দাউদ হায়দার ছিলেন বাংলাদেশের কবি, লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তিনি তরুণ কবি হিসেবে পরিচিতি পান এবং দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৫২ সালে পাবনায় জন্ম নেওয়া এই কবি পরবর্তী জীবনের বড় একটি সময় নির্বাসনে কাটিয়েছেন।
একটি কবিতা ও বিতর্ক
১৯৭৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ-এ দাউদ হায়দারের কবিতা “কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়” প্রকাশিত হয়। কবিতাটি প্রকাশের পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। দাউদ হায়দারের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং ১১ মার্চ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, তাকে নিরাপত্তার কারণেও হেফাজতে রাখা হয়েছিল।
ঘটনাটি শুধু একটি কবিতা নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দাউদ হায়দারের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে এবং তার পারিবারিক বাড়িতে আগুন দেওয়ার কথা বিভিন্ন গবেষণা ও স্মৃতিচারণমূলক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগার থেকে কলকাতা
দাউদ হায়দার ২০ মে ১৯৭৪ মুক্তি পান। কিন্তু তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় পরদিন, ২১ মে, তাকে কলকাতাগামী একটি বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে পাঠানো হয়। পরে তিনি আর বাংলাদেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারেননি।
কলকাতায় থাকার সময় তিনি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান। ১৯৮৭ সালে জার্মানিতে চলে যান এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বার্লিনে বসবাস করেন। ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল ৭৩ বছর বয়সে তিনি বার্লিনে মারা যান।
দাউদ হায়দারের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “জন্মই আমার আজন্ম পাপ”, “সম্পন্ন মানুষ আমি নই”, “নরকীয় ভুবনের কবিতা” এবং “যে দেশে সবাই অন্ধ”।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট
১৯৭৪ সালের বিতর্কিত কবিতাটি একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। নির্দিষ্ট কোনো কাব্যগ্রন্থকে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করেছিল—এমন প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনাটিকে “নিষিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ” হিসেবে চিহ্নিত করা সঠিক হবে না। বরং এটি এমন একটি ঘটনা, যেখানে একটি প্রকাশিত কবিতাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় চাপ, গ্রেপ্তার এবং শেষ পর্যন্ত কবির দেশত্যাগ—সবকিছু একই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়।
দাউদ হায়দারের ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কারণ, কোনো লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে বিরোধের পর রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং একজন লেখকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে লেখার অধিকার কীভাবে প্রভাবিত হয়—এই ঘটনাটি সেই প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে আসে।
তথ্যসূত্র
- bdnews24.com — Poet Daud Haider dies in exile in Germany
- The Daily Star — Exiled poet Daud Haider no more
- DW — A life in exile: On the death of Bangladesh poet Daud Haider
- Indian Express — The Auslander is no more: Daud Haider, exiled Bangladeshi poet, dies in Berlin at 73
- Indian Express — In exile, and in poetry, Daud Haider carried his homeland in his heart
- BanglaJOL — গবেষণাপত্রে ১৯৭৪ সালের দাউদ হায়দার ঘটনা ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট





