কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি বাংলা কবিতায় নিজস্ব কণ্ঠ তৈরি করেছিলেন। কবিতার পাশাপাশি বিশ্বকবিতার অনুবাদ এবং সাংবাদিকতায়ও রেখেছেন অবদান। দীর্ঘ দুই দশকের কবিতাচর্চা, ছোটকাগজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সংবাদমাধ্যমে পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়।
১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লেখা দুই শতাধিক কবিতা নিয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অক্ষর ও বালির পৃথিবী। এর পাশাপাশি এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো আন্তর্জাতিক কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। দৈনিক সমকাল ও দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন বিভাগেও কাজ করেছেন।
এই কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিকের মৃত্যু হয় ২২ অক্টোবর ২০২৬ রাতে। ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫১ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ছোট ভাই মো. এহতেশামুল হক মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন রথো রাফি।
আশুগঞ্জ থেকে কবিতার জগতে
রথো রাফির জন্ম ১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারুয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম মো. মোজাম্মেল হক। রসায়নশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু কবিতা ও অনুবাদ হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনশীল জগতের প্রধান অংশ। নব্বইয়ের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।
বাংলা কবিতায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন ধীরে। বই প্রকাশের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল কম। দীর্ঘদিনের কবিতাচর্চার পর ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অক্ষর ও বালির পৃথিবী।
দুই দশকের কবিতা এক মলাটে
অক্ষর ও বালির পৃথিবী বইটি প্রকাশ করে আনন্দম। ৪৩২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে রয়েছে দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকে লেখা কবিতাগুলো এতে সংকলিত হয়েছে।
তাঁর কবিতায় এসেছে মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর দর্শন। এসেছে ধর্ম, ইতিহাস, প্রেম, জীবনবোধ ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। কৃষ্ণের বাঁশি থেকে যিশুর ক্রুশযাত্রা—বিভিন্ন বিষয় তাঁর কবিতায় জায়গা পেয়েছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি সাহিত্যসমালোচনায় তাঁর কবিতার নিরাভরণ ভাষা, নিজস্ব বয়ান ও চিন্তার বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়। সমালোচক উপল বড়ুয়া বইটিকে দীর্ঘ দুই দশকের কবিতাচর্চার ফসল হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন।
রথো রাফি যুক্ত ছিলেন ছোটকাগজ আন্দোলনের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের পরিচিত ছোটকাগজ গাণ্ডীব-এর নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি। সাহিত্যচর্চায় এই পরিসর তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিল।
বিশ্বকবিতার সঙ্গে বাংলার সেতুবন্ধ
কবিতার পাশাপাশি অনুবাদেও কাজ করেছেন রথো রাফি। এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো আন্তর্জাতিক কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। তাঁর অনুবাদের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার পাঠকেরা বিশ্বকবিতার বিভিন্ন ধারা ও কণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। মূল কবিতার ভাবনা, অনুভূতি ও দার্শনিক অনুষঙ্গ বাংলায় তুলে ধরার চেষ্টা ছিল তাঁর এই কাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সাংবাদিকতার পেশায় রথো রাফি
রথো রাফির পরিচয় শুধু কবিতা ও অনুবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পেশাদার সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। দৈনিক সমকালে সহসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন বিভাগেও কাজ করেছেন। সেখানে শিফট ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকতার কর্মক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন অনেক সহকর্মী। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেছেন। এসব স্মৃতিতে তাঁর সহকর্মী হিসেবে পরিচয়, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিমানুষ রথো রাফির নানা দিক উঠে আসে।
রেখে গেলেন কবিতা ও অনুবাদের কাজ
রথো রাফির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য হারাল একজন কবি ও অনুবাদককে। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, দীর্ঘ সময় ধরে লেখা কবিতা এবং বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ তাঁর সৃজনশীল কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
একজন লেখকের জীবনকে শুধু প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। রথো রাফির দুই দশকের কবিতাচর্চা এবং অনুবাদের কাজ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের বিস্তার তুলে ধরে। তাঁর লেখা ও অনুবাদ পাঠের মধ্য দিয়েই নতুন পাঠকেরা এই কবির সৃজনশীল জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।
তথ্যসূত্র
১. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: কবি ও সাংবাদিক রথো রাফি মারা গেছেন
২. চ্যানেল আই অনলাইন: কবি ও সাংবাদিক রথো রাফি মারা গেছেন
৩. প্রতিধ্বনি: অক্ষর ও বালির পৃথিবীতে আপনাকে স্বাগতম — উপল বড়ুয়া





