আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক। ১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক ষাটের দশকেই বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, নাটক ও সম্পাদনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজ রয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক।
১৯৬৮ সালে, মাত্র ২৫ বছর বয়সে, তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাশ’ প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর সাহিত্যাঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পদক্ষেপের মুখে পড়ে।
কেন বইটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল?
বিভিন্ন সাহিত্যিক ও জীবনীমূলক সূত্রে বলা হয়েছে, অশ্লীলতার অভিযোগে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে সরকারি নথির যে তথ্য বর্তমানে প্রকাশ্য সূত্রে পাওয়া যায়, সেখানে বিষয়টি আরও নির্দিষ্টভাবে দেখা যায়।
১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশিত কয়েকটি বই নিয়ে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। কিছু বইয়ের প্রকাশককে “কেন বইগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে না”—এমন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এই তালিকায় ‘সত্যের মতো বদমাশ’-এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি বইয়ের নাম ছিল।
পরবর্তী সময়ে ৭ জানুয়ারি ১৯৭০ তারিখে দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত ‘পুস্তক বাজেয়াপ্তি প্রসঙ্গে সরকারের বক্তব্য’-এর উদ্ধৃতি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত বইগুলোর মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’ বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। অন্য কয়েকটি বইয়ের ক্ষেত্রে তখনও কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব বিবেচনাধীন ছিল।
গল্পটি কী নিয়ে?
গল্পগ্রন্থটির নামও একটি গল্পের নাম থেকে এসেছে। ‘সত্যের মতো বদমাশ’ গল্পে একটি কিশোর তার মায়ের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে যায়। সেখানে নানা দৃশ্য ও মানুষের আচরণের মধ্য দিয়ে সে সমাজের অন্ধকার দিকের মুখোমুখি হয়।
গল্পের একটি অংশে কিশোরের মা হারিয়ে যায় এবং পরে কিশোর নিজেই সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। গল্পটি মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা, যৌন সহিংসতা এবং সামাজিক অন্ধকারকে সামনে আনে।
এই বিষয়বস্তু এবং ভাষার কারণেই বইটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে বলে বিভিন্ন সাহিত্যিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সরকারি বাজেয়াপ্তির মূল আদেশ বা তার নির্দিষ্ট আইনি ধারা প্রকাশ্য অনলাইন উৎসে আমরা এখনো শনাক্ত করতে পারিনি। তাই FoEBD-এর নথিতে অভিযোগ ও সরকারি পদক্ষেপ—দুটিকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।
লেখকের সাহিত্যিক পথ
‘সত্যের মতো বদমাশ’ বাজেয়াপ্ত হওয়ার পরও আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যিক পথ থেমে যায়নি। তিনি পরবর্তী সময়ে ‘চলো যাই পরোক্ষে’, ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’, ‘পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী’, ”অ-তে অজগর’’ সহ বহু গল্প, উপন্যাস ও কবিতা লিখেছেন। একই সঙ্গে জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। এক অর্থে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরুতেই যে বইটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মুখে পড়েছিল, সেটিই পরে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মূল্যায়ন
‘সত্যের মতো বদমাশ’ বাংলাদেশের পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, বইটি অশ্লীলতার অভিযোগে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মুখে পড়ে—এমন তথ্য একাধিক সাহিত্যিক সূত্রে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৭০ সালের সরকারি বক্তব্য উদ্ধৃত করা সমসাময়িক সংবাদভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। একটি সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু ও ভাষাকে কেন্দ্র করে “অশ্লীলতা”-র অভিযোগ কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা-নিয়ন্ত্রণে পরিণত হতে পারে—‘সত্যের মতো বদমাশ’ তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাপিডিয়া — আবদুল মান্নান সৈয়দ — জীবন, সাহিত্যকর্ম ও পুরস্কার।
২. বিডিনিউজ২৪ ডটকম — আবদুল মান্নান সৈয়দ ও তাঁর আনাগোনা — ‘সত্যের মতো বদমাশ’ ও বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গ।
৩. যুগান্তর — যে বইগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছিল — ১৯৬৯–৭০ সালের বই বাজেয়াপ্তি ও ১৯৭০ সালের সরকারি বক্তব্যের বিবরণ।
৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — ‘আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা : পরাবাস্তবতা ও প্রকরণ’ — তাঁর সাহিত্যিক অবস্থান ও ষাটের দশকের কবিতা।
৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ : সমালোচনা চিন্তার প্রাতিস্বিকতায়’ — তাঁর সাহিত্য ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন।
৬. বিডিনিউজ২৪ ডটকম — সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ — তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিচিতি।





