সাংবাদিকের অধিকার জানুন (পর্ব-২)
সাংবাদিক কে? — আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী বলে? সাংবাদিক হতে কি কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রি লাগবে? প্রেস কার্ড থাকতে হবে? কোনো সংবাদমাধ্যমে চাকরি করতে হবে? নাকি সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
ডিজিটাল যুগে এসব প্রশ্নের উত্তর আগের মতো সহজ নয়। আজ সংবাদ শুধু সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা রেডিও থেকে আসে না। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ব্লগ, পডকাস্ট, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তথ্য ও সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাংবাদিক কে—এই ধারণাটি আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে।
সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়
জাতিসংঘের Human Rights Committee-এর General Comment No. 34 এ সাংবাদিকতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ function বা কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়েছে। নথিটিতে বলা হয়েছে, সাংবাদিকতা বিভিন্ন ধরনের মানুষ করতে পারেন। এর মধ্যে আছেন পেশাদার full-time reporter ও analyst, আবার blogger এবং print, internet বা অন্য মাধ্যমে নিজস্বভাবে প্রকাশ করেন—এমন ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন।
সহজভাবে বললে— সাংবাদিকতা শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের পদবি নয়; একজন ব্যক্তি কী ধরনের কাজ করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি সবাই সাংবাদিক?
না।
কেউ Facebook-এ একটি পোস্ট লিখলেই তিনি সাংবাদিক হয়ে যান না। আবার কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন না বলেই কাউকে সাংবাদিকতার কাজ থেকে বাদ দেওয়াও ঠিক নয়।
একজন ব্যক্তি যদি নিয়মিতভাবে— সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেন; বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাই করেন; ঘটনা বা নিদিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধান করেন; প্রতিবেদন বা বিশ্লেষণ তৈরি করেন এবং জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ করেন; তাহলে তার কাজ সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অর্থাৎ পরিচয়ের পাশাপাশি কাজের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ।
Blogger বা online publisher-এর ক্ষেত্রে কী হবে?
এখানেই ডিজিটাল যুগের পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট।
একজন blogger নিজের ওয়েবসাইটে কোনো ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। একজন freelancer বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করতে পারেন। আবার কোনো ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী না হয়েও নিয়মিত জনস্বার্থের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েছে। UN Human Rights Committee স্পষ্টভাবে journalism-এর মধ্যে bloggers এবং self-publishers-এর কথাও উল্লেখ করেছে।
UNESCO-র সাংবাদিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত monitoring ব্যবস্থাতেও “journalists, media workers and social media producers who are engaged in journalistic activity”-কে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ ব্যক্তি কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তার চেয়ে তিনি সাংবাদিকতামূলক কাজ করছেন কি না—এটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক হতে সাংবাদিকতায় ডিগ্রি লাগবে?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে সাংবাদিকতা করার জন্য নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিকে সাধারণ বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। Inter-American Court of Human Rights-এর Advisory Opinion OC-5/85 এ compulsory professional association membership এবং নির্দিষ্ট university degree-কে সাংবাদিকতা করার পূর্বশর্ত করার বিরোধিতা করা হয়েছে। আদালতের মতে, এ ধরনের শর্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অগ্রহণযোগ্য বাধা তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ— সাংবাদিকতার শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট ডিগ্রি না থাকলেই একজন ব্যক্তির সাংবাদিকতামূলক কাজ করার অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
প্রেস কার্ড কি সাংবাদিক হওয়ার প্রমাণ?
প্রেস কার্ড কোনো সাংবাদিকের পরিচয় বা কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটিকে সাংবাদিকতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় না।
General Comment No. 34 বলছে, কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিশেষ প্রবেশাধিকার প্রয়োজন হলে সীমিত accreditation ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থা হতে হবে বৈষম্যহীন এবং objective criteria-র ভিত্তিতে।
অর্থাৎ— প্রেস কার্ড প্রবেশাধিকার দিতে পারে; কিন্তু সাংবাদিকতার অধিকার তৈরি করার একমাত্র শর্ত নয়।
সরকারি নিবন্ধন কি বাধ্যতামূলক করা যায়?
এখানেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের Human Rights Committee বলেছে, সাংবাদিকদের জন্য সাধারণ রাষ্ট্রীয় registration বা licensing ব্যবস্থা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে সীমিত accreditation-এর সুযোগ রাখা হয়েছে শুধু নির্দিষ্ট জায়গা বা অনুষ্ঠানে বিশেষ প্রবেশাধিকারের প্রয়োজন হলে।
অর্থাৎ রাষ্ট্র চাইলে কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে প্রবেশের নিয়ম করতে পারে। কিন্তু এমন ব্যবস্থা দিয়ে কে সাংবাদিক এবং কে সাংবাদিক নন—তার ওপর সাধারণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ভিন্ন বিষয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে “media actor” ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে “media actor” ধারণাটিও বিস্তৃত হয়েছে। Council of Europe-এর Recommendation CM/Rec(2016)4-এ বলা হয়েছে, digital age-এ নতুন ধরনের media তৈরি হওয়ায় media actors-এর ধারণা বিস্তৃত হয়েছে। এর মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন যারা public debate-এ অবদান রাখেন, journalistic activities করেন বা public watchdog function পালন করেন।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন। কারণ, গণমাধ্যমের কাজ এখন শুধু newsroom-এর ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই।
Citizen journalist-এর বিষয়টি কোথায়?
কোনো ব্যক্তি কোনো ঘটনার ছবি তুললেন, তথ্য সংগ্রহ করলেন বা ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ প্রকাশ করলেন—এতেই তিনি সবসময় পেশাদার সাংবাদিক হয়ে যান না। তবে তার কাজ যদি সাংবাদিকতামূলক কার্যক্রমের অংশ হয়, তাহলে তার মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষার প্রশ্ন উঠতে পারে।
জাতিসংঘের Human Rights Committee এবং UNESCO-র বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি এই বাস্তবতাকেই স্বীকার করে। তাই “professional journalist” এবং “person engaged in journalistic activity”—দুটি ধারণাকে সবসময় এক করে দেখা ঠিক নয়।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আছে
সাংবাদিকের পরিচয়কে বিস্তৃতভাবে দেখার অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকতার নামে যেকোনো কাজ গ্রহণযোগ্য। সাংবাদিকতার সঙ্গে তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা, উৎসের নিরাপত্তা, গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং ভুল তথ্য সংশোধনের মতো পেশাগত দায়িত্বও যুক্ত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সাংবাদিকের স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার নিরাপদ পরিবেশের ওপরও গুরুত্ব দেয়।
Council of Europe বলেছে, সাংবাদিক ও অন্যান্য media actor-এর ওপর হামলা শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না; এগুলো মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার ও জনপরিসরের বিতর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সারকথা কী?
বিষয়টি খুব সহজভাবে বলা যায়। সাংবাদিক কে—তা নির্ধারণে শুধু তিনটি জিনিস দেখা যথেষ্ট নয়:
চাকরি কোথায় করেন + প্রেস কার্ড আছে কি না + সাংবাদিকতায় ডিগ্রি আছে কি না।
এর সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— তিনি কী কাজ করছেন?
তিনি কি তথ্য সংগ্রহ করছেন? তথ্য যাচাই করছেন? ঘটনা বা বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করছেন? জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ করছেন? জনপরিসরের আলোচনায় তথ্যভিত্তিক ভূমিকা রাখছেন?
এই কাজগুলো সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত হলে, শুধু প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বা সরকারি কার্ডের অভাবে তাকে সাংবাদিকতামূলক সুরক্ষা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সহজে মেলে না।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে সাংবাদিকের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কেউ বলেন, শুধু সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাই সাংবাদিক। কেউ প্রেস কার্ডকে প্রধান পরিচয় হিসেবে দেখেন। আবার অনলাইন সাংবাদিক, freelancer, blogger বা independent media worker-দের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকের নিজের অধিকার নয়। সাংবাদিকের মাধ্যমে মানুষ তথ্য পায়। সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য media actor জনস্বার্থের বিষয় সামনে আনেন। তাই সাংবাদিক বা media actor-কে অযৌক্তিকভাবে বাধা দেওয়া হলে তার প্রভাব বৃহত্তর সমাজের তথ্য জানার অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও পড়ে।
শেষ কথা
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার পরিধি বদলেছে। আজ একজন newspaper reporter যেমন সাংবাদিকতার কাজ করতে পারেন, তেমনি একজন freelancer, blogger বা online media worker-ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতামূলক কাজ করতে পারেন। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে সাংবাদিককে শুধু একটি পদবি দিয়ে চেনা কঠিন।
বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত— তিনি কী কাজ করছেন?
এই দৃষ্টিভঙ্গি সাংবাদিকতার সীমানাকে অসীম করে দেয় না। বরং বাস্তব সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের বিভিন্ন নতুন রূপকে স্বীকার করে।
সাংবাদিকতা একটি পেশা হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশাগত পদবি নয়—এটি একটি কার্যক্রমও।
আর সেই কার্যক্রমের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু সাংবাদিককে রক্ষা করা নয়; মানুষের তথ্য জানার অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করা।
তথ্যসূত্র
১. UN Human Rights Committee — General Comment No. 34: Article 19, Freedoms of Opinion and Expression, para. 44
General Comment No. 34 — Article 19, para. 44
২. UNESCO — Director-General’s Report on the Safety of Journalists — Methodology for Recording Killings of Journalists
UNESCO — Our Methodology for Recording Killings of Journalists
৩. Council of Europe — Recommendation CM/Rec(2016)4 on the protection of journalism and safety of journalists and other media actors Recommendation CM/Rec(2016)4 — Official Document
৪. Council of Europe — Implementation Guide for CM/Rec(2016)4
Implementation Guide for CM/Rec(2016)4
৫. Inter-American Court of Human Rights — Advisory Opinion OC-5/85: Compulsory Membership in an Association Prescribed by Law for the Practice of Journalism
Inter-American Court — Advisory Opinion OC-5/85
৬. OAS/IACHR — Freedom of Expression and Compulsory Licensing of Journalists
OAS/IACHR — Freedom of Expression, Principle 6





