মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বললে আমরা সাধারণত সাংবাদিক, সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা লেখকদের কথা ভাবি। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে মতপ্রকাশের পরিসরও বদলেছে। এখন একজন মানুষ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে, ভিডিও তৈরি করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে কিংবা নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি করে তাঁর কথা বলতে পারেন।
সালমান মুক্তাদির সেই পরিবর্তিত ডিজিটাল পরিসরের পরিচিত একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তাঁর কাজ সাংবাদিকতার সঙ্গে এক নয়, কিন্তু তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ডিজিটাল মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশ।
এই কারণেই তাঁর স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাটি শুধু একটি স্থাপনা বা কিছু সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর একটি দিক বাদ পড়ে যায়। ঘটনাটি আমাদের সামনে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির পরিবেশ এবং মতপ্রকাশের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
একটি স্টুডিও, একটি কাজের জায়গা
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই স্থাপনায় ছিল সালমান মুক্তাদিরের ‘BrownFish Studio’। হামলায় স্টুডিওটির বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত ও কিছু সরঞ্জাম লুট হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি একটি বৃহত্তর বিরোধের মধ্যে ঘটে। পুলিশ ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে এটিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে সালমান মুক্তাদির হামলার সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগের কথা বলেছেন। এসব বক্তব্যের কোনোটিকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
তবে একটি বিষয় সরাসরি দেখা যায়—একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাজের জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাঁর কনটেন্ট তৈরির সরঞ্জাম নষ্ট বা চুরি যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মতপ্রকাশের জায়গা কি শুধু প্রকাশের মুহূর্ত?
মতপ্রকাশকে আমরা অনেক সময় শুধু একজন মানুষ কী বললেন, কী লিখলেন বা কী প্রকাশ করলেন—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু একটি কনটেন্ট প্রকাশের পেছনে থাকে একটি প্রক্রিয়া।
কেউ ভিডিও তৈরি করেন, কেউ ছবি তোলেন, কেউ তথ্য সংগ্রহ করেন, কেউ সম্পাদনা করেন। কারও জন্য সেটি একটি স্টুডিও, কারও জন্য একটি কম্পিউটার, ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন। আবার কারও জন্য সেটিই তাঁর পেশা ও জীবিকার জায়গা।
সুতরাং মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গেলে সেই প্রকাশের অবকাঠামো ও কাজের পরিবেশের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় আসে।
সালমান মুক্তাদিরের ক্ষেত্রে স্টুডিওটি ছিল তাঁর কনটেন্ট তৈরির কর্মস্থল। সেখানে হামলার ফলে সেই কাজের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এটিই এই ঘটনার সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আলোচনার সরাসরি সংযোগ।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
এই ঘটনার সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সম্পর্ক আছে বলেই হামলাটি মতপ্রকাশের কারণে হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য এমন কোনো প্রমাণ দেয় না যে সালমান মুক্তাদিরের কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য, ভিডিও বা কনটেন্টের কারণে তাঁর স্টুডিওতে হামলা করা হয়েছিল। পুলিশের বক্তব্যে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কথা এসেছে।
অন্যদিকে সালমানের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ, ঘটনার কারণ এবং ঘটনার প্রভাব—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
কারণ কী ছিল, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু হামলার ফলে তাঁর কনটেন্ট তৈরির জায়গা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এটি ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রভাবের অংশ। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো ঘটনাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করার আগে ঘটনাটির সঙ্গে মতপ্রকাশের সম্পর্কের প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
সালমানের ঘটনা থেকে ‘আমাদের’ প্রশ্ন
“আমাদের মতপ্রকাশ”—এই ‘আমাদের’ মধ্যে শুধু সাংবাদিকরা নেই। এর মধ্যে রয়েছেন লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, আলোকচিত্রী, গবেষক, ব্লগার, ইউটিউবার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং এমন অসংখ্য মানুষ, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা, তথ্য বা সৃজনশীল কাজ অন্যদের কাছে পৌঁছে দেন।
প্রত্যেকের কাজের ধরন এক নয়। তাঁদের পেশাগত পরিচয়ও এক নয়। কিন্তু তথ্য, ধারণা বা সৃজনশীল কাজ প্রকাশের অধিকার নিয়ে যে বৃহত্তর আলোচনা, সেখানে তাঁদের কাজও ডিজিটাল যুগের বাস্তবতার অংশ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি—ICCPR-এর ১৯ অনুচ্ছেদেও মতামত ধারণ এবং তথ্য ও ধারণা খোঁজা, গ্রহণ ও প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত।
এই অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা শুধু আইন কী বলছে তার ওপর নির্ভর করে না। মানুষ নিরাপদে তাঁর কাজ করতে পারছেন কি না, তাঁর কাজের পরিবেশ নিরাপদ কি না এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার সমাধান আইনগত প্রক্রিয়ায় হচ্ছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ঘটনার বাইরে
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, চাঁদাবাজির অভিযোগ কিংবা অন্য কোনো অপরাধের ঘটনায় কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে তাকানোর সুযোগ দেয়।
ডিজিটাল মাধ্যমে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রটি বাংলাদেশে ক্রমেই বড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের জায়গা, প্রযুক্তি, সরঞ্জাম এবং পেশাগত নিরাপত্তাও আলোচনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। কারণ মতপ্রকাশ শুধু একটি পোস্ট, একটি ভিডিও বা একটি বক্তব্য নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষ, শ্রম, সময় এবং একটি প্রকাশের পরিসর।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাটি সেই পরিসরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি উপলক্ষ হতে পারে—তবে ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণের সীমা অতিক্রম না করেই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রথম প্রয়োজন—কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং তার প্রভাব কী হয়েছে, তা যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে জানা।
তথ্যসূত্র
- The Daily Star —Land dispute involving building owner behind attack on Salman Muqtadir’s studio, 3 detained: Police
- BSS — Salman Muqtadir’s studio attacked over land dispute
- bdnews24.com — Salman Muqtadir’s BrownFish studio attacked, looted in Dhaka
- The Daily Star — Fifth arrest over attack on Salman Muqtadir’s studio
- The Daily Star — TIB, HRSS condemn attacks on Radda health centre, Salman Muqtadir’s studio
- বাংলাদেশের আইনভাণ্ডার — সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ




