সালিম সামাদ (১৯৫২–২০২৬) ছিলেন সাংবাদিক, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, লেখক এবং গণমাধ্যম অধিকারকর্মী। প্রায় সাড়ে তিন দশকের পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, সংঘাত, নিরাপত্তা, পরিবেশ, উন্নয়ন, মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, উগ্রবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেছেন। দেশের বাইরের পাঠকদের কাছেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে লেখালেখির জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৭৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
তার জীবনকে শুধু পেশাগত পদ, পুরস্কার বা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়ে বোঝা যায় না। সাংবাদিকতার কারণে আটক ও কারাবাস, দেশত্যাগ ও নির্বাসন, আবার দেশে ফিরে সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ—তার জীবনের এসব অধ্যায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণমাধ্যম ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।
সাংবাদিকতার শুরু
সালিম সামাদের প্রকাশিত CV ও জীবনীমূলক নথি অনুযায়ী, তিনি ঢাকায় বেড়ে ওঠেন এবং ১৯৭৬ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নেন।
তার সাংবাদিকতার শুরু থেকেই পরিবেশ ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব পায়। পরবর্তী সময়ে রাজনীতি, সংঘাত, নিরাপত্তা, মানবাধিকার, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জোরপূর্বক অভিবাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয় তার প্রতিবেদনের অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৮১ সালেই সাংবাদিকতার কারণে তিনি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েন। Human Rights Watch-এর ২০০৫ সালের Hellman/Hammett Award-এর জীবনীতে বলা হয়, The New Nation-এর হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের counterinsurgency নিয়ে রিপোর্ট করার সময় তাকে আটক করা হয়। সেখানে পাঁচ দিন আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের অভিযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে। মুক্তির পর রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে তিনি হুমকিমূলক ফোন পেয়েছিলেন বলেও ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়। সাংবাদিকতার শুরুতেই সংবেদনশীল বিষয়ে কাজ করার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনের অনেক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
শুধু নিজের সাংবাদিকতা নয়, অন্য সাংবাদিকদেরও তৈরি করা
সালিম সামাদের পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্থানীয় ও ছোট শহরের সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করা। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি UNICEF-এর media consultant হিসেবে কাজ করেন। ছোট শহরের সাংবাদিকদের মানব উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে রিপোর্টিংয়ে উৎসাহিত করা এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগে তিনি যুক্ত ছিলেন।
RSF-এর ২০২৬ সালের স্মরণলেখাতেও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংবাদিকদের জন্য তার capacity-building courses পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের জন্য পরিবেশ ও অন্যান্য সাংবাদিকতা বিষয়ে কর্মশালার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার কথা সেখানে রয়েছে। ১৯৯১ সালে তিনি Washington-based Ashoka Fellowship পান। RSF তাকে agenda-setting journalism-এর জন্য এই ফেলোশিপ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।
সাংবাদিকতা তার কাছে শুধু নিজের প্রতিবেদন তৈরির বিষয় ছিল না। অন্য সাংবাদিকদেরও জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করা তার পেশাগত জীবনের একটি ধারাবাহিক অংশ ছিল।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় বিস্তার
১৯৯০-এর দশকে তার সাংবাদিকতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রকাশনায় লিখতে শুরু করেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার নানা বিষয়ে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি Colorado State University-তে Social Communication বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। ১৯৯৬ সালে Washington DC-এর Advocacy Institute-এর fellowship-এ অংশ নেন।
তিনি TIME Asia, India Today, Outlook, The Times of India, South Asiaসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রকাশনায় লিখেছেন। বাংলাদেশের The Bangladesh Observer, Daily Observer এবং The Asian Age-এর সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি Paris-based Reporters Without Borders (RSF)-এর বাংলাদেশ correspondent হিসেবে কাজ করেন। RSF-এর হিসাবে, তিন দশকেরও বেশি সময় তিনি এই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এর মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতার আরেকটি পরিচয় স্পষ্ট হয়—বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও কাজ করা একজন সাংবাদিক হিসেবে।
২০০২: সাংবাদিকতার কারণে গ্রেপ্তার
২০০২ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ Channel 4-এর Unreported World অনুষ্ঠানের জন্য একটি documentary team বাংলাদেশে কাজ করছিল। সালিম সামাদ ওই দলের সঙ্গে fixer ও অনুবাদকের ভূমিকায় ছিলেন। ২৫ নভেম্বর দলের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করার পর তিনি আত্মগোপনে যান। ২৯ নভেম্বর ঢাকায় এক বন্ধুর বাসা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়।
বাংলাদেশ সরকার তখন অভিযোগ করেছিল, বিদেশি দলটি বাংলাদেশকে একটি “Islamic fanatical country” হিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে কাজ করছিল। অন্যদিকে Committee to Protect Journalists (CPJ) ও RSF ঘটনাটিকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে নথিভুক্ত করে।
কারাগারে থাকা অবস্থায় সালিম সামাদ নির্যাতনের অভিযোগ করেন। CPJ-এর নথিতে তার অভিযোগের কথা উল্লেখ আছে। Human Rights Watch-এর জীবনীতে আরও বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করায় মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
২৩ ডিসেম্বর ২০০২ হাইকোর্ট তাকে জামিনে মুক্তির নির্দেশ দেন। কিন্তু পরদিন Special Powers Act-এর অধীনে তাকে আরও ৩০ দিন আটক রাখার আদেশ দেওয়া হয়। ১৪ জানুয়ারি ২০০৩ হাইকোর্ট ওই অতিরিক্ত আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে মুক্তির নির্দেশ দেন। ১৮ জানুয়ারি তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
এই সময়কার ঘটনাগুলো CPJ, RSF এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনের মতো আন্তর্জাতিক নথিতেও উঠে আসে।
কারাগার থেকে নির্বাসন
কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শেষ হয়নি। RSF-এর ২০০৫ সালের বাংলাদেশ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালের গ্রেপ্তারের পর তিনি নিরাপত্তা সংস্থার হয়রানির মুখে ছিলেন এবং ২০০৪ সালের অক্টোবরে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
Human Rights Watch-এর Hellman/Hammett Award-এর জীবনীতে ঘটনাটির আরও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০০৪ সালের অক্টোবরে তিনি শিশু, দারিদ্র্য ও সহিংসতা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে কানাডায় যান। পরে কানাডার বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতির সময় বন্ধুরা তাকে সতর্ক করেন যে তার বাড়ির ফোন নজরদারিতে থাকতে পারে এবং দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। এরপর আইনজীবীর পরামর্শে তিনি কানাডায় refugee protection-এর জন্য আবেদন করেন।
২০০৫ সালের জানুয়ারিতে তার আশ্রয় আবেদন মঞ্জুর হয়। CPJ-এর ২০০৮ সালের Faces of Exile প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি জানুয়ারি ২০০৫-এ asylum পান। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৬ সালে তার পরিবার কানাডায় তার সঙ্গে যোগ দেয়। The Daily Star-এর ২৮ জানুয়ারি ২০০৫-এর একটি চিঠিতেও বলা হয়, কানাডার Immigration and Refugee Board ১৯ জানুয়ারি তার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয় এবং তাকে protection দেয়।
দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেওয়া তার জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাংলাদেশে তার পেশাগত কাজ থেমে যায়। কানাডায় তাকে নতুন করে জীবন ও সাংবাদিকতা শুরু করতে হয়।
২০০৫: Hellman/Hammett Award
২০০৫ সালেই সালিম সামাদ Hellman/Hammett Award লাভ করেন। Human Rights Watch-এর নথি অনুযায়ী, এই স্বীকৃতি রাজনৈতিক নিপীড়ন, কারাবাস, নির্যাতন বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়া লেখক ও সাংবাদিকদের দেওয়া হতো।
সালিম সামাদের ক্ষেত্রে ১৯৮১ সালের আটক, ২০০২ সালের গ্রেপ্তার ও কারাবাস, নির্যাতনের অভিযোগ এবং পরবর্তী নির্বাসনের অভিজ্ঞতাগুলো তার জীবনের প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। RSF-এর ২০২৬ সালের স্মরণলেখাতেও তাকে ১৯৯১ সালের Ashoka Fellowship এবং ২০০৫ সালের Hellman-Hammett grant-এর প্রাপক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাসনেও সাংবাদিকতা
কানাডায় গিয়ে তিনি সাংবাদিকতা থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। CPJ-এর Faces of Exile প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি প্রবাসী দক্ষিণ এশীয়দের জন্য অনলাইন সাংবাদিকতা চালিয়ে যান এবং Bangladesh Watchdog নামে একটি pro-democracy blog পরিচালনা করেন।
তার CV অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি Toronto-based Durdesh.net-এর editor ছিলেন। নির্বাসনের এই সময়টি তার পেশাগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের বাইরে থেকেও তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কাজ চালিয়ে যান।
২০১০: দেশে ফিরে আবার সাংবাদিকতা
প্রায় ছয় বছর কানাডায় থাকার পর সালিম সামাদ বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০২৬ সালে মৃত্যুর আগে দেওয়া একটি বক্তব্য/লেখায় তিনি নিজেই উল্লেখ করেছিলেন যে ২০০৪ সালে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল এবং ছয় বছর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। মৃত্যুর পর প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনেও একই তথ্য এসেছে।
দেশে ফেরার পর তিনি আবার সাংবাদিকতা, লেখালেখি, সাংবাদিক প্রশিক্ষণ এবং গণমাধ্যম-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। ২০১২ সালে তিনি USAID-supported Strengthening Democratic Local Governance (SDLG) প্রকল্পে knowledge management consultant হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন সময় সাংবাদিক প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ, গণমাধ্যম গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
The Bangladesh Observer, Daily Observer এবং The Asian Age-এর সঙ্গেও তার কাজ অব্যাহত ছিল। BJIM-এর জীবনীতে তাকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এসব ইংরেজি দৈনিকে Special Correspondent হিসেবে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
সাংবাদিকতা থেকে গণমাধ্যম অধিকার
দেশে ফেরার পর তার কাজের আরেকটি দিক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার। তিনি সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, মামলা ও হয়রানি নিয়ে কথা বলেছেন। ডিজিটাল অধিকার এবং মতপ্রকাশের ওপর আইন ও প্রশাসনিক চাপ নিয়েও সক্রিয় ছিলেন।
২০১৮ সালে ভারতের গুয়াহাটি প্রেস ক্লাবে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বাংলাদেশে উগ্রবাদ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ধর্মনিরপেক্ষ লেখক, বুদ্ধিজীবী ও ব্লগারদের ওপর হুমকির বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তার সাংবাদিকতার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও দেখা।
FExB: জীবনের শেষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ
জীবনের শেষ পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল Forum for Freedom of Expression, Bangladesh (FExB)-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার ভূমিকা। তার CV অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি FExB-এর General Secretary হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। BJIM-এর জীবনীও তাকে একই পদে উল্লেখ করেছে।
COVID-19 মহামারির সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি, গ্রেপ্তার এবং চাপের ঘটনা নিয়ে FExB সক্রিয় ছিল। ২০২০ সালের মে মাসে সালিম সামাদের একটি লেখায় lockdown চলাকালে সাংবাদিক ও citizen-journalist-দের ওপর হামলা ও হয়রানির কথা তুলে ধরা হয়। খাদ্য সহায়তা ও দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর চাপ তৈরির কথাও তিনি লিখেছিলেন।
২০২০ সালের নভেম্বরে VOICE ও UNDP Human Rights Programme-এর সহায়তায় আয়োজিত “Defending Human Rights: Strengthening Freedom of Expression” শীর্ষক সংলাপে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সেখানে তাকে FExB-এর General Secretary এবং RSF correspondent হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
ডিজিটাল আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী Cyber Security Act নিয়েও সালিম সামাদ ও FExB সক্রিয় ছিল। ২০২৩ সালে Cyber Security Act-এর খসড়া নিয়ে আলোচনার সময় তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। The Business Standard-কে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া যথেষ্ট ছিল না এবং আইনটি মতপ্রকাশের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট FExB ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে Cyber Security Act বাতিল এবং ICT Act, Digital Security Act ও Cyber Security Act-এর অধীনে করা মামলাগুলো বাতিলের দাবি জানায়। সেই সংবাদ সম্মেলনে সালিম সামাদ বলেন, জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ থাকা প্রয়োজন।
এখানে তার দীর্ঘ পেশাগত জীবনের একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি ধীরে ধীরে আইন, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন।
ঢাকার বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক
সালিম সামাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাজধানীর বাইরের সাংবাদিকদের সঙ্গে তার দীর্ঘ যোগাযোগ। RSF-এর স্মরণলেখায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তায় তার সক্রিয়তার কথা বলা হয়েছে। ছোট শহরের সাংবাদিকদের জন্য capacity-building course এবং দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের জন্য কর্মশালার কথাও সেখানে রয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে UNICEF-এর সঙ্গে কাজের সময় ছোট শহরের সাংবাদিকদের মানব উন্নয়ন বিষয়ে রিপোর্টিংয়ে উৎসাহিত করার যে কাজ তিনি করেছিলেন, পরবর্তী সময়েও তার সঙ্গে এই ধারাটির সম্পর্ক দেখা যায়।
একজন সহজ মানুষ: ব্যক্তিগত স্মৃতি
এই অংশটি লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা। এটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
আমার সঙ্গে সামাদ ভাইয়ের প্রথম দেখা ২০১৮ সালে। ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে ARTICLE 19 Bangladesh and South Asia-এর একটি গবেষণাভিত্তিক অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। আলোচনার বিষয় ছিল গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে কখনো আমি তাকে কল দিতাম, কখনো সামাদ ভাই কল করতেন। কখনো কোনো খবর জানতে চাইতেন। কখনো কোনো সাংবাদিকের বিষয়ে তথ্য নিতেন।
ফোন ধরেই কখনো বলতেন— “আরে মরিয়ম শেলী হঠাৎ কেন ফোন দিলো? কী খবর?”
কোনো বিষয়ে আমি তথ্য দিতে না চাইলে, কিংবা তখন তথ্য জানা না থাকলে, আমি হাসতাম। তিনি মজা করে বলতেন— “আমি ফোন দিলেই তো মরিয়ম শেলী শুধু হাসে, কোনো তথ্য দেয় না।”
সামাদ ভাইকে আমি প্রাণবন্ত ও সহজ মানুষ হিসেবেই মনে রেখেছি। জোরে কথা বলতেন। অনেক মজা করে কথা বলতেন। কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলার মধ্যে কোনো অহংকার দেখিনি। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকদের নিয়ে তার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। কোনো সাংবাদিক বিপদে পড়লে, কারও ওপর হামলা হলে, কেউ মামলা বা হুমকির মুখে পড়লে—তিনি বিষয়টি জানতে চাইতেন। জানতে চাইতেন, এ ধরনের ঘটনায় ARTICLE 19 কীভাবে তাদের সহযোগিতা করছে।
তার ব্যক্তিগত যোগাযোগের অনেকটাই হয়তো কোনো আনুষ্ঠানিক নথিতে পাওয়া যাবে না। তাই তার কাজের পূর্ণ ইতিহাস লিখতে হলে সহকর্মী, মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর oral history গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ARTICLE 19 থেকে বের হওয়ার পর আমি যখন স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে একটা পোর্টাল করার পরিকল্পনা করছিলাম, তখন কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সামাদ ভাই-এর সঙ্গেও কথা হয়। তিনি কাজটি করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন— “করুন।”
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে এ ধরনের কাজের পরিণতি কঠিন হতে পারে। আমার স্বভাব নিয়েও মজা করে কিছু কথা বলেছিলেন—কাজের ক্ষেত্রে আমি ভয়কে খুব বেশি গুরুত্ব দিই না, এমন একটি ধারণা তার ছিল।
শেষে তিনি বলেছিলেন— “যাই হোক, পাশে থাকব।”
কথাটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। কারণ এটি শুধু একটি উদ্যোগের প্রতি উৎসাহ ছিল না; একজন দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সাংবাদিকের কাছ থেকে নতুন একটি স্বাধীন উদ্যোগ নেওয়া মানুষের জন্য এক ধরনের আস্থার কথাও ছিল। সামাদ ভাই আজ নেই। কিন্তু FOEBD-এর কাজের শুরুতে তার সেই কথাটি আমার ব্যক্তিগত ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে আছে।
যে ইতিহাস এখনো সম্পূর্ণ লেখা হয়নি
সালিম সামাদের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধিকারকর্মী হিসেবে পূর্ণ archival record তৈরি করতে শুধু প্রকাশিত সংবাদ যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক, সাংবাদিক হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনায় তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ, পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে তার সমন্বয়—এসব বিষয়ে আরও oral history প্রয়োজন।
সম্ভাব্য সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে থাকতে পারেন PEN International Bangladesh-এর প্রতিনিধি, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম-এর প্রতিনিধি, Committee to Protect Journalists-এর প্রতিনিধি, International Federation of Journalists-এর প্রতিনিধি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাংবাদিক অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন জেলার সাংবাদিকরা।
গৌতম দাস ও শামছুর রহমানসহ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো নিয়ে সালিম সামাদ কী জানতেন, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন বা এ বিষয়ে কী ধরনের কাজ করেছিলেন—তা যারা সরাসরি জানেন, তাদের সাক্ষাৎকার ভবিষ্যতে এই archival record-কে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষ বছরগুলোতেও সালিম সামাদ লেখালেখি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। FExB-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ডিজিটাল আইন এবং সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। RSF-এর সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল।
তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারাগারে গেছেন। দেশ ছেড়েছেন। কানাডায় আশ্রয় নিয়েছেন। আবার দেশে ফিরে সাংবাদিকতা করেছেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেছেন।
তার জীবনের এসব অধ্যায়কে একসঙ্গে রাখলে একটি দীর্ঘ পথ দেখা যায়—তথ্য সংগ্রহ, তা প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার নিয়ে কাজ করার পথ।
২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়। সালিম সামাদের মৃত্যুর পর তার জীবন নিয়ে স্মরণলেখ লেখা হয়েছে। কিন্তু স্মরণলেখের বাইরে আরও একটি কাজ জরুরি—তার কাজের নথি সংরক্ষণ।
তার প্রকাশিত লেখা, ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাগজপত্র, পুরস্কার ও fellowship-এর নথি, কারাবাসের দলিল, নির্বাসন ও আশ্রয়-সংক্রান্ত নথি, FExB-এর নথি, RSF-সংক্রান্ত correspondence এবং সহকর্মী ও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার—এসব একত্র করা গেলে তার সাংবাদিকতা জীবনের একটি শক্তিশালী archival record তৈরি করা সম্ভব।
সম্ভবত সালিম সামাদকে স্মরণ করার সবচেয়ে স্থায়ী উপায় হবে তার জীবনের প্রতিটি দাবি, প্রতিটি নথি, প্রতিটি লেখা এবং তাকে ঘিরে থাকা মানুষের স্মৃতিকে যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করা। কারণ একজন সাংবাদিকের জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার তৈরি করা নথি, প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং মানুষের স্মৃতিতে থাকা অভিজ্ঞতা থেকে একটি সময়ের ইতিহাস তৈরি হতে পারে।
তথ্যসূত্র ও Archival Note
এই প্রতিবেদনের documentary অংশ তৈরিতে প্রধানত Committee to Protect Journalists (CPJ), Reporters Without Borders (RSF), Human Rights Watch (HRW), The Daily Star, bdnews24.com, The Business Standard, Bangladesh Sangbad Sangstha (BSS), Voice এবং সালিম সামাদের প্রকাশিত CV ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশেষ করে ২০০২–২০০৫ সময়ের গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতনের অভিযোগ এবং নির্বাসনের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে CPJ-এর বিভিন্ন নথি, RSF-এর তথ্য, HRW-এর Hellman/Hammett Award-এর জীবনী এবং CPJ-এর Faces of Exile নথি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব নথির মধ্যে ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন দিক পরস্পরকে সমর্থন করে।





