October 29, 2026 2:29 pm
October 29, 2026 2:29 pm

‘সত্যের মতো বদমাশ’: অশ্লীলতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত এক গল্পগ্রন্থ

‘সত্যের মতো বদমাশ’: অশ্লীলতার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত এক গল্পগ্রন্থ

আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক। ১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক ষাটের দশকেই বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, নাটক ও সম্পাদনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজ রয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

১৯৬৮ সালে, মাত্র ২৫ বছর বয়সে, তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাশ’ প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর সাহিত্যাঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পদক্ষেপের মুখে পড়ে।

কেন বইটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল?

বিভিন্ন সাহিত্যিক ও জীবনীমূলক সূত্রে বলা হয়েছে, অশ্লীলতার অভিযোগে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে সরকারি নথির যে তথ্য বর্তমানে প্রকাশ্য সূত্রে পাওয়া যায়, সেখানে বিষয়টি আরও নির্দিষ্টভাবে দেখা যায়।

১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশিত কয়েকটি বই নিয়ে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। কিছু বইয়ের প্রকাশককে “কেন বইগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে না”—এমন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এই তালিকায় ‘সত্যের মতো বদমাশ’-এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি বইয়ের নাম ছিল।

পরবর্তী সময়ে ৭ জানুয়ারি ১৯৭০ তারিখে দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত ‘পুস্তক বাজেয়াপ্তি প্রসঙ্গে সরকারের বক্তব্য’-এর উদ্ধৃতি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত বইগুলোর মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’ বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। অন্য কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে তখনও কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব বিবেচনাধীন ছিল।

গল্পটি কী নিয়ে?

গল্পগ্রন্থটির নামও একটি গল্পের নাম থেকে এসেছে। ‘সত্যের মতো বদমাশ’ গল্পে একটি কিশোর তার মায়ের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে যায়। সেখানে নানা দৃশ্য ও মানুষের আচরণের মধ্য দিয়ে সে সমাজের অন্ধকার দিকের মুখোমুখি হয়।

গল্পের একটি অংশে কিশোরের মা হারিয়ে যায় এবং পরে কিশোর নিজেই সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। গল্পটি মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা, যৌন সহিংসতা এবং সামাজিক অন্ধকারকে সামনে আনে।

এই বিষয়বস্তু এবং ভাষার কারণেই বইটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে বলে বিভিন্ন সাহিত্যিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সরকারি বাজেয়াপ্তির মূল আদেশ বা তার নির্দিষ্ট আইনি ধারা প্রকাশ্য অনলাইন উৎসে আমরা এখনো শনাক্ত করতে পারিনি। তাই FoEBD-এর নথিতে অভিযোগ ও সরকারি পদক্ষেপ—দুটিকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।

লেখকের সাহিত্যিক পথ

‘সত্যের মতো বদমাশ’ বাজেয়াপ্ত হওয়ার পরও আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যিক পথ থেমে যায়নি। তিনি পরবর্তী সময়ে ‘চলো যাই পরোক্ষে’, ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’, ‘পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী’, ”অ-তে অজগর’’ সহ বহু গল্প, উপন্যাস ও কবিতা লিখেছেন। একই সঙ্গে জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। এক অর্থে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরুতেই যে বইটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মুখে পড়েছিল, সেটিই পরে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মূল্যায়ন

‘সত্যের মতো বদমাশ’ বাংলাদেশের পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, বইটি অশ্লীলতার অভিযোগে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মুখে পড়ে—এমন তথ্য একাধিক সাহিত্যিক সূত্রে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৭০ সালের সরকারি বক্তব্য উদ্ধৃত করা সমসাময়িক সংবাদভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।

ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। একটি সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু ও ভাষাকে কেন্দ্র করে “অশ্লীলতা”-র অভিযোগ কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা-নিয়ন্ত্রণে পরিণত হতে পারে—‘সত্যের মতো বদমাশ’ তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাপিডিয়া — আবদুল মান্নান সৈয়দ — জীবন, সাহিত্যকর্ম ও পুরস্কার।

২. বিডিনিউজ২৪ ডটকম — আবদুল মান্নান সৈয়দ ও তাঁর আনাগোনা — ‘সত্যের মতো বদমাশ’ ও বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গ।

৩. যুগান্তর — যে বইগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছিল — ১৯৬৯–৭০ সালের বই বাজেয়াপ্তি ও ১৯৭০ সালের সরকারি বক্তব্যের বিবরণ।

৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — ‘আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা : পরাবাস্তবতা ও প্রকরণ’ — তাঁর সাহিত্যিক অবস্থান ও ষাটের দশকের কবিতা।

৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ : সমালোচনা চিন্তার প্রাতিস্বিকতায়’ — তাঁর সাহিত্য ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন।

৬. বিডিনিউজ২৪ ডটকম — সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ — তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিচিতি।


‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘বিষের বাঁশী’: ১৯২৪ সালে বাজেয়াপ্ত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ

১৯২৪ সালের অক্টোবর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। বইটির সব কপি জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের অভিযোগ

বিস্তারিত »
‘যুগবাণী’: নজরুলের যে বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘যুগবাণী’: নজরুলের যে বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার

১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর। ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সরকার কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বইটির সব কপি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া

বিস্তারিত »
‘সংস্কৃতির সংকট’: নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বদরুদ্দীন উমরের বই
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘সংস্কৃতির সংকট’: নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বদরুদ্দীন উমরের বই

‘সংস্কৃতির সংকট’-এ বাঙালি সংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি, ঊনিশ শতকে মুসলিম শিক্ষা ও মাতৃভাষা চর্চা, একুশে ফেব্রুয়ারি ও সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার মাধ্যম, ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং

বিস্তারিত »
পাকিস্তান আমলে নিষেধাজ্ঞা ও বাজেয়াপ্তির মুখে পড়া সত্যেন সেনের ‘আলবেরুনী’-র প্রতীকী চিত্র।
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘আলবেরুনী’: পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ এক ঐতিহাসিক উপন্যাস

সত্যেন সেন ছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক সংগ্রাম—দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি শ্রমিক

বিস্তারিত »
১৯৮৩ সালে সামরিক শাসনের সময়ে মিনার মনসুরের ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ বাজেয়াপ্ত হওয়ার প্রতীকী চিত্র।
যা কিছু নিষিদ্ধ

‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’: সামরিক শাসনে বাজেয়াপ্ত এক কাব্যগ্রন্থ

মিনার মনসুর বাংলাদেশের কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। তাঁর জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বরলিয়া গ্রামে। লেখালেখির শুরু সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ

বিস্তারিত »
একটি কবিতা, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও দীর্ঘ নির্বাসনের প্রতীকী চিত্র।
তথ্যভাণ্ডার

দাউদ হায়দার: একটি কবিতা, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও নির্বাসন — ১৯৭৪

দাউদ হায়দার ছিলেন বাংলাদেশের কবি, লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তিনি তরুণ কবি হিসেবে পরিচিতি পান এবং দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।

বিস্তারিত »