চাকরির নিরাপত্তা। আর্থিক নিরাপত্তা। চিকিৎসার নিরাপত্তা। ডিজিটাল নিরাপত্তা। আইনি সহায়তা।
একজন সাংবাদিক মাঠে নিরাপদ থাকলেন, কিন্তু তাঁর বেতন নিয়মিত নয়—তাহলে তিনি কতটা নিরাপদ?
একজন সাংবাদিকের ওপর অনলাইন হামলা হলো, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বলল, “এগুলো তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপার”—তাহলে তিনি কতটা নিরাপদ?
একজন সাংবাদিক দীর্ঘদিন ভয়াবহ ঘটনা কাভার করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেন, কিন্তু কাউকে বলার জায়গা নেই—তাহলে তিনি কতটা নিরাপদ?
এই প্রশ্নগুলো এখন সংবাদমাধ্যমের নীতিনির্ধারণের অংশ হওয়া দরকার।
কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন?
FOEBD-এর এই অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
১. গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা- বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য confidential counselling বা referral ব্যবস্থা প্রয়োজন।
২. Trauma-informed newsroom policy- হত্যা, দুর্ঘটনা, দুর্যোগ, সহিংসতা বা অন্যান্য ভয়াবহ ঘটনা কাভার করা সাংবাদিকদের assignment-এর পর প্রয়োজন অনুযায়ী psychosocial check-in-এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৩. লিখিত চাকরির শর্ত- নিয়োগ, বেতন, ছুটি, চিকিৎসা, ছাঁটাই এবং পাওনা পরিশোধের নিয়ম লিখিত থাকা প্রয়োজন।
৪. পাওনা অর্থ দ্রুত পরিশোধ- সাংবাদিকের শ্রমের বিনিময়ে পাওনা অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকা উচিত নয়।
পুলক চ্যাটার্জির একটি চিরকুটে সমকালের কাছে তাঁর পাওনা অর্থের বিষয়টি ছিল। এটি অন্তত মনে করিয়ে দেয়—পেশাগত পাওনা একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত উদ্বেগের অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে এটিকে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কোনো ভিত্তি নেই।
৫. স্বাস্থ্য ও insurance- শুধু দুর্ঘটনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ও সাংবাদিক কল্যাণনীতিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৬. সাংবাদিক সংগঠনের mental-health support- প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো confidential referral বা counselling network তৈরি করতে পারে।
৭. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা- ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে চাকরির অনিশ্চয়তা, কম বেতন, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি এবং নিরাপত্তার সমস্যা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৮. অনলাইন হয়রানিকে বাস্তব নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা- অনলাইন হুমকি বা হয়রানি শুধু ভার্চুয়াল সমস্যা নয়। এর মানসিক ও পেশাগত প্রভাব বাস্তব।
সাংবাদিকদের ওপর অনলাইন সহিংসতার প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও self-censorship এবং পেশা থেকে সরে যাওয়ার মতো বিষয় উঠে এসেছে।
একজন সাংবাদিক সাহায্য চাইলে তাঁকে দুর্বল ভাবা যাবে না
সাংবাদিকতার পেশায় একটি ধারণা অনেক সময় কাজ করে—চাপ সহ্য করাই পেশার অংশ। কিন্তু সব চাপ সহ্য করার ক্ষমতা অসীম নয়। একজন সাংবাদিক মানসিক সহায়তা চাইলে তিনি দুর্বল নন। বরং দীর্ঘ সময় পেশায় টিকে থাকার জন্য সাহায্য নেওয়া তাঁর দায়িত্বশীলতার অংশ হতে পারে। সংবাদমাধ্যমের নীতিতেও এই পরিবর্তন দরকার।
“তুমি সাংবাদিক—তোমাকে সব সহ্য করতেই হবে”—এর বদলে প্রয়োজন— “তুমি সাংবাদিক—তাই তোমার নিরাপত্তার দায়িত্বও আমাদের।”
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু থেকে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলবে।
তাঁর পাঁচটি চিরকুট থেকে একটি মাত্র কারণ নির্ধারণ করা যাবে না। তাঁর নিজের একটি চিরকুটে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও শারীরিক যন্ত্রণার কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে চাকরি হারানোর পর তাঁর মানসিক কষ্টের কথাও এসেছে। আবার একটি চিরকুটে সমকালের কাছে পাওনা অর্থের বিষয়টি রয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষের জীবনে একই সময়ে একাধিক বাস্তব চাপ থাকতে পারে। এই কারণেই পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে দায়িত্বশীল প্রশ্নটি সম্ভবত শুধু— “কেন তিনি আত্মহত্যা করলেন?” নয়।
বরং প্রশ্ন— তিনি এতটা সংকটে পৌঁছানোর আগেই তাঁর পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা কী ছিল?
শেষ কথা: সাংবাদিকের নিরাপত্তা মানে শুধু মাঠে নিরাপদ থাকা নয়
একজন সাংবাদিককে নিরাপদ রাখার অর্থ শুধু তাঁকে হামলা থেকে রক্ষা করা নয়। তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, চাকরি, বেতন, চিকিৎসা, insurance, আইনি সহায়তা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
২০২৩ সালে সাংবাদিকদের চাকরি, বেতন, insurance ও safety mechanism নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ্যে এসেছিল, ২০২৫ সালের গবেষণায় সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে চিত্র পাওয়া গেছে এবং ২০২৬ সালে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু ও তাঁর পাঁচটি চিরকুট যে ব্যক্তিগত বাস্তবতা সামনে এনেছে—এসব আলাদা আলাদা ঘটনা হলেও এগুলো আমাদের একই জায়গায় ফিরিয়ে আনে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু একটি bulletproof vest নয়। এটি এমন একটি কর্মপরিবেশ, যেখানে একজন সাংবাদিক— অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাবেন; চাকরি হারালে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তায় পড়বেন না; ভয়াবহ assignment-এর পর প্রয়োজন হলে সহায়তা পাবেন; হুমকির মুখে প্রতিষ্ঠানকে পাশে পাবেন; অনলাইন হয়রানিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে; পাওনা অর্থের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না এবং সাহায্য চাইলে তাঁকে দুর্বল বা অযোগ্য মনে করা হবে না।
পুলক চ্যাটার্জির পাঁচটি চিরকুট তাঁর জীবনের শেষ সময়ের কিছু ব্যক্তিগত উদ্বেগ সামনে আনে। কিন্তু সেই চিরকুটের বাইরে আমাদের আরও একটি প্রশ্ন শুনতে হবে—
একজন সাংবাদিক ভেঙে পড়ার পর তাঁকে নিয়ে শোক করার চেয়ে, ভেঙে পড়ার আগেই তাঁকে ধরে রাখার ব্যবস্থা কি আমরা তৈরি করতে পারি না?
সাংবাদিকের মানসিক নিরাপত্তা তাই ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি সাংবাদিক নিরাপত্তার অংশ। আর সাংবাদিক নিরাপত্তা—মতপ্রকাশের স্বাধীনতারও অংশ।
তথ্যসূত্র
১. পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু ও পাঁচটি চিরকুট
- প্রথম আলো — পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু, পাঁচটি চিরকুট এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য।
- NTV Online — পুলক চ্যাটার্জির পাঁচটি চিরকুট এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য।
- FOEBD-এর হাতে থাকা পুলক চ্যাটার্জির পাঁচটি মূল হাতে লেখা চিরকুট — সরাসরি পর্যালোচিত মূল নথি। পাঁচটির মধ্যে তিনটিতে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ রয়েছে; জাকির ও সুমনের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে তারিখ নেই।
২. বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য
- Md Raisul Islam & Muhammad Anwarus Salam, “Mental Health and Coping Among Bangladeshi Field Journalists: A Mixed-Methods Study of Trauma and Resilience,” Informasi, Vol. 55, No. 2 (2025), pp. 173–185.
- DOI: 10.21831/informasi.v55i2.89755
৩. সাংবাদিকদের চাকরি, নিরাপত্তা ও পেশাগত সংকট
- Article 19 Bangladesh and South Asia ও Free Press Unlimited-এর ২০২৩ সালের সাংবাদিকদের insurance ও safety নিয়ে গোলটেবিল আলোচনার সংবাদ প্রতিবেদন।
- Transparency International Bangladesh (TIB)-এর সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি, হয়রানি, আটক ও চাকরি হারানোর বিষয়ে ২০২৫ সালের গবেষণা।
৪. সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও অনলাইন সহিংসতা
- UNESCO/IREX, “The Chilling Effect: Psychosocial Effects of Online Violence on Journalists.”
- UNESCO, “Online Violence is Violence.”
৫. আত্মহত্যা নিয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নির্দেশনা
- World Health Organization (WHO), “Preventing Suicide: A Resource for Media Professionals, Update 2023.”
- WHO, “Interact with media for responsible reporting of suicide.”



