ভয়েস অব আমেরিকার (VOA) সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি, দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক এবং সাংবাদিক সংগঠক আমির খসরু মারা গেছেন। ১০ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মেয়ে সাদিয়া আফরিন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৬৪ বছর।
দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন আমির খসরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের অধ্যায়নরত অবস্থায় সংবাদপত্রে লেখালেখি দিয়ে শুরু তার সাংবাদিকতার জীবন। এরপর তিনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংবাদ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাবলি তুলে ধরা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কর্মজীবন গড়ে তোলেন।
লেখালেখি থেকে সাংবাদিকতা
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মৃত্যুসংবাদে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখালেখির মাধ্যমে আমির খসরুর সাংবাদিকতা শুরু হয়। পরে তিনি দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করেন। এসব সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক বুধবারের সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে পত্রিকাটির সাবেক নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মজীবনের একটি দীর্ঘ সময় তিনি ভয়েস অব আমেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংবাদ-আর্কাইভে তাঁর কাজের পরিচয়
আমির খসরুর সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ভয়েস অব আমেরিকার সংরক্ষিত প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে তাঁর নাম ও সংবাদদাতা হিসেবে পরিচয় পাওয়া যায়। কয়েকটি প্রতিবেদন তাঁর কাজের পরিধি বোঝাতে সহায়তা করে।
২০০৭ সালের ১০ মে প্রকাশিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সিপিডির গবেষণার প্রতিবেদন-এ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণার ফলাফল ও নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের আর্কাইভে আমির খসরুকে প্রতিবেদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদন-এ নির্বাচনের আয়োজন, তৎকালীন জরুরি অবস্থার অবসান এবং ভোট পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতির মতো বিষয় উঠে আসে।
২০০৯ সালের ১৬ মে প্রকাশিত যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা নিয়ে প্রতিবেদন তাঁর কাজের আরেকটি দিক তুলে ধরে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের মতো সামাজিক ও আইনগত বিষয়ও তাঁর প্রতিবেদনের আওতায় ছিল।
২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির শ্রমিকদের ধর্মঘট নিয়ে প্রতিবেদন-এ শ্রমিকদের বোনাসের দাবি, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং ধর্মঘটের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
২০১১ সালের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত আলোচনা নিয়ে প্রতিবেদন তাঁর কূটনৈতিক সংবাদ সংগ্রহের আরেকটি উদাহরণ। ২০১৫ সালেও ঢাকায় কোকেন চোরাচালানে অভিযুক্ত এক স্প্যানিশ নাগরিককে আটক নিয়ে প্রতিবেদন-এ তাঁর নাম পাওয়া যায়।
এই নির্বাচিত প্রতিবেদনগুলো থেকে দেখা যায়, তাঁর সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্র রাজনীতি ও কূটনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি, শ্রমিকদের দাবি, নির্বাচন, আদালত ও সামাজিক বিষয়েও বিস্তৃত ছিল। তবে এগুলো তাঁর সংরক্ষিত কাজের নির্বাচিত নমুনা; তাঁর সব প্রতিবেদন বা কর্মজীবনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়।
সহকর্মীর স্মৃতিতে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদক
সাংবাদিক ও লেখক আফসান চৌধুরীর স্মৃতিচারণ আমির খসরুর পেশাগত জীবনের ব্যক্তিগত কিছু দিক তুলে ধরে। UNB-তে প্রকাশিত ‘Farewell, Amir Khasru and all those days’ শীর্ষক লেখায় আফসান চৌধুরী জানান, ১৯৮৪ সালে সাপ্তাহিক ঢাকা কুরিয়ার চালুর সময় তাঁদের পরিচয় হয়।
আফসান চৌধুরীর স্মৃতিতে, আমির খসরু নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাঁরা একসঙ্গে কয়েকটি প্রতিবেদনও তৈরি করেছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আফসান তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত হাসি ও কথোপকথনের ধরন উল্লেখ করেছেন।
আফসান চৌধুরীর লেখা আমির খসরুর কর্মজীবনকে শুধু পদবি বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে নয়, সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা ও সহকর্মিতার মধ্য দিয়ে বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
সাংবাদিক সংগঠনে ভূমিকা
আমির খসরু সাংবাদিকদের বিভিন্ন পেশাগত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদে ওভারসিজ করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ওকাব)-এর সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তাঁর পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির স্থায়ী সদস্যও ছিলেন।
ওকাবের শোকবার্তা এবং কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিসিএবি)-এর শোকবার্তায় তাঁর পেশাগত অবদানের কথা স্মরণ করা হয়। ডিসিএবি তাঁকে সাবেক সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করে।
একটি দীর্ঘ সাংবাদিকতা-জীবনের নথি
আমির খসরুর কর্মজীবন সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব, ভয়েস অব আমেরিকার সংরক্ষিত প্রতিবেদন, সাংবাদিক সংগঠনে তাঁর ভূমিকা এবং সহকর্মীর স্মৃতিচারণ। এসব সূত্র মিলিয়ে তাঁর পেশাগত জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করা যায়।
বিশেষ করে ভয়েস অব আমেরিকার আর্কাইভে থাকা প্রতিবেদনগুলো তাঁর সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেয়। আর আফসান চৌধুরীর স্মৃতিচারণ সেই পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে মাঠপর্যায়ের সংবাদ সংগ্রহ ও সহকর্মিতার অভিজ্ঞতা।
তবে তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক পটভূমি এবং সংগঠক হিসেবে নির্দিষ্ট অবদান সম্পর্কে আরও নথি ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব তথ্য পাওয়া গেলে তাঁর কর্মজীবনের আরও পূর্ণাঙ্গ ও যাচাইযোগ্য কালপঞ্জি তৈরি করা সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্র
৮. ওকাবের শোকবার্তা, UNB, ডিসিএবির শোকবার্তা, UNB, প্রথম আলো।





