October 29, 2026 2:30 pm
October 29, 2026 2:30 pm

‘সংস্কৃতির সংকট’: নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বদরুদ্দীন উমরের বই

‘সংস্কৃতির সংকট’: নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বদরুদ্দীন উমরের বই

‘সংস্কৃতির সংকট’-এ বাঙালি সংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি, ঊনিশ শতকে মুসলিম শিক্ষা ও মাতৃভাষা চর্চা, একুশে ফেব্রুয়ারি ও সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার মাধ্যম, ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বইটির বর্তমান অনলাইন পাঠে এই অধ্যায়গুলোর তালিকা রয়েছে।

বইটির মুখবন্ধে বদরুদ্দীন উমর পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, নিজেদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি, নৈরাজ্য ও হতবুদ্ধিতার পেছনে দীর্ঘদিনের কুসংস্কার ও হীনমন্যতার প্রভাব রয়েছে। এই মুখবন্ধের তারিখ ১১ মে ১৯৭৪। বইটির আলোচনায় ‘আমরা বাঙালি, না মুসলমান?’—এই প্রশ্নটিও এসেছে। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত বইটির একটি অংশ উদ্ধৃত করে পরবর্তী এক আলোচনায় বলা হয়েছে, বদরুদ্দীন উমর প্রশ্নটিকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থহীন হিসেবে দেখিয়েছিলেন।

পাকিস্তান আমলে বইটি নিয়ে সরকারি পদক্ষেপ

বদরুদ্দীন উমরের ষাটের দশকের বইগুলো প্রকাশের সময় পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে তাঁর বিরোধের বিষয়টি পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।

The Business Standard-এর একটি জীবনীমূলক লেখায় বলা হয়েছে, ১৯৬০-এর দশকের শেষার্ধের সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে কয়েকটি বই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; সেই তালিকায় ‘সংস্কৃতির সংকট’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’-র নামও উল্লেখ করা হয়েছে। একই লেখায় বলা হয়েছে, উমরের পিতা আবুল হাশিম এসব ঘটনায় বক্তৃতা ও বিবৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছিলেন।

যুগান্তর-এর একটি লেখায়ও ‘সংস্কৃতির সংকট’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’, আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’, সত্যেন সেনের ‘আলবেরুনী’ এবং ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর ‘জেলে তিরিশ বছর’—এই বইগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একই সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে পাওয়া সব সূত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ধরন একভাবে বর্ণিত হয়নি। ফলে ‘নিষিদ্ধ’ এবং ‘বাজেয়াপ্ত’ শব্দ দুটি সব ক্ষেত্রে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়নি।

সমকালীন প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট

১৯৬৯–৭০ সালের বই-নিষেধাজ্ঞার ঘটনাবলি নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে বদরুদ্দীন উমরের বইগুলোর নাম এসেছে। তবে পাওয়া প্রকাশ্য সূত্রগুলোর মধ্যে কোনটি সরাসরি সরকারি নিষেধাজ্ঞার আদেশের পূর্ণ পাঠ, আর কোনটি পরবর্তী সংবাদ বা স্মৃতিচারণ—এই পার্থক্যটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বদরুদ্দীন উমরের রচনাবলি সম্পর্কিত একটি গ্রন্থপাঠে ষাটের দশকের তাঁর বইগুলোর প্রকাশকাল দেওয়া হয়েছে: ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭) এবং ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯)।

অন্যদিকে, ওই রচনাবলীর তথ্যসূত্রে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’-র ক্ষেত্রে সরকারি বাজেয়াপ্তির নোটিশের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘সংস্কৃতির সংকট’-এর ক্ষেত্রে একই নথিতে একই ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। এই পার্থক্যটি নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতার পর বইটির পুনঃপ্রকাশ

পাকিস্তান আমলের ঘটনাটির পর ‘সংস্কৃতির সংকট’ বাংলাদেশে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান অনলাইন পাঠে বইটির শুরুতেই ‘তৃতীয় মুদ্রণের ভূমিকা’ রয়েছে, যা বইটির একাধিক মুদ্রণের প্রমাণ দেয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম কলেজের একটি গবেষণা-জার্নালে বইটির উদ্ধৃতি হিসেবে ‘সংস্কৃতির সংকট, চতুর্থ প্রকাশ; ডিসেম্বর ১৯৮৪, মুক্তধারা, ঢাকা’ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালেও বইটির একটি নতুন প্রকাশনা সংস্করণ ছিল।

পরবর্তী গবেষণামূলক লেখাতেও মুক্তধারা প্রকাশনী, ১৯৮৪ সংস্করণের উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমানে বইটির অনলাইন পাঠও পাওয়া যায় এবং বইটি পরবর্তী সময়ে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

বইটির বর্তমান অবস্থান

‘সংস্কৃতির সংকট’ বর্তমানে পুনর্মুদ্রিত ও পাঠযোগ্য একটি বই। ১৯৮৪ সালের সংস্করণের পাশাপাশি পরবর্তী মুদ্রণের উল্লেখও পাওয়া যায়। পাকিস্তান আমলে বইটির ওপর যে নিষেধাজ্ঞার কথা পরবর্তী সূত্রগুলোতে বলা হয়েছে এবং স্বাধীনতার পর বইটির পুনঃপ্রকাশ—এই দুই তথ্য একই বইয়ের প্রকাশনা-ইতিহাসের অংশ।

FOEBD-এর নথি

‘সংস্কৃতির সংকট’-এর ক্ষেত্রে পাওয়া নথিতে তিনটি বিষয় আলাদাভাবে দেখা যায়— প্রথমত, বইটি ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়।দ্বিতীয়ত, পরবর্তী বিভিন্ন সূত্রে পাকিস্তান আমলে বইটিকে নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয়ত, স্বাধীনতার পর বইটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে; ১৯৮৪ সালের মুক্তধারা সংস্করণের তথ্য পাওয়া যায় এবং পরবর্তী মুদ্রণেরও উল্লেখ রয়েছে। এই তথ্যগুলো ‘সংস্কৃতির সংকট’-এর প্রকাশনা ও নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসের প্রধান নথিভুক্ত উপাদান।

তথ্যসূত্র

 


‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ

১৯২৪ সালের অক্টোবর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। বইটির সব কপি জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের অভিযোগ

বিস্তারিত »
‘যুগবাণী’: নজরুলের যে বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘যুগবাণী’: নজরুলের যে বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার

১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বইটির সব কপি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া

বিস্তারিত »
পাকিস্তান আমলে নিষেধাজ্ঞা ও বাজেয়াপ্তির মুখে পড়া সত্যেন সেনের ‘আলবেরুনী’-র প্রতীকী চিত্র।
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘আলবেরুনী’: পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ এক ঐতিহাসিক উপন্যাস

সত্যেন সেন ছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক সংগ্রাম—দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি শ্রমিক

বিস্তারিত »
‘সত্যের মতো বদমাশ’: অশ্লীলতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত এক গল্পগ্রন্থ
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘সত্যের মতো বদমাশ’: অশ্লীলতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত এক গল্পগ্রন্থ

আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক। ১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক ষাটের দশকেই বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র

বিস্তারিত »
১৯৮৩ সালে সামরিক শাসনের সময়ে মিনার মনসুরের ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ বাজেয়াপ্ত হওয়ার প্রতীকী চিত্র।
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’: সামরিক শাসনে বাজেয়াপ্ত এক কাব্যগ্রন্থ

মিনার মনসুর বাংলাদেশের কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। তাঁর জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বরলিয়া গ্রামে। লেখালেখির শুরু সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ

বিস্তারিত »
একটি কবিতা, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও দীর্ঘ নির্বাসনের প্রতীকী চিত্র।
তথ্যভাণ্ডার

দাউদ হায়দার: একটি কবিতা, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও নির্বাসন — ১৯৭৪

দাউদ হায়দার ছিলেন বাংলাদেশের কবি, লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তিনি তরুণ কবি হিসেবে পরিচিতি পান এবং দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।

বিস্তারিত »