অনলাইনে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য বিজ্ঞাপন দেখি। খবরের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন সেবায় বিজ্ঞাপন এখন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু একটি বিজ্ঞাপন দেখানোর আগে আমাদের সম্পর্কে কত তথ্য সংগ্রহ করা হয়?
আমরা কোথায় যাই, কোন ওয়েবসাইট দেখি, কোন অ্যাপ ব্যবহার করি কিংবা কোন বিষয়ে আগ্রহী—এসব তথ্য ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বিশাল অবকাঠামোর অংশ হতে পারে।
মূলত ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্যের এই বিশাল বাজার সাংবাদিকদের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং তাঁদের গোপন তথ্যসূত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
Committee to Protect Journalists (CPJ) এবং Harvard Kennedy School-এর Carr-Ryan Center for Human Rights-এর যৌথ বিশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, অনলাইন বিজ্ঞাপনের জন্য গড়ে ওঠা বিপুল তথ্য সংগ্রহের অবকাঠামো নজরদারির নতুন হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এই নজরদারির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এটি সবসময় ফোন হ্যাক বা স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে ঘটতে হয় না।
কখনো কখনো একজন মানুষের ডিজিটাল জীবনের বিভিন্ন অংশ থেকে সংগৃহীত তথ্য একত্র করেই তাঁর চলাফেরা ও আচরণ সম্পর্কে ধারণা তৈরির চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে।
Ad Tech কী?
অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক ব্যবস্থাকে সাধারণভাবে Advertising Technology বা Ad Tech বলা হয়।
একজন ব্যবহারকারী যখন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন বা কোনো অ্যাপ ব্যবহার করেন, তখন তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেমন— ডিভাইসের ধরন; আনুমানিক অবস্থান; কোন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে; অনলাইন আচরণের ধরন; আগ্রহ ও পছন্দ; বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য। আর এই তথ্য ব্যবহার করে একজন ব্যবহারকারীর জন্য উপযোগী বিজ্ঞাপন নির্বাচন করা হয়।
সমস্যা হলো, এই তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া অত্যন্ত বড় এবং জটিল। একজন ব্যবহারকারী অনেক সময় জানেনই না তাঁর সম্পর্কে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে, কারা সেই তথ্য পাচ্ছে কিংবা পরে তা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মোবাইল অ্যাপ ও SDK কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করে?
আমরা প্রতিদিন নানা ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করি। খবরের অ্যাপ, আবহাওয়ার অ্যাপ, গেম, কেনাকাটা, যাতায়াত কিংবা সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপ। এসব অ্যাপের অনেকগুলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপাদান যুক্ত থাকে। এর একটি হলো Software Development Kit বা SDK।
SDK মূলত অ্যাপ নির্মাতাদের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধা যোগ করতে সাহায্য করে। তবে বিজ্ঞাপন, বিশ্লেষণ বা অন্যান্য সেবার জন্য ব্যবহৃত কিছু SDK ব্যবহারকারীর ডিভাইস ও আচরণ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক সময় ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না একটি অ্যাপের সঙ্গে কতগুলো তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি যুক্ত আছে।
এখানেই গোপনীয়তার প্রশ্ন তৈরি হয়। একটি অ্যাপ হয়তো নিজে খুব সাধারণ একটি সেবা দিচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রযুক্তিগত অংশ ব্যবহারকারীর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
Real-Time Bidding: কয়েক মুহূর্তে তথ্যের আদান-প্রদান
অনলাইন বিজ্ঞাপন দেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো Real-Time Bidding বা RTB। সহজভাবে বললে, আপনি কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপ খুললে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য বিভিন্ন পক্ষ প্রতিযোগিতা করে। কে সেই ব্যবহারকারীর সামনে বিজ্ঞাপন দেখাবে, তা নির্ধারণের জন্য দ্রুত bid করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু তথ্য বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার মধ্যে আদান-প্রদান হতে পারে।
যেমন— ডিভাইস সম্পর্কিত তথ্য; আনুমানিক অবস্থান; অনলাইন আচরণের ধরন; আগ্রহ সম্পর্কিত তথ্য; বিজ্ঞাপন শনাক্তকারী বা Advertising ID। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের ব্যবস্থায় তথ্য পাওয়ার জন্য সবসময় বিজ্ঞাপন দেখানোর প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনটি শেষ পর্যন্ত কে দেখাল—সেটি একটি বিষয়। কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখানোর প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীর সম্পর্কিত তথ্য কত পক্ষের কাছে পৌঁছাল, সেটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এ কারণেই RTB ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লোকেশন ডেটা কেন সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
একজন সাংবাদিক কোথায় যান, কার সঙ্গে দেখা করেন বা কোন এলাকায় নিয়মিত কাজ করেন—এই তথ্য তাঁর পেশাগত কাজ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে।
ধরা যাক, একজন সাংবাদিক কোনো দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। তাঁর একটি গোপন তথ্যসূত্র রয়েছে। দুজনেই সতর্ক। তাঁরা ফোনে কথা বলেন না। কোনো ই-মেইলও আদান-প্রদান করেন না। তাঁরা শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে দেখা করেন। কিন্তু দুজনের কাছেই মোবাইল ফোন রয়েছে।
যদি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়, তাহলে দেখা যেতে পারে— সাংবাদিক কোথায় কোথায় যান; নির্দিষ্ট দিনে তিনি কোথায় ছিলেন; একই সময়ে একই স্থানে আর কার ডিভাইস ছিল; একই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর উপস্থিতির এমন মিল বারবার ঘটছে কি না। এ ধরনের তথ্য সাংবাদিক ও সোর্সের মধ্যে সম্পর্কের সরাসরি প্রমাণ নয়। কিন্তু এটি কারা কার সঙ্গে যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ করছেন, সে বিষয়ে অনুসন্ধানের সূত্র দিতে পারে।
এখানেই তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।
Data Broker কারা?
Data Broker হলো এমন প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক সংস্থা, যারা বিভিন্ন উৎস থেকে মানুষের তথ্য সংগ্রহ, একত্র ও বিশ্লেষণ করে। এই তথ্য আসতে পারে— মোবাইল অ্যাপ থেকে; ওয়েবসাইট থেকে; বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি থেকে; অনলাইন সেবা থেকে; অন্যান্য বাণিজ্যিক উৎস থেকে।
বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে একজন ব্যক্তির সম্পর্কে একটি বিস্তারিত ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। একটি উৎস থেকে পাওয়া তথ্য হয়তো খুব বেশি কিছু বলে না। কিন্তু বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করলে একজন মানুষের— চলাফেরা; অভ্যাস; আগ্রহ; সামাজিক সম্পর্ক; ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
এ কারণেই ব্যক্তিগত তথ্যের বাণিজ্যিক বাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—একজন ব্যবহারকারী প্রায়ই জানেন না তাঁর তথ্য কোথায় যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কার হাতে পৌঁছাচ্ছে।
ADINT: বিজ্ঞাপনের তথ্য যখন নজরদারির হাতিয়ার
CPJ-এর প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে—Advertising Intelligence বা ADINT।
সহজভাবে বললে, বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে যখন ব্যক্তি বা ডিভাইসের অবস্থান, চলাফেরা ও আচরণ বিশ্লেষণের জন্য বিশেষায়িত নজরদারি সক্ষমতা তৈরি করা হয়, তাকে ADINT-এর অংশ হিসেবে দেখা হয়।
এই ধরনের সক্ষমতার মাধ্যমে সম্ভাব্যভাবে— নির্দিষ্ট ডিভাইস শনাক্ত; অবস্থান পর্যবেক্ষণ; অতীতের চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ; নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের উপস্থিতির ধরন পরীক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
এটি সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের। কারণ প্রচলিত spyware ফোনে ঢুকলে কোনো না কোনো প্রযুক্তিগত চিহ্ন রেখে যেতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত ডেটা ব্যবহার করে নজরদারি করা হলে সাংবাদিকের ফোনে কোনো ক্ষতিকর সফটওয়্যার থাকার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
অর্থাৎ, সাংবাদিক হয়তো জানতেই পারবেন না তাঁর সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য কোথাও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে কি না।
Advertising ID: নাম না থাকলেও কি পরিচয় গোপন থাকে?
মোবাইল ডিভাইসে বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহৃত একটি শনাক্তকারী থাকতে পারে, যাকে সাধারণভাবে Advertising ID বলা হয়। এতে সরাসরি ব্যবহারকারীর নাম নাও থাকতে পারে। কিন্তু নাম না থাকলেই তথ্য সম্পূর্ণ বেনামি হয়ে যায় না। বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে একটি নির্দিষ্ট ডিভাইস বা ব্যক্তির সঙ্গে সেই তথ্যের সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে।
যেমন— একটি ডিভাইস প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি বাসায় থাকে। প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট অফিস এলাকায় যায়। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় নিয়মিত অবস্থান করে। বিভিন্ন তথ্য একত্র করলে সেই ডিভাইসের ব্যবহারকারী কে হতে পারেন, সে সম্পর্কে অনুমান করা সহজ হতে পারে।
এই কারণেই শুধু নাম মুছে দিলেই ব্যক্তিগত তথ্য পুরোপুরি নিরাপদ বা বেনামি হয়ে যায় না।
AI কীভাবে নজরদারির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে?
আগে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে অনেক সময় ও জনবল প্রয়োজন হতো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI সেই কাজ দ্রুত করার সক্ষমতা তৈরি করেছে। AI বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ডেটার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারে।
এর ফলে বিচ্ছিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে— চলাফেরার ধরন; আচরণের পুনরাবৃত্তি; বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক; সম্ভাব্য পরিচয়; বিভিন্ন মানুষের মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা সহজ হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—AI নিজে নতুন তথ্য তৈরি না করলেও আগে থেকে সংগৃহীত বিপুল তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার ক্ষমতা বাড়াতে পারে। ফলে যে তথ্য আলাদাভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, সেটিও অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে একজন ব্যক্তির বিস্তারিত ডিজিটাল চিত্র তৈরি করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে spyware পৌঁছানোর আশঙ্কা
CPJ-এর প্রতিবেদনে আরও একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। গবেষকরা এমন প্রযুক্তির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি ডিভাইসকে লক্ষ্য করে অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে ক্ষতিকর সফটওয়্যার পৌঁছানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি হতে পারে— প্রথমে একটি নির্দিষ্ট ডিভাইস বা Advertising ID শনাক্ত করা। এরপর বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই ডিভাইসকে লক্ষ্য করা। তারপর লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞাপন অবকাঠামোর মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রযুক্তির দিকে ডিভাইসকে পরিচালিত করার চেষ্টা করা।
তবে এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। এই ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সম্ভাবনা এবং বাস্তবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত আক্রমণ এক বিষয় নয়।
CPJ-এর রিপোর্ট প্রকাশের সময় পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে spyware সংক্রমণের কোনো publicly confirmed ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে প্রযুক্তি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা: এই নজরদারি দেখা যায় না
সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত ফোন হ্যাকিং বা spyware-এর কথা ভাবি। কিন্তু বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
সাংবাদিকের ফোনে— কোনো spyware নাও থাকতে পারে; কোনো hacking-এর প্রমাণ নাও থাকতে পারে; কোনো সন্দেহজনক সফটওয়্যারও নাও পাওয়া যেতে পারে।
তারপরও তাঁর ডিজিটাল আচরণ, ডিভাইস বা অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য অন্য কোনো উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকতে পারে। আর সেই তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। এ কারণেই এই ধরনের নজরদারি শনাক্ত করা কঠিন। এটি অনেকটা অদৃশ্য নজরদারি।
সাংবাদিকদের জন্য একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন
এখানে সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম তাদের ওয়েবসাইট ও অ্যাপ থেকে বিজ্ঞাপন আয় করে। সেই বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য তারাও বিভিন্ন Ad Tech বা advertising ecosystem ব্যবহার করতে পারে। ফলে একটি জটিল প্রশ্ন সামনে আসে।
যে সংবাদমাধ্যম সাংবাদিকদের গোপনীয়তা ও তথ্যসূত্রের নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলে, সেই সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও কি ব্যবহারকারীদের বিজ্ঞাপন-ভিত্তিক tracking ecosystem-এর অংশ?
এটি সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ প্রশ্ন নয়। কিন্তু সাংবাদিক ও পাঠকের গোপনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।
সংবাদমাধ্যমকে ভাবতে হবে— তাদের ওয়েবসাইটে কোন তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি যুক্ত আছে; কোন কোম্পানি ব্যবহারকারীর তথ্য পাচ্ছে; বিজ্ঞাপনের জন্য কী ধরনের tracking হচ্ছে; সাংবাদিক ও পাঠকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় তাদের নীতি কী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে— অনলাইন হয়রানি; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক; ফোন হ্যাকিং; spyware; সাইবার হামলা; ডিজিটাল কনটেন্টের কারণে আইনি ঝুঁকি। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্য।
বাংলাদেশেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই স্মার্টফোন ও অ্যাপ নির্ভর হয়ে উঠছে। সংবাদ পড়া, যাতায়াত, খাবার অর্ডার, কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হচ্ছে।
সাংবাদিকরাও এই একই ডিজিটাল পরিবেশের অংশ। একজন সাংবাদিক কোথায় যাচ্ছেন, কোন অ্যাপ ব্যবহার করছেন কিংবা তাঁর ডিভাইস থেকে কী ধরনের তথ্য তৈরি হচ্ছে—এসব প্রশ্ন তাই সাংবাদিক নিরাপত্তার আলোচনার বাইরের বিষয় নয়। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সোর্স তাঁর নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দিতে পারেন। সাংবাদিক হয়তো তাঁর পরিচয় গোপন রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পেশাগত সতর্কতাও নেন। কিন্তু ডিজিটাল যুগে শুধু ফোনালাপ বা বার্তার গোপনীয়তা রক্ষা করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। সাংবাদিক ও তথ্যসূত্রের ডিজিটাল উপস্থিতি থেকেও বিভিন্ন ধরনের তথ্য তৈরি হয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। বাংলাদেশে অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ওপর নজরদারির নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটছে—এমন কোনো দাবি এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়।
বরং বিষয়টি হলো— বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও একই বৈশ্বিক ডিজিটাল ও বিজ্ঞাপন অবকাঠামোর অংশ। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত এই ঝুঁকিগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
সাংবাদিকরা কী করতে পারেন?
ব্যক্তিগত সতর্কতা সব ঝুঁকি দূর করতে পারে না। কারণ সমস্যাটি একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ডেটা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবুও কিছু পদক্ষেপ ব্যক্তিগত ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
১. অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহার কমান- প্রতিটি অ্যাপ সম্ভাব্যভাবে নতুন একটি তথ্য সংগ্রহের পথ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন নেই এমন অ্যাপ ইনস্টল না করাই ভালো।
২. Location Permission পরীক্ষা করুন – সব অ্যাপের লোকেশন জানার প্রয়োজন নেই। কোন অ্যাপ কখন এবং কেন আপনার অবস্থান জানতে চাইছে তা পরীক্ষা করুন। বিশেষ করে Background Location Permission-এর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
৩. Privacy Settings নিয়মিত পরীক্ষা করুন – মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্টের privacy settings নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। কোন তথ্য শেয়ার হচ্ছে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. Personalized Ads সীমিত করুন – ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুবিধা সীমিত করার সেটিংস ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি সব ধরনের tracking বন্ধ করে না, তবে তথ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক কমাতে সহায়ক হতে পারে।
৫. অপ্রয়োজনীয় third-party connection বন্ধ করুন – অনেক সময় বিভিন্ন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট অন্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
যেসব সংযোগের প্রয়োজন নেই, সেগুলো সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
৬. Tracker ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ব্যবহার করুন – বিশ্বস্ত browser privacy tool বা tracker blocker ব্যবহার করলে ওয়েব ব্রাউজিংয়ের সময় কিছু third-party tracking সীমিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি, browser-এ ব্যবহৃত ad blocker সাধারণত মোবাইল অ্যাপের ভেতরের tracking বন্ধ করতে পারে না।
৭. তথ্যসূত্রের সঙ্গে কাজের সময় ডিজিটাল footprint বিবেচনা করুন – সংবেদনশীল তথ্যসূত্রের সঙ্গে কাজ করার সময় শুধু encrypted messaging যথেষ্ট কি না, সেটিও নতুন করে ভাবতে হবে। সাংবাদিক ও তথ্যসূত্রের— অবস্থান; অ্যাপ ব্যবহার; ডিভাইসের তথ্য; ডিজিটাল আচরণ থেকেও বিভিন্ন ধরনের তথ্য তৈরি হতে পারে।
ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়
সাংবাদিকদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একজন সাংবাদিক সব privacy setting পরিবর্তন করলেও বৃহৎ advertising ecosystem-এর মধ্যে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের সমস্যা থেকে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন বৃহত্তর নীতিগত পদক্ষেপ।
যেমন— ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা; ডেটা ব্যবহারে জবাবদিহি; Data Broker কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ; সাংবাদিক ও তথ্যসূত্রের গোপনীয়তার বিশেষ সুরক্ষা; বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতা; সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব privacy policy শক্তিশালী করা।
সাংবাদিক নিরাপত্তাকে শুধু ব্যক্তিগত ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সমস্যা হয়ে উঠছে।
শেষ কথা
অনলাইন বিজ্ঞাপন আমাদের কাছে সাধারণ একটি ডিজিটাল সেবা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য গড়ে ওঠা তথ্য সংগ্রহের বিশাল ব্যবস্থাই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নজরদারি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিক শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য কাজ করেন না। তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকে তথ্যসূত্র, সহকর্মী এবং সংবেদনশীল তথ্য। একজন সাংবাদিকের ডিজিটাল চলাচল সম্পর্কে তথ্য থেকে যদি তাঁর সোর্স সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সমস্যা নয়।
এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং তথ্যসূত্রের সুরক্ষার প্রশ্ন। তাই সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রশ্ন শুধু ফোন নিরাপদ কি না—তা নয়।
প্রশ্ন হলো— আমাদের ডিজিটাল জীবন থেকে কত তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে? সেই তথ্য কোথায় যাচ্ছে? কারা সেই তথ্য ব্যবহার করতে পারে?
ডিজিটাল যুগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই তাই শুধু সেন্সরশিপ, মামলা, গ্রেপ্তার বা সরাসরি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নয়। এটি ক্রমেই হয়ে উঠছে অদৃশ্য নজরদারির বিরুদ্ধেও একটি লড়াই।
তথ্যসূত্র
- Committee to Protect Journalists (CPJ). How mass surveillance from online advertising puts journalists at risk. August 27, 2026. Read the report
- Carr-Ryan Center for Human Rights, Harvard Kennedy School. How Mass Surveillance From Online Advertising Puts Journalists at Risk. August 27, 2026. Read the Harvard publication
- Committee to Protect Journalists (CPJ). Protecting against advertising technology. Safety Notes, August 27, 2026. Read the safety guidance





