October 29, 2026 1:42 pm
October 29, 2026 1:42 pm

সাংবাদিক নিবন্ধন কি রাষ্ট্রীয় অনুমতির পথে নিয়ে যাবে?

সাংবাদিক নিবন্ধন কি রাষ্ট্রীয় অনুমতির পথে নিয়ে যাবে?

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সংশোধনীর মধ্যে সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, বার কাউন্সিলের মতো সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু, মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও নীতিনৈতিকতাবিরোধী সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানা এবং গুজব, ভুয়া খবর, ঘৃণামূলক বক্তব্য বা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত সংবাদ বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলের স্বপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য হিসেবে সরকার সাংবাদিকতার পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর কথা বলছে। সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলার কথাও সরকার জানিয়েছে।

তবে এই প্রস্তাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন হলো—সাংবাদিক নিবন্ধন কি কেবল পেশাগত পরিচয় ও স্বীকৃতির ব্যবস্থা হবে, নাকি ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা করার জন্য রাষ্ট্রীয় অনুমতির শর্তে পরিণত হবে?

এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির General Comment No. 34-এর ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের জন্য সাধারণ রাষ্ট্রীয় registration বা licensing ব্যবস্থা ICCPR-এর Article 19-এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। তবে নির্দিষ্ট স্থান বা অনুষ্ঠানে বিশেষ প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য সীমিত accreditation ব্যবস্থা বৈধ হতে পারে, যদি তা বৈষম্যহীন, বস্তুনিষ্ঠ ও প্রয়োজনভিত্তিক হয়।

অতএব, সাংবাদিকদের পেশাগত মান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ যদি সাংবাদিকতা করার অধিকারকে রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন, লাইসেন্স, অনুমোদন বা নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকাশ্য আইন ও গেজেট ভাণ্ডারে প্রস্তাবিত The Press Council (Amendment) Act, 2026-এর পূর্ণাঙ্গ সরকারি খসড়া বা গেজেটের প্রকাশ্য কপি পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারের সংসদীয় বক্তব্য ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে প্রস্তাবটির বিষয়বস্তু জানা গেলেও এর নির্দিষ্ট ধারাগুলো এখনো স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

১. প্রস্তাব

৮ জুলাই ২০২৬ জাতীয় সংসদে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকার ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইনকে যুগোপযোগী করে প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও গণমাধ্যমবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে।

সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী প্রস্তাবিত সংশোধনীর মধ্যে রয়েছে—

  • সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ;
  • বার কাউন্সিলের মতো সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা;
  • মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও নীতিনৈতিকতাবিরোধী সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানা;
  • গুজব, ভুয়া খবর, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী সংবাদ বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলের স্বপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা;
  • সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা।

The Daily Star-ও সংসদে দেওয়া মন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে একই বিষয়গুলো জানিয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরকার মোবাইল সাংবাদিকদের জন্য আলাদা licensing system চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়নি—মন্ত্রী সংসদে এ কথাও বলেছেন। ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হতে পারে বলে তিনি জানান।

তাই বর্তমান প্রস্তাবকে সরাসরি “সাংবাদিকদের লাইসেন্স ব্যবস্থা” বলা সঠিক হবে না। বর্তমানে প্রকাশ্য সরকারি বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দ হলো journalist registration system।

২. প্রস্তাবটি এখনো আইন নয়

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি আইন, গেজেট ও Press Council-এর আইনভাণ্ডারে এর পূর্ণাঙ্গ আইন বা গেজেট পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে যে তথ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো মূলত— জাতীয় সংসদে সরকারের দেওয়া বক্তব্য; দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন; Press Council-এর বিদ্যমান কার্যক্রম; এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড।

অতএব, প্রস্তাবিত সংশোধনীর নির্দিষ্ট ধারা, নিবন্ধনের শর্ত, নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা, আপিলের সুযোগ, নিবন্ধন ছাড়া সাংবাদিকতা করা যাবে কি না—এসব এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

৩. সাংবাদিক নিবন্ধন, লাইসেন্স ও accreditation এক জিনিস নয়। 

প্রস্তাবিত সংশোধনীর terminology বা পরিভাষা-

Registration- কোনো পেশাজীবীর নাম, পরিচয় বা পেশাগত তথ্য একটি তালিকায় রাখা।

Licensing – কোনো পেশা করার জন্য রাষ্ট্রীয় অনুমতি নেওয়া। অনুমতি না থাকলে সেই পেশা করা বেআইনি হতে পারে।

Accreditation- কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, স্থান বা অনুষ্ঠানে পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশেষ প্রবেশাধিকার দেওয়া।

এই তিনটি ব্যবস্থাকে এক করে দেখা উচিত নয়।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো সাংবাদিকের একটি professional card থাকতে পারে। কিন্তু সেই card না থাকলে তিনি সাংবাদিকতা করতে পারবেন না—এমন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। সুতরাং বাংলাদেশের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে চারটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:

প্রথমত, নিবন্ধন কি বাধ্যতামূলক হবে? দ্বিতীয়ত, নিবন্ধিত না হলে কেউ সাংবাদিকতা করতে পারবেন কি না? তৃতীয়ত, নিবন্ধনের কর্তৃপক্ষ কতটা স্বাধীন হবে? চতুর্থত, নিবন্ধন বাতিল হলে সাংবাদিকের আপিলের স্বাধীন ও কার্যকর সুযোগ থাকবে কি না? পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই চারটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

৪. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অবস্থান

বাংলাদেশ International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর রাষ্ট্রপক্ষ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ICCPR-এর Article 19-এর অধীনে সুরক্ষিত। জাতিসংঘের Human Rights Committee-এর General Comment No. 34 সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, journalism একটি function—যা শুধু full-time professional journalist-দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে professional reporters ও analysts-এর পাশাপাশি bloggers এবং বিভিন্ন ধরনের self-publisher-ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। একই অনুচ্ছেদে Human Rights Committee স্পষ্টভাবে বলেছে যে সাংবাদিকদের জন্য সাধারণ রাষ্ট্রীয় registration বা licensing ব্যবস্থা Article 19-এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

তবে নির্দিষ্ট জায়গা বা অনুষ্ঠানে বিশেষ প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন হলে সীমিত accreditation ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সেই ব্যবস্থাকে হতে হবে— বৈষম্যহীন; বস্তুনিষ্ঠ; প্রয়োজনভিত্তিক; ও Article 19-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অতএব, আন্তর্জাতিক আইনের মূল পার্থক্যটি হলো: Professional recognition গ্রহণযোগ্য হতে পারে; কিন্তু journalism করার অধিকারকে সাধারণ রাষ্ট্রীয় অনুমতির অধীন করা সমস্যাজনক।

৫. সাংবাদিকতার সংজ্ঞা ও ডিজিটাল যুগ

আজ সাংবাদিকতা শুধু সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের newsroom-এ সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, freelance সাংবাদিক, investigative journalist, blogger, independent publisher এবং citizen journalism-এর বিভিন্ন রূপ এখন তথ্য পরিবেশের অংশ। জাতিসংঘের Human Rights Committee-ও General Comment No. 34-এ journalism-এর এই বিস্তৃত চরিত্র স্বীকার করেছে।

এ কারণে যদি সাংবাদিকতার পেশাগত নিবন্ধন এমনভাবে তৈরি হয় যে কেবল নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন, তাহলে freelance, rural, community, digital ও independent সাংবাদিকরা বাদ পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অনেক স্থানীয় সাংবাদিক আনুষ্ঠানিক journalism degree ছাড়াই দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন। আবার অনেক তরুণ digital journalist প্রচলিত newsroom-এর বাইরে কাজ করছেন। তাই ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের উদ্দেশ্য যদি পেশাগত মান উন্নয়ন হয়, তবে তা যেন journalism করার অধিকার সীমিত করার উপায়ে পরিণত না হয়।

৬. UNESCO-এর অবস্থান কী?

১০ মে ২০২৬-এর Bangladesh Journalism Conference-এ UNESCO-এর freedom of expression and media regulation expert Joan Barata Mir বলেন, media self-regulation একটি ethical responsibility এবং তা state control-এর বাইরে থাকা উচিত। তিনি বাংলাদেশের বিদ্যমান licensing ও Press Council কাঠামোর সঙ্গে international norms-এর কিছু অসঙ্গতির কথাও উল্লেখ করেন।

এটি বাংলাদেশের বর্তমান প্রস্তাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে—কিন্তু সেই দায়িত্বের কেন্দ্র হওয়া উচিত স্বাধীন ও অংশগ্রহণমূলক self-regulation, সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়।

৭. দেশীয় প্রতিক্রিয়া: এখন পর্যন্ত কী পাওয়া গেছে?

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত BFUJ, DUJ বা Editors’ Council-এর পক্ষ থেকে এই ২০২৬ সালের সাংবাদিক নিবন্ধন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বা পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতি আমি পাইনি।

তবে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে।

১৭ মে ২০২৬ Editors’ Council-এর নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনের অগণতান্ত্রিক বিধান বাতিল বা সংশোধনের দাবি জানান। একই আলোচনায় Press Council শক্তিশালী করা, সাংবাদিকদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং fact-checking ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এটি দেখায় যে Editors’ Council একদিকে সাংবাদিকতার জবাবদিহি ও Press Council-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধির প্রয়োজন স্বীকার করছে, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন আইনগত বিধান নিয়ে সতর্ক।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ Press Council-এর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন। The Daily Star-এ প্রকাশিত তাঁর একটি বিশ্লেষণে ২০২২ সালের Press Council amendment proposal নিয়ে তিনি বলেন, আইনটি চূড়ান্ত করার আগে media bodies ও journalist unions-এর সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। তিনি Press Council-কে এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন, যা একই সঙ্গে press freedom রক্ষা এবং public interest নিশ্চিত করতে পারে।

২০২৬ সালের Bangladesh Journalism Conference-এও তিনি Press Council-এর কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা করেন এবং বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি।

৮. ২০২২ সালের অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

২০২২ সালে সরকার Press Council Act সংশোধনের একটি খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেছিল। প্রথম আলো-এর ২০ জুন ২০২২-এর প্রতিবেদনে মন্ত্রিসভায় খসড়াটির নীতিগত অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে false journalism মোকাবিলা এবং Press Council-এর ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় ছিল।

The Daily Star-এর ২০২২ সালের প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত আইনে Press Council-এর জরিমানা আরোপ এবং স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সময়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সংগঠন ও media bodies-এর সঙ্গে পরামর্শের দাবি ওঠে।

অতএব, ২০২৬ সালের উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে Press Council-এর ক্ষমতা পুনর্গঠন নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনগত বিতর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়।

৯. সাংবাদিকদের নিবন্ধনের সম্ভাব্য সুবিধা

পেশাগত পরিচয়ের স্বীকৃতি- একটি নির্ভরযোগ্য professional register থাকলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পরিচয় যাচাই সহজ হতে পারে।

পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন- ন্যূনতম competency standards এবং প্রশিক্ষণ সাংবাদিকতার মান উন্নত করতে পারে।

ভুয়া সাংবাদিক পরিচয় মোকাবিলা – সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, চাঁদাবাজি বা হয়রানির মতো ঘটনা মোকাবিলায় একটি স্বচ্ছ professional identification system সহায়ক হতে পারে।

পেশাগত জবাবদিহি- একটি স্বাধীন self-regulatory ব্যবস্থা থাকলে সাংবাদিকতার নৈতিক মান ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কাঠামো উন্নত হতে পারে। কিন্তু এসব সুবিধা পেতে রাষ্ট্রীয় licensing system অপরিহার্য নয়।

১০. সম্ভাব্য ঝুঁকি

 নিবন্ধন সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত হয়ে যাওয়া- এটি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। যদি বলা হয়—“নিবন্ধিত না হলে সাংবাদিকতা করা যাবে না”—তাহলে registration কার্যত licensing-এর রূপ নিতে পারে। এটি General Comment No. 34-এর সঙ্গে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।

রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব – যদি Press Council-এর ওপর সরকারের অতিরিক্ত প্রভাব থাকে, তাহলে নিবন্ধন বাতিল বা স্থগিতের ক্ষমতা সাংবাদিকদের ওপর চাপ তৈরির উপায় হতে পারে।

সংজ্ঞার সমস্যা- “সাংবাদিক” কাকে বলা হবে?

  • newspaper journalist?
  • TV journalist?
  • online journalist?
  • freelancer?
  • blogger?
  • independent investigative journalist?
  • citizen journalist?

সংজ্ঞা সংকীর্ণ হলে বিপুলসংখ্যক digital ও independent journalist বাদ পড়তে পারেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা- ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা পেশাগত দক্ষতার একমাত্র সূচক নয়। একজন সাংবাদিকের দক্ষতা নির্ধারণে অভিজ্ঞতা, reporting ability, verification, ethics, public-interest journalism এবং professional conduct বিবেচনা করা যেতে পারে।

স্বপ্রণোদিত তদন্তের অপব্যবহার- গুজব, fake news, hate speech বা “জাতীয় স্বার্থবিরোধী” সংবাদ নিয়ে Press Council-এর স্বপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হলে সংজ্ঞাগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে “national interest” যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রকৃত হুমকির মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হতে পারে।

১১. আন্তর্জাতিক মডেল:

ফ্রান্সে professional press card রয়েছে, কিন্তু এটি সাংবাদিকতা করার বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স নয়। যুক্তরাজ্যেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের professional identification ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সাধারণভাবে সাংবাদিকতা করার জন্য রাষ্ট্রীয় accreditation বাধ্যতামূলক নয়।

ভারতে সরকারি accreditation ব্যবস্থা মূলত সরকারি তথ্য ও নির্দিষ্ট সরকারি কার্যক্রমে প্রবেশের সুবিধার সঙ্গে যুক্ত। ইন্দোনেশিয়ায় Press Council-এর journalist competency system রয়েছে, যার উদ্দেশ্য professional standards উন্নত করা; এটিকে সাংবাদিকতার অধিকার সীমিত করার ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার কথা নয়।

এই মডেলগুলোর মূল শিক্ষা হলো:- Professional standard তৈরি করা যায়, কিন্তু journalism-এর স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় permission-এর ওপর নির্ভরশীল না করেও তা করা সম্ভব। তাই আমাদের উচিত হবে professional recognition এবং state permission-এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা।

১২. FOEBD-এর নীতিগত মূল্যায়ন 

FOEBD-এর দৃষ্টিতে সাংবাদিকদের পেশাগত মান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগকে সরাসরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী বলা যাবে না।

বরং বাংলাদেশে— সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, fact-checking, newsroom ethics, correction policy, conflict-of-interest rules, public complaints mechanism, সাংবাদিক নিরাপত্তা, legal protection আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কিন্তু এই উদ্দেশ্য পূরণে রাষ্ট্রীয় নিবন্ধনকে সাংবাদিকতা করার পূর্বশর্ত করা উচিত নয়।

স্বাধীন Professional Journalist Register একটি কার্যকর মডেল হতে পারে: 

এটি পরিচালিত হতে পারে এমন একটি স্বাধীন কাঠামোর মাধ্যমে যেখানে থাকবে—

  • সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি;
  • সম্পাদকদের প্রতিনিধি;
  • সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি;
  • freelance ও digital সাংবাদিকদের প্রতিনিধি;
  • journalism educators;
  • স্বাধীন মানবাধিকার/মতপ্রকাশ বিশেষজ্ঞ।

নিবন্ধনের criteria হতে হবে প্রকাশ্য ও objective। নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের ক্ষেত্রে লিখিত কারণ দিতে হবে। স্বাধীন appeal mechanism থাকতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— নিবন্ধন না থাকলেও একজন ব্যক্তি সাংবাদিকতা করতে পারবেন।

নিবন্ধিত সাংবাদিকের professional benefits থাকতে পারে—যেমন বিশেষ event access, training, professional card, insurance বা অন্যান্য সুবিধা। কিন্তু নিবন্ধনকে journalism-এর licence বানানো উচিত নয়।

১৩. খসড়া প্রকাশের প্রয়োজন

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করা। কারণ সাংবাদিক নিবন্ধনের মতো মৌলিক বিষয়ে শুধু সরকারের সারসংক্ষেপ যথেষ্ট নয়। জনসমক্ষে খসড়া প্রকাশ হলে সাংবাদিক, সম্পাদক, আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক ও সাধারণ নাগরিক দেখতে পারবেন—

  • সাংবাদিকের সংজ্ঞা কী;
  • registration বাধ্যতামূলক কি না;
  • qualification কী;
  • registration authority কে;
  • registration প্রত্যাখ্যানের কারণ কী;
  • registration বাতিল করা যাবে কি না;
  • কে বাতিল করবে;
  • appeal কোথায় হবে;
  • Press Council-এর তদন্তের সীমা কী;
  • “fake news”, “hate speech” ও “national interest” কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে;
  • জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা কী;
  • সাংবাদিকের স্বাধীনতা রক্ষায় কী safeguards থাকবে।

এই তথ্য ছাড়া প্রস্তাবটির পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার ও সাংবিধানিক মূল্যায়ন করা কঠিন।

১৪. FOEBD-এর সুপারিশ

পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ- সরকারের উচিত প্রস্তাবিত Press Council Amendment-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করা।

সাংবাদিকতা করার অধিকার রক্ষা- Registration-কে journalism-এর পূর্বশর্ত করা উচিত নয়।

Registration ও licensing আলাদা রাখা- Professional identification-এর সঙ্গে journalism করার legal permission-কে এক করা উচিত নয়।

স্বাধীন কর্তৃপক্ষ- নিবন্ধন ব্যবস্থা থাকলে তার প্রশাসনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে রাজনৈতিক ও সরকারি প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

অংশগ্রহণমূলক consultation- আইন চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, media owners, freelance journalists, digital journalists, legal experts এবং civil society-এর সঙ্গে প্রকাশ্য consultation করা উচিত।

আপিলের অধিকার- নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান, স্থগিত বা বাতিলের বিরুদ্ধে স্বাধীন appeal mechanism থাকতে হবে।

স্পষ্ট সংজ্ঞা- “journalist”, “fake news”, “hate speech”, “harassing report” ও “national interest”-এর মতো শব্দের অস্পষ্ট ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে।

self-regulation শক্তিশালী করা- নৈতিকতা ও পেশাগত জবাবদিহির ক্ষেত্রে media self-regulation-কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

সাংবাদিকদের competency উন্নয়ন- নিবন্ধনের বদলে প্রশিক্ষণ, competency certification এবং continuous professional development-এর ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ- চূড়ান্ত আইন ICCPR Article 19 এবং UN Human Rights Committee-এর General Comment No. 34-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা উচিত।

উপসংহার

সাংবাদিকতার পেশাগত মান উন্নত করা প্রয়োজন—এ বিষয়ে বিতর্কের খুব বেশি জায়গা নেই। বাংলাদেশে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, ভুল তথ্য, অযাচাইকৃত সংবাদ, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং পেশাগত দক্ষতা নিয়ে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকতা করা যাবে না—এমন ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত মান উন্নয়নের ব্যবস্থা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত Press Council amendment-এর ক্ষেত্রে তাই মূল পরীক্ষাটি হবে registration শব্দটি নয়; বরং registration-এর আইনগত পরিণতি কী। যদি এটি হয় একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও পেশাগত পরিচয়ভিত্তিক ব্যবস্থা—যেখানে নিবন্ধন সাংবাদিকের অতিরিক্ত পেশাগত সুবিধা দেবে, কিন্তু সাংবাদিকতা করার অধিকার কেড়ে নেবে না—তাহলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

যদি registration কার্যত journalism-এর licence হয়ে যায়, অথবা নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে কোনো সাংবাদিককে সাংবাদিকতা থেকে বিরত রাখার ক্ষমতা সৃষ্টি হয়, তাহলে তা Article 19-এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।

 

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) — “Govt not support unethical activities in name of mobile journalism: Info Minister” (8 July 2026)
২. প্রথম আলো — “মোবাইল জার্নালিজমের নামে অনৈতিক কার্যক্রম সরকার সমর্থন করে না: সংসদে তথ্যমন্ত্রী” (৮ জুলাই ২০২৬)
৩. UN Human Rights Committee — General Comment No. 34: Article 19, Freedoms of opinion and expression

৪. UNESCO — Bangladesh Journalism Conference 2026 সংক্রান্ত প্রতিবেদন

৫. The Daily Star — “Cabinet approves Press Council (Amendment) Act-22 draft in principle” (20 June 2022)

৬. প্রথম আলো — ২০২২ সালের Press Council Act সংশোধনী উদ্যোগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশ্লেষণ/প্রতিবেদন

৭. The Daily Star — “Press council act: Amendments go against views of stakeholders” (2022)
৮. বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল — Official Website / আইন ও বিধিমালা

 

নোট:-

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রস্তাবিত The Press Council (Amendment) Act, 2026-এর পূর্ণাঙ্গ সরকারি খসড়া বা গেজেটের প্রকাশ্য কপি পাওয়া যায়নি। তাই এই প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত বিধানগুলোকে চূড়ান্ত আইনি ধারা হিসেবে নয়, সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।


ডিজিটাল যুগে সাংবাদিক কে?
প্রতিবেদন

ডিজিটাল যুগে সাংবাদিক কে?

সাংবাদিকের অধিকার জানুন (পর্ব-৪) একসময় সাংবাদিকতা বলতে মূলত সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের কথা বোঝানো হতো। এখন সেই সময় বদলে গেছে। এখন নিজের হাতে থাকা একটি স্মার্টফোন

বিস্তারিত »
মতপ্রকাশের অধিকার ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব
প্রতিবেদন

মতপ্রকাশের অধিকার ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব

সাংবাদিকের অধিকার জানুন (পর্ব-৩) মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। সাংবাদিকতা এই অধিকারকে বাস্তবে কার্যকর করার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। সাংবাদিক সমাজের নানা ঘটনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার

বিস্তারিত »
সাংবাদিক কে?
প্রতিবেদন

সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশ ও ডিজিটাল সমাজ

সাংবাদিকের অধিকার জানুন (পর্ব-২) সাংবাদিক কে? — আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী বলে? সাংবাদিক হতে কি কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রি লাগবে? প্রেস কার্ড থাকতে হবে? কোনো সংবাদমাধ্যমে চাকরি করতে

বিস্তারিত »
সাংবাদিকের মানসিক নিরাপত্তা কোথায়?
গবেষণা

সাংবাদিকের মানসিক নিরাপত্তা কোথায়? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু যে প্রশ্ন সামনে আনল

একজন সাংবাদিক প্রতিদিন অন্য মানুষের গল্প লেখেন। অন্যায়, দুর্নীতি, সহিংসতা, মানুষের কষ্ট এবং জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনেন। কিন্তু সেই সাংবাদিক নিজেই যখন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, পেশাগত অনিশ্চয়তা,

বিস্তারিত »
অনলাইন বিজ্ঞাপনের আড়ালে নজরদারি: সাংবাদিক ও তথ্যসূত্র কতটা ঝুঁকিতে?
প্রতিবেদন

অনলাইন বিজ্ঞাপনের আড়ালে নজরদারি: সাংবাদিক ও তথ্যসূত্র কতটা ঝুঁকিতে?

অনলাইনে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য বিজ্ঞাপন দেখি। খবরের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন সেবায় বিজ্ঞাপন এখন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু একটি বিজ্ঞাপন দেখানোর আগে আমাদের

বিস্তারিত »
মিডিয়া ও গণমাধ্যম

বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারের সুযোগ, আবেদন ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য এসেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের সুযোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে Fetisov Journalism Awards 2026-এর জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশি

বিস্তারিত »