সাংবাদিকতা ছিল হেলাল উদ্দীন চৌধুরীর দীর্ঘ জীবনের প্রধান পরিচয়। কক্সবাজার থেকে তাঁর সাংবাদিকতার শুরু। পরে চট্টগ্রাম হয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রিপোর্টার, চিফ রিপোর্টার, ব্যুরো প্রধান এবং সাংবাদিক সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
হেলাল উদ্দীন চৌধুরী ১৯৫৬ সালের ৯ নভেম্বর কক্সবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। সাংবাদিকতায় তাঁর পথচলা শুরু হয় কক্সবাজার থেকেই। পরে ১৯৮৩ সালে তিনি দৈনিক আজাদীতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও চিফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি আজাদীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন দৈনিক যায়যায়দিনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান।
দীর্ঘ এই সময়ে তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রতিবেদনের দায়িত্ব পালন করেননি। চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ১৯৯৫–৯৬ এবং ১৯৯৭–৯৮ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘থ্যালাসেমিয়া সেবা কেন্দ্র বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখি
হেলাল উদ্দীন চৌধুরীর সাংবাদিক পরিচয়ের আরেকটি দিক ছিল তাঁর লেখালেখি। দৈনিক আজাদীর একটি স্মরণলেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যত্র চলে যাওয়ার পরও তিনি আজাদী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং নিয়মিত লিখতেন। এমনকি মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও সেখানে তাঁর একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছিল।
তাঁর প্রকাশিত লেখার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত ‘হায়রে কপাল : রাস্তার রাজা চিনলি না!’ শিরোনামের লেখাটিতে তিনি নগরের ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রাস্তার দখল এবং তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া নানা বাস্তবতা নিয়ে লিখেছিলেন। দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত আরও একটি প্রতিবেদ ‘রক্তের সুনামিতে রচিত বর্বরতার ইতিহাস লোমহর্ষক চট্টগ্রাম গণহত্যা’। এই লেখায় তিনি চট্টগ্রামের গণহত্যার ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি নিয়ে লিখেছেন।
লেখালেখির আরেকটি দলিল পাওয়া যায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত সাংবাদিকবান্ধব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থে। সেখানে হেলাল উদ্দীন চৌধুরীর লেখা ‘আন্দোলন সংগ্রামের অনন্য ঠিকানা-মহিউদ্দিন’ প্রকাশিত হয়। শুধু লেখক হিসেবেই নয়, তিনি ওই স্মারকগ্রন্থের সম্পাদনা পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর সাংবাদিক পরিচয়ের সঙ্গে লেখক ও সম্পাদকীয় কাজের একটি ধারাও যুক্ত ছিল।
আমার দেখা হেলাল উদ্দীন
হেলাল উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল সাংবাদিকতার সূত্রেই। আমি তখন দৈনিক যায়যায়দিনের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতাম। একবার যায়যায়দিনের প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলন চট্টগ্রামে আয়োজনের কথা জানানো হলো। চট্টগ্রামে তখনও আমার যাওয়া হয়নি। তাই সম্মেলনে যাওয়ার আগ্রহ ছিল। চট্টগ্রাম অফিস থেকে হেলাল উদ্দীন চৌধুরী আমাকে ফোন করেছিলেন।
তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন,
“কোনো সমস্যা নাই আপা, চলে আসেন। সারা বাংলাদেশে আপনি একমাত্র নারী প্রতিনিধি। আমরা আপনার জন্য সব রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। কোনো সমস্যা নাই। চলে আসেন।” কথাগুলো আমার মনে আছে।
সারা বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিরা সেই সম্মেলনে এসেছিলেন। আমি ছিলাম একমাত্র নারী প্রতিনিধি। আমরা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে সেখান থেকে র্যালী করে সম্মেলনের স্থানে গিয়েছিলাম। জায়গাটি ছিল ডি.সি. হিলের উন্মুক্ত মঞ্চ।
সম্মেলন ঘিরে হেলাল উদ্দীন চৌধুরী খুব ব্যস্ত ছিলেন। তাই তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলার সুযোগ হয়নি। কিন্তু অল্প সময়ের সেই কথাবার্তাতেই তাঁর আচরণ আমার মনে দাগ কেটেছিল। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম ব্যুরোর প্রধান। আমি ছিলাম একজন জেলা প্রতিনিধি। দায়িত্ব ও অবস্থানের দিক থেকে আমাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল। কিন্তু তাঁর কথাবার্তায় সেই দূরত্ব বা কোনো ধরনের অহংকার অনুভব করিনি। বরং একজন নারী প্রতিনিধি যেন কোনো অসুবিধায় না পড়েন—সেটি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন। সম্মেলন শেষে আমি বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর তিনি নিরাপদে পৌঁছেছি কি না, সেটিও খোঁজ নিয়েছিলেন।
একজন সাংবাদিকের দায়িত্ববোধকে সবসময় বড় কোনো ঘটনায় খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো একটি ফোন, একটি আশ্বাস কিংবা একজন সহকর্মীর নিরাপত্তার বিষয়টি মনে রাখার মধ্যেও তার প্রকাশ থাকে। হেলাল উদ্দীন চৌধুরীকে আমি সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মনে রেখেছি।
দীর্ঘ সাংবাদিকতার একটি প্রজন্ম
হেলাল উদ্দীন চৌধুরীর সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠানোর প্রযুক্তি আজকের মতো সহজ ছিল না। কক্সবাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের সংবাদজগতে কয়েক দশক কাজ করেছেন তিনি। আজাদীতে দীর্ঘ সময় রিপোর্টিং করেছেন। পরে সমকাল ও যায়যায়দিনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি দিক ছিল সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে সাংবাদিক সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনেরই অংশ। ২০১৮ সালের স্মারকগ্রন্থের সম্পাদনা পরিষদে তাঁর অন্তর্ভুক্তিও চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততার একটি দলিল।
শেষ যাত্রা
২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক যায়যায়দিনের প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ নিতে হেলাল উদ্দীন চৌধুরী কক্সবাজারে ছিলেন। সকালে অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
সাংবাদিকতা তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথ। সেই পথের শুরু কক্সবাজারে, বড় একটি সময় কেটেছে চট্টগ্রামের সংবাদজগতে। রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন, সাংবাদিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক ধরে রেখেছিলেন।
আজ হেলাল উদ্দীন চৌধুরীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি তাঁকে।
তথ্যসূত্র
দৈনিক আজাদী, বাংলানিউজ২৪, বাংলাধারা, জয়নিউজবিডি, দৈনিক আজাদী





