October 29, 2026 2:31 pm
October 29, 2026 2:31 pm

সাংবাদিককে ‘কান ধরে’ দেখানোর মন্তব্য জিএসের

সাংবাদিককে ‘কান ধরে’ দেখানোর মন্তব্য জিএসের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) তহবিলের ব্যয় ও বিল-ভাউচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের উদ্দেশে আপত্তিকর ও অপমানজনক মন্তব্য করেছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। ২০ আগস্ট ২০২৬ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের বিষয়টি উঠে আসে।

‘রাজশাহী সমাচার’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আম্মার বলেন, যে সাংবাদিক প্রতিবেদনটি করেছেন, তাকে ‘কান ধরে’ কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে তা দেখানো উচিত। তাঁর দাবি, কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের তথ্যের সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের মিল নেই। অন্য একটি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি কিছু বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।

এর আগে রাকসুর অর্থব্যয় নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে আম্মার সাংবাদিকদের উদ্দেশে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে রাকসুর তহবিল থেকে কত টাকা খরচ হয়েছে, কত টাকার ভাউচার জমা পড়েছে বা পড়েনি—সেটি এই আলোচনার মূল বিষয় নয়। আর্থিক হিসাবের যথার্থতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাখ্যা এবং শেষ পর্যন্ত নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের আগ্রহের জায়গাটি অন্যত্র—একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির মুখ থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে এমন ভাষা কেন বারবার আসছে এবং এর সামাজিক ও গণতান্ত্রিক তাৎপর্য কী?

সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তেজনার আগের ঘটনাও রয়েছে

সাংবাদিকদের সঙ্গে রাকসু নেতৃত্বের বিরোধের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২৮ জুলাই রাকসু কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিবাদ তৈরি হয়। সেখানে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারও বক্তব্য দেন।

পরদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন সাংবাদিক সংগঠন—রাবি সাংবাদিক সমিতি, রাবি প্রেসক্লাব ও রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটি—রাকসুর সব কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার বয়কটের ঘোষণা দেয়। তারা ভিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়।

অর্থাৎ, বর্তমান ঘটনাটিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন একটি মন্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম। একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও সাংবাদিকদের মধ্যে যোগাযোগ ও মতবিরোধের ক্ষেত্রে ভাষা ও আচরণের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি কোথায়?

কোনো সংবাদে তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের কাছে ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তথ্যের ভুল তুলে ধরতে পারেন, সংশোধন চাইতে পারেন কিংবা প্রয়োজন হলে আইনগত প্রতিকারও নিতে পারেন। এসবই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য পথ।

কিন্তু একজন সাংবাদিককে ‘কান ধরে’ নিয়ে যাওয়ার কথা বলা সেই স্বাভাবিক মতবিনিময়ের ভাষা নয়। কথাটি রসিকতা, ক্ষোভ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলা হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা থাকলেও দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তির প্রকাশ্য বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কারণ সাংবাদিকের কাজ হলো প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা এবং জনস্বার্থের বিষয় সামনে আনা। সেই কাজের জন্য সাংবাদিককে অপমানিত করা, ভয় দেখানো বা শাস্তির ইঙ্গিত দেওয়া হলে শুধু একজন সাংবাদিকই চাপে পড়েন না; অন্য সাংবাদিকরাও ভবিষ্যতে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলার আগে সতর্ক বা ভীত হতে পারেন।

আর সেখানেই বিষয়টি ব্যক্তিগত অপমানের সীমা ছাড়িয়ে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পরিবেশের প্রশ্নে পরিণত হয়।

আজকের ক্যাম্পাস, আগামী দিনের রাষ্ট্র

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার জায়গা নয়; ভবিষ্যতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বও এখান থেকেই তৈরি হয়। ছাত্ররাজনীতিতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের বক্তব্য ও আচরণ তাই শুধু ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আজ একজন ছাত্রনেতা সাংবাদিকের প্রশ্ন বা প্রতিবেদনকে কীভাবে দেখছেন, সমালোচনার জবাব কীভাবে দিচ্ছেন এবং ভিন্নমতকে কতটা জায়গা দিচ্ছেন—এসব আচরণের মধ্যেই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

প্রশ্নটি তাই খুব সরল: আজ যারা সাংবাদিকের প্রশ্নকে অপছন্দ করে তাকে চুপ করানোর ভাষা ব্যবহার করছেন, তারা ভবিষ্যতে আরও বড় দায়িত্বে গেলে সমালোচনা ও ভিন্নমতকে কীভাবে গ্রহণ করবেন?

এটি কাউকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচকভাবে বিচার করার প্রশ্ন নয়। বরং গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মজিজ্ঞাসা।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব যত বড় হবে, তার কাছ থেকে সহনশীলতা, সংযম এবং সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতার প্রত্যাশাও তত বাড়বে। কারণ ক্ষমতা যত বাড়ে, একটি বক্তব্যের প্রভাবও তত বিস্তৃত হয়।

সমালোচনার জবাব হোক যুক্তিতে

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে সাংবাদিক যা লিখবেন তা সবসময় সঠিক হবে—এমন নয়। সাংবাদিকেরও ভুল হতে পারে। কোনো প্রতিবেদন ভুল হলে তার জবাব হওয়া উচিত তথ্য দিয়ে; অভিযোগ থাকলে তার জবাব হওয়া উচিত ব্যাখ্যা দিয়ে।

একইভাবে, সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভরভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু সাংবাদিকের ভুলের সমালোচনা করা এবং সাংবাদিককে অপমান বা ভয় দেখানো—দুটি এক বিষয় নয়।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশে ক্ষমতাবান বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে বরং আমরা আশা করি, তিনি সমালোচনাকে গ্রহণ করবেন, প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন এবং তথ্যের ভিত্তিতে বিতর্কে অংশ নেবেন।

কারণ শেষ পর্যন্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকের অধিকার নয়; এটি এমন একটি পরিবেশ তৈরির অধিকার, যেখানে ক্ষমতাসীন বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে প্রশ্ন করাও স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

সালাহউদ্দিন আম্মারের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই কেবল একটি মন্তব্য হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। একই সঙ্গে এটিকে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ হিসেবেও দেখার প্রয়োজন নেই। বরং ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রে সমালোচনার জবাব দেওয়ার ভাষা কেমন হওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্বকে আমরা কোন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চাই।

সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে পরাজিত করাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তি।

তথ্যসূত্র: দৈনিক সমকাল, আমাদের বার্তা, D24Report, রাবি সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ।


খোলামেলা কথা বলুন। অন্যকেও বলতে দিন।
সম্পাদকীয়

খোলামেলা কথা বলুন। অন্যকেও বলতে দিন।

মানুষের কথা বলার অধিকার আছে। নিজের মত প্রকাশের অধিকার আছে। প্রশ্ন করার, দ্বিমত পোষণ করার এবং তথ্য জানার অধিকার আছে। একই সঙ্গে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকারকে

বিস্তারিত »
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
বাংলাদেশর আইন

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

অ্যাডভোকেট মানিক আকবর, আইনজীবী ও সাংবাদিক। ভূমিকা: বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের

বিস্তারিত »
“সালমান মুক্তাদির ও আমাদের মতপ্রকাশ”
মতামত

সালমান মুক্তাদির ও আমাদের মতপ্রকাশ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বললে আমরা সাধারণত সাংবাদিক, সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা লেখকদের কথা ভাবি। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে মতপ্রকাশের পরিসরও বদলেছে। এখন একজন মানুষ

বিস্তারিত »
দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়, গুটিয়ে নিচ্ছেন সাংবাদিকরা
আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়, গুটিয়ে নিচ্ছেন সাংবাদিকরা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাংবাদিকদের জন্য তথ্য বিনিময়, জনসম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত মত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই পরিসর ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। মামলা,

বিস্তারিত »
শিরোনাম ঠিক আছে ডিবিসি নিউজের বিজ্ঞপ্তি ঘিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
মতামত

ডিবিসি নিউজের বিজ্ঞপ্তি ঘিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘আপত্তিকর’ ও ‘বিতর্কিত’ লেখালেখি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ডিবিসি নিউজ। ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ডিবিসি নিউজ কর্তৃপক্ষের জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তিতে

বিস্তারিত »